কয়েক চুমুক হুইস্কির গল্প

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

আফরিন আহমেদ

খুব কায়দা করে তর্জনী আর মধ্যমার মধ্যে ধরা সিগারেট টা জ্বালালো অনিন্দিতা। সিগারেটটা কোন ব্র‍্যান্ডের তা বোঝা যাচ্ছে না। হয়তো অতটাই দামী ব্র‍্যান্ড, যেটা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার মধ্যে পড়ে না।

অনিন্দিতা অবশ্য সাধারণ মানুষ না। যে অর্থে একজন মানুষকে অসাধারণ বলার সব সূত্র তৈরি হয়েছে, ঠিক সেই অর্থেও সে অসাধারণ  নয়। আসলে সাধারণ আর অসাধারণের মধ্যে আরেকটা কিছু থাকলে, অনিন্দিতা কে সেই গ্রুপে ফেলে দেওয়া সহজ হতো।

অবশ্য এইটিন ক্যারেট হোয়াইট গোল্ড দিয়ে তৈরি লাইটার ব্যবহার করে যে সিগারেট ধরায়, তাকে সবরকম ফর্মুলার উর্ধ্বে রাখাটাই নিরাপদ মনে করে সবাই।

খুব অলস ভঙ্গিতে অনিন্দিতা সিগারেটে টান দিচ্ছে। কোন প্রকার কায়দা কানুন ছাড়াই ধোঁয়া ছাড়ছে। তার পুরো ভঙ্গিটার মধ্যে একটা বিশুদ্ধ অন্যমনস্কতার ছাপ আছে। আর আছে সহজাত প্রশ্ন। যে কেউ ভীষণ অবাক হয়ে ভাবতেই পারে, এই মিষ্টি মেয়েটা ধূমপান করছে…  বার কয়েক চোখ কচলেও দেখে নিতে পারে, ঠিক দেখছে নাকি ভুল, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য।

ফোনে মৃদু তরঙ্গের মতো একটা শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে, ঢেউ এসে যেন ফোনটাকে খুব আলতো করে ধাক্কা দিচ্ছে । ফোনের দিকে অনিন্দিতা তাকালো না। ধূমপানের সময় সে অন্য জগতে চলে যায়। লোকালয়ের মাঝেও নিজের চারপাশে অনায়াসে পাঁচটা দেয়াল তুলে নিতে পারে।

ডান হাতের কবজি উলটে সময় দেখে নিলো অনিন্দিতা। ঘড়িটাও অস্বাভাবিক দামী মনে হচ্ছে। আরও দশ মিনিট সময় আছে তার পাঁচ দেয়ালের মধ্যে ডুবে থাকার।

এরপরেই আবার নতুন করে পুরনো গল্পটা শুরু করতে হবে।

এটা হবে তার পাঁচ নম্বর সাইকয়াট্রিস্ট এর কাছে ভিজিট। এর আগের চারজনই অনিন্দিতার মূল বা ছোটখাটো কোন সমস্যাই ধরতে পারেননি। হাল ছেড়েই দিয়েছিলো অনিন্দিতা। কিন্তু সুব্রতর অনুরোধে এইবারই শেষ চেষ্টা… এই শর্তেই  সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে আসতে রাজী হয়েছে অনিন্দিতা।

সুব্রত অনিন্দিতার বরও হতে পারে, বয়ফ্রেন্ডও হতে পারে। সেটা গল্পের জন্য একেবারেই জরুরী কোন বিষয় নয়। জরুরী বিষয়টা হলো, সুব্রত চায়, অনিন্দিতার সদ্য গজিয়ে ওঠা ধূমপানের বদভ্যাসটাকে তাদের জীবন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে।

হ্যাঁ, সদ্যই। বাইরে থাকাকালীন সময়েই অনিন্দিতা সিচুয়েশনাল ডিপ্রেশনের রোগী হিসেবে ডায়াগনোসড হয়। এ ওষুধ, সে ওষুধ ট্রাই করে করে কোন এন্টিডিপ্রেসেন্টই অনিন্দিতার স্যুট করলো না। ডাক্তার শেষতক বিউপ্রোপিয়ন এ থিতু হতে পারলেন।  অনিন্দিতাও। একমাত্র বিউপ্রোপিয়নই অনিন্দিতাকে জীবনযুদ্ধের খুব কঠিন ছয়টা মাস হেসেখেলে টিকিয়ে রাখলো।

দেশে ফিরে এসেও সে সঙ্গে করে নিয়ে আসা বিউপ্রোপিয়ন খাওয়া চালিয়ে গেলো আগের প্রেসক্রিপশন মোতাবেক। বিপত্তি বাঁধলো যখন ওষুধটার স্টক শেষ হয়ে গেল। এইদেশে বিউপ্রোপিয়ন পাওয়া যায় না। আগে পাওয়া যেতো। তাও কেবলমাত্র ব্যবহার করা হতো এন্টি স্মোকিং ড্রাগ হিসেবে।

হঠাৎ করে বিউপ্রোপিয়ন এর স্টক শেষে অনিন্দিতা আবার সেই  সমুদ্রের পুরনো ঝড়ের মাঝে পড়ে গেলো। তার চারপাশে কেবল ঝড় আর ঝড়। দিনরাত ঝড় চলে। এই ঝড়ের কোন বিরতি নেই, বিরাম নেই।

না পেরে সে প্রথম সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে গেলো। অনুরোধ করলো, বিউপ্রোপিয়ন এর গ্রুপের অন্য কোনো ড্রাগ প্রেসক্রাইব করার জন্য। ডাঃ খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, বিউপ্রোপিয়ন এর কোন সাবস্টিটিউট এদেশে পাওয়া যায় না। বলে হিবিজিবি লিখে দিলেন প্রেসক্রিপশন।  সেই হিবিজিবি ওষুধ কেনা হলো। দিনরাত এক করে নিয়মানুযায়ী সেবন করা হলো। অনিন্দিতার ঝড় কমলো না।

দ্বিতীয়,  তৃতীয়, চতুর্থ পয়েন্ট… সবখানেই একই গল্পের পুনরাবৃত্তি। তদ্দিনে অনিন্দিতা ধূমপানে সাবলীল হয়ে উঠেছে। মনে আশা, এন্টি স্মোকিং ড্রাগ হিসেবে হলেও এবার তাকে বিউপ্রোপিয়ন প্রেসক্রাইব করা হবে। কিন্তু আশাটা দুরাশায় পরিণত হলো। কেউ বিউপ্রোপিয়ন বা তার সাবস্টিটিউট লিখলেন না।

আট মিনিট হয়ে গিয়েছে। অনিন্দিতা উঠে দাঁড়ালো দীর্ঘশ্বাস গোপন না করেই। পঞ্চম সাইকিয়াট্রিস্ট এর দরজার দিকে যন্ত্রের মত এগিয়ে যেতে শুরু করলো। হঠাৎ কী মনে করে সে উল্টোদিকে ঘুরে দাঁড়ালো।

সাইকিয়াট্রিস্ট এর সঙ্গে সাক্ষাতের আগেই কয়েক চুমুক স্প্রিংব্যাংক এর খোঁজে কোথায় যাওয়া যেতে পারে, সে ছক মেলাতে মেলাতে অনিন্দিতা এবেলা লবির উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো।

ছবি: প্রাণের বাংলা

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]