খিদের কষ্ট ও ছাওইয়াং পার্ক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শান্তা মারিয়া

বেইজিং পার্কের শহর। ছোটবড় প্রচুর পার্ক রয়েছে। সবগুলোই সুন্দর। আর প্রতিটি পার্কেই রয়েছে শিশুদের জন্য বিশেষ এলাকা। সেখানে অনেকগুলো রাইড থাকে। প্রতিটিতেই বিনে পয়সায় শিশুরা চড়তে পারে, সেইসঙ্গে বড়রাও। বেইজিংয়ে বিশেষ বিখ্যাত হলো ছাওইয়াং পার্ক।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের শেষদিকে সেখানে একটি আন্তর্জাতিক মেলা বসেছিলো। বাংলাদেশের একটি স্টলও ছিলো সেখানে। চীন আন্তর্জাতিক বেতার বাংলা বিভাগের ডিরেক্টর ইয়ুকুয়াং ইয়ুয়ে আমাদের সহকর্মী শিহাবুর রহমানকে বললেন ওর অর্থনীতি বিষয়ক অনুষ্ঠানের জন্য মেলাটির উপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে এবং বাংলাদেশের স্টলমালিকের সাক্ষাৎকার নিয়ে আসতে এবং ওই দিন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত থাকবেন সেখানে, তারও একটি সাক্ষাৎকার নিতে হবে।। সেই সঙ্গে বললেন আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে। কারণ আমি তখন একেবারে নতুন মানুষ। বেইজিংয়ের কিছুই দেখিনি। বেশ কথা।

আমি এবং শিহাব সাহেব বেশ ভোরবেলাতেই রওনা হলাম। ব্যাংকহিসাব খোলা হয়নি বলে তখনও একমাসের বেতন হয়নি। দেশ থেকে যা ডলার নিয়ে এসেছিলাম সেগুলো বাংলাদেশী এক সহকর্মী মেরে দিয়েছিলেন। সেটা আরেক কাহিনী। পরে কোনো সময় হয়তো তা বলা যাবে।

যাই হোক আমার হাতে তখন একদম টাকা পয়সা নেই। টাকা বাঁচানোর জন্য দিনে একবেলা খেয়ে থাকি। আমি আবার কিছুতেই কারও কাছ থেকে টাকা ধার নিতে রাজি নই। এটা আমার এক ধরনের জেদ। বোকামিও বলা চলে। দেখি না এভাবে আধপেটা খেয়ে কতদিন চলা যায়। কখনও তো না খেয়ে থাকিনি এর আগে। নতুন ধরনের অভিজ্ঞতাও তো হচ্ছে। জানি বেতন পেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।সেদিন ভোরে রওনা হয়েছি শুধু একটুকরো পাউরুটি খেয়ে।

শিহাবসাহেব আমাকে নিয়ে চললেন সাবওয়ে দিয়ে। শিজিংশান থেকে বেশ দূরে ছাওইয়াং। প্রায় ঘন্টাখানেক সাবওয়েতে চলার পর স্টেশনে পৌছালাম। ডিরেক্টর বলে দিয়েছিলেন সাবওয়ে স্টেশন থেকে নেমে বাকি পথটা ট্যাক্সি করে যেতে। কিন্তু শিহাবের ট্যাক্সি চড়ার ইচ্ছা নাই। উনি পার্কের উদ্দেশ্যে হেঁটে রওনা হলেন। দূরত্ব? বাংলামোটর থেকে পুরানা পল্টন হবে।

হেঁটে হেঁটে রীতিমতো ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে পৌঁছালাম পার্কের বিশালাকার ফটকে। বাঙালি একজন আগেই জানতেন আমরা আসছি। গেটপাশ দিয়ে নিয়ে গেলেন ভিতরে।

এখানে বলে রাখি ছাওইয়াং হলো বেইজিংয়ের সবচেয়ে বড় আকারের পার্ক।এটা লম্বায় ২.৮ কিলোমিটার এবং চওড়ায় ১.৫ কিলোমিটার। মোট এলাকা ২৮৮.৭ হেক্টর।

অবশ্য বেইজিং জু, সামার প্যালেস ইত্যাদি এর চেয়েও বড়।

পার্কের অল্প একটু অংশ জুড়ে মেলা বসেছে। প্রথমেই গেলাম বাবরভাই বলে বেইজিংয়ে সুপরিচিত বাঙালি ভদ্রলোকের স্টলে। তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে বেইজিংয়ে আছেন। ঢাকায় চারুকলার ছাত্র ছিলেন। এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। টুকটাক ব্যবসাও করেন। চীনা মেয়ে বিয়ে করেছেন। এক ছেলের বাবা। স্টলে বাংলাদেশের পোশাক, গয়না, টিপ, মেহেদি, পাটের তৈরি নানা রকম জিনিষ বিক্রি করছেন।তেহারি বসিয়েছেন রাইস কুকারে। একটু পরই তৈরি হয়ে গেল। ফিরনি খাবারের বাটিতে ছোট্ট এক বাটি তেহারি দশ ইউয়ান। বাবরভাই বিক্রি করছেন। চীনারা খাচ্ছে মজা করে। বাবর সাহেবের স্ত্রী চীনা মেয়েদের হাতে মেহেদি লাগিয়ে দিচ্ছেন এবং দশ ইউয়ান করে নিচ্ছেন। পাটের তৈরি ছোট্ ছোট পুতুল বিক্রি করছেন বাবর সাহেবের সুন্দরী শ্যালিকা, সেটারও দাম দশ ইউয়ান। বেশ কয়েকটা টিপের পাতা রয়েছে। স্টোনের তৈরি টিপ। আমাদের গাউছিয়াতে বিক্রি হয় সত্তর টাকা করে পাতা। এখানে একটি করে টিপ বিক্রি হচ্ছে।চীনা তরুণ ও তরুণীরা কপালে টিপ পরছেন। এটা বিক্রি করছেন বাবর সাহেবের শাশুড়ি। টিপের দাম দশ ইউয়ান প্রতি পিস। স্টলের অন্য কিছুর দাম জিজ্ঞাস করা্র প্রয়োজন বোধ করলাম না। কারণ আমার ধারণা সব কিছুর দামই বোধহয় দশ ইউয়ান। হ-য-ব-র-ল এর দর্জির ফিতায় যেমন ২৬ ইঞ্চি ছাড়া আর কোনো দাগ ছিল না তেমনি বাবর সাহেবেরও বোধহয় দশ ইউয়ান ছাড়া অন্য কোনো ট্যাগ ছিল না। যাই হোক এদিকে খিদায় প্রাণ যায়। কিন্তু তেহারির বাটি নিঃশেষ। মানে আমাদের কপালে কিছু জোটার আগেই হাঁড়ি খালি।

শিহাবের ইন্টারভিউ নেওয়া শেষ হলো। এবার মেলাটা একটু ঘুরে তারপর পার্ক দেখতে বের হলাম। প্রথম যেদিকে গেলাম সেখানে মজাদার সব রাইড। বিশাল এক ফেয়ার হুইল। এটা বেইজিংয়ের সবচেয়ে উঁচু ফেয়ার হুইল। আরও যে কি ভয়ংকর সব রাইড রয়েছে সেটা না দেখলে বোঝানো মুশকিল। বিশাল ও ভয়ংকর একটি রোলার কোস্টারও রয়েছে। চড়ার ইচ্ছা নেই তবে দেখতে সত্যিই মজা লাগে। এরই মধ্যে দেখি খাবারের স্টলে আলুভাজা বিক্রি হচ্ছে। কাঠির মধ্যে পুরো আলুটা পাতলা চিপসের মতো করে পেঁচিয়ে ডুবো তেলে ভেজে তোলা হচ্ছে। শিহাব সাহেব আর আমি দুজনে দুটি স্টিক কিনলাম। দামটা শিহাবই দিয়েছিলেন। জীবনে এত স্বাদের খাবার খেয়েছি বলে মনে পড়ে না। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছিলো বলেই হয়তো এত মজা লেগেছিলো খাবারটা।

ছাওইয়াং পার্কে বেশ অনেকক্ষণ ঘুরে এবার ফেরার পালা। ফেরার পথে শিহাব সাহেব আমাকে নিয়ে সাবওয়ে স্টেশনের পথে হাঁটা দিলেন। কারণ বাস স্টপেজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো

 না। আবার সেই লম্বা পথ পাড়ি। আলুভাজা তো হজম হয়ে গেছে। তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। একবার ভাবলাম বলি, ভাই কিছু খাবার খাওয়ান। কারণ আমার পকেট শূন্য। কিন্তু বলতে পারলাম না সংকোচে। হয়তো ভাববেন মহিলাটি তো বেজায় লোভী। এখানে জানিয়ে রাখি সেদিনটায় আর কোন খাবার খাওয়া হয়নি, কয়েক গ্লাস পানি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে।

ছাওইয়াং পার্কে আবার গিয়েছিলাম পরের বছর শরৎ কালে। বেইজিং থেকে আমি চলে আসার এক সপ্তাহ আগে। সেদিন প্রায় পুরো পার্কটি ঘুরে ছিলাম। অসাধারণ সুন্দর। বিশাল বড় লেক। সেই লেকের ধার দিয়ে হেঁটে বেড়াতে যেমন ভালো লেগেছিলো তেমনি এর সবুজ মাঠে ঘাসের উপর বসে থাকতেও চমৎকার লেগেছিলো। ছা্ওইয়াং পার্কে অনেকেই তাঁবু খাটিয়ে ক্যাম্পিং করে। অনেকে দড়ির দোলনায় দিব্যি শুয়ে থাকে গাছের ছায়ায়। আমিও এমন একটি দোলনায় বেশকিছুক্ষন শুয়ে থেকে গাছের ছায়া, প্রকৃতির সৌন্দর্য ও শান্তি উপভোগ করেছি।

বেইজিং থেকে যখন চলে আসি তখন শরৎকাল। পাতা ঝরার দিন চলছে। তেমনি ঝরা পাতার মতো আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোও রেখে এসেছি বেইজিংশহরের বুকে। সময়ের হাওয়ায় সেগুলো উড়ে গেলেও স্মৃতিপটে তারা চির সবুজ হয়ে আছে।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

 

 

 

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]