খুঁজেছিনু মাথা গোঁজার ঠাঁই, পেয়ে গেনু শান্তির নীড়

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

জীবনের জন্য জীবনের পিছনে পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে অনেকটা বছর পার হয়ে গিয়েছিলো।বিবাহিত এবং পেশাদার জীবন শুরু করেছিলাম ১৯৮৪ সালে। চলতে চলতে চলে এলো ২০০২ সাল। গত হয়েছে আঠারোটি বছর। শিল্পীরা,সবাই না হয়তো তবে বেশীরভাগ শিল্পীই সহায় সম্পত্তির ব্যাপারে একটু গা-ছাড়া থাকে। আমাদের ও তাই ছিলো। সঞ্চয় বলে তেমন কিছু ছিলো না অথচ আয় রোজগার ভালোই ছিলো তারপর ও একের পর এক ভাড়া বাড়িতে বসবাস! এতোদিনে মাথায় এলো ঢাকা শহরে আস্ত একটা বাড়ি অথবা বাড়ি করার জন্য জমি না হলেও একটা ফ্ল্যাট অন্তত কেনা যেতে পারে।চামেলীবাগ এর যে এপার্টমেন্টে ভাড়া ছিলাম সেই বিল্ডার্সই একদম পাশের প্লটে আরেকটি এপার্টমেন্ট তৈরি করছেন। বিল্ডার্সের প্রধান ব্যাক্তি আমার সাহেবের বন্ধু মানুষ। তিনি বললেন এখানে একটা ফ্ল্যাট নাও,অন্যদের চাইতে কিছু কম দাম নেবো এবং কোন কিস্তি টিস্তি লাগবেনা। যখন যা পারো দিও।আমরা একবার ভাবি পারবো দাম দিতে? আবার ভাবি পারবোনা কেন! কিস্তি থাকলে কখনো আটকে যাবো কিন্তু এতো সুবিধা যখন পাচ্ছি তখন নিশ্চয়ই পারবো। আল্লাহর নাম নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম একটা ফ্ল্যাট কেনার।

পরিবারের সঙ্গে

১২৫০ স্কয়ার ফিটের একটা ফ্ল্যাট পছন্দ করলাম ডিজাইন দেখে।চোখের সামনেই মাটি খোঁড়া হলো। গাঁথুনি শুরু হলো। মনে আশার সঞ্চয় হচ্ছিলো। অল্প অল্প করে টাকাও দিচ্ছিলাম, মানে পারছিলাম। এভাবে একসময় দালানের কাঠামো দাঁড়িয়ে গেলো।আমি অনেক ভেবেচিন্তে এমন একটা তলায় এমন দিকে ফ্ল্যাট নির্বাচন করেছিলাম যেন সন্ধ্যা অবধি সূর্য আলো দিয়ে যায়,বাতাস খেলা করে। সত্যিই আমার হিসাব ভুল হয়নি।তিনটা বেডরুম একটা ছোট সার্ভেন্ট রুম তিনটা বাথরুম আমাদের। বারান্দা দুইটা। একটা আমার বেডরুমের সঙ্গে একটা রান্নাঘরের সঙ্গে। আমি বিল্ডার্সের অনুমতি নিয়ে কিছু নকশা বদলে নিলাম। মাস্টার বেডের বাথরুমের সঙ্গে ছোট একটা ড্রেসিং রুম, সেটা উঠিয়ে দিয়ে বাথরুমটা বড় করে নিজের মতো করে নিলাম। রান্নাঘরের দরোজা ফেলে দিয়ে খোলা রান্নাঘর করলাম। রান্নাঘরের বারান্দা ভেঙে তা রান্নাঘরের ভেতর নিলাম। তাতে রান্নাঘর বড় হয়ে গেলো। এবং ড্রইংরুম ও খোলা রাখলাম। এই খোলা রাখার জন্য আমার ছোট ফ্ল্যাট বড় হয়ে গেলো। নিজেদের পছন্দসই টালি কেনার জন্য টাইলসের দোকান গুলোতে দিনের পর দিন ঘোরাঘুরি করেছি এই জোড়াবাউল। যাতে সাধ্যের মধ্যে সুন্দর একটা বাসা তৈরি করতে পারি।ছোট বেডরুমের মধ্যেই নিজে ডিজাইন করে ইন বিল্ট আলমারি , হারমোনিয়াম, টিভি রাখার জায়গা, ছোট একটা ড্রেসিং টেবিল সাউন্ড সিস্টেম সব করে নিলাম। রান্নাঘরে খুব সুন্দর করে ওয়াল কেবিনেট, মার্বেল পাথরের টপ ওয়ালা ছোট কাপবোর্ড বানালাম।ড্রইংরুমে আমার এওয়ার্ড রাখার জন্য শোকেস।কাপবোর্ড ও ওয়াল কেবিনেটের কাচের পাল্লায় গ্লাস পেইন্ট দিয়ে নিজেই ফুলেল ছবি আঁকলাম। কিছুটা নিয়ম ভঙ্গ করে রান্নাঘরের রান্নার জায়গার টালির সঙ্গে সমুদ্র নীলের রঙ মিলিয়ে হালকা নীল স্লাইড লাগালাম ।মোটামুটি সাধ্যের মধ্যেই তৈরি হয়ে গেলো অপূর্ব একটা নীড়!

লিফট লাগানোর আগেই আমরা সেই ফ্ল্যাটে উঠলাম। চুলা লাগানো হয়নি।আব্বা আম্মা মেঝোবোন রত্নাপা অনেক কিছু রান্না করে আনলেন। আব্বা আম্মা বাসায় ঢুকেই ফ্ল্যাটের চারিদিকে আয়াতুল কুরসী পাঠ করে ফু দিয়ে নফল নামাজ পড়ে কোরান শরীফ পাঠ করতে বসলেন। কেমন যেন অলীক একটা অনুভব হচ্ছিলো। বিশ্বাসই হচ্ছিলো না এই ফ্ল্যাট আমার! বিল্ডার্স বলেছেন আমি ছাদে কিছুটা জায়গা নিয়ে বাগান করতে পারবো। সেই স্বপ্ন আমাকে উড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিলো।রাতে মোটামুটি যতটা পারা যায় গুছিয়ে ঘুমুতে যাওয়ার সময় আনন্দে কান্না পাচ্ছিলো।

অনেক দিন ধরে টুকটুক করে কেনা দেশ বিদেশের নানারকম ডেকোরেশন পিস,বাথরুমের এক্সেসরিজ, টাওয়েল, বাথটাবের নানাবিধ ব্যবহার্য জিনিসপত্র নামিয়ে জায়গা মতো সেট করলাম। ফ্ল্যাটে ওঠার আগে আবদার করে আব্বাকে দিয়ে চারটি পেইন্টিং করিয়ে নিয়েছিলাম।সঙ্গে লিখে দিলেন আব্বার অত্যাশ্চর্য হাতের লেখা ” আয়াতুল কুরসি ” এবং আমার হাতে করা সুঁই সুতোর ছয় সাতটা ল্যান্ডস্কেপ। সব মনের মাধুরি দিয়ে ড্রিল করে দেয়ালে বসালাম। সত্যিই এতো ছোট একটা বাড়ি ভালোবাসার ছোঁয়ায় কেমন যেন স্বর্গ অনুভব হচ্ছিলো। অথচ পৃথিবীর কত দামী দামী বাড়িই তো আমরা দেখেছি যার একটা স্নানঘরও আমার বাসার চেয়ে বড়! একেই বলে আত্মতুষ্টি। আমি সারাজীবনই অল্পে তুষ্ট মানুষ।

আমার রান্নাঘরের কিচেন টপে বসে স্লাইড খুলে দিলে সমুদ্রের বাতাস অনুভব হয়।প্রতিটি রুম আলোয় ভরা। আমি সুখে হাসি,আমি বলি … দেখেছো কেমন উথাল-পাতাল বাতাস, চাঁদের আলো কতদূর পর্যন্ত ঢোকে! আমার জীবন সঙ্গী আমার আনন্দ দেখে মুচকি হেসে বলেন তোমার জন্য তোমার বাবা-মা দোয়া একটু বেশিই করে ফেলেছেন! কয়দিন একটু সামলে নিয়ে কয়েকজন পছন্দের মানুষকে নতুন বাসায় দাওয়াত করে নিজহাতে যত্ন করে রেঁধে খাওয়ালাম।তাঁদের অনেকের মধ্যে সুবীর’দা ছিলেন। তিনি আমার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বললেন কনক! তোমার বাসাটি একদম সুরেলী! সুর এবং সুখ স্পষ্টতই ভেসে বেড়াচ্ছে।আশীর্বাদ করি এমন সুরেই ভরা থাক তোমার, তোমাদের জীবন। বাসা বানানোর ঝক্কি সামলে হঠাৎ ভাবনায় একটু ছেদ পড়লো, চিন্তায় ভ্রুরেখা বদলে গেলো।জীবনসঙ্গীকে বললাম সবই তো হলো, দেখোতো ব্যাংকে কত টাকা আছে অবশিষ্ট? উনি ও বললেন তাইতো! উনি ব্যংক স্টেটমেন্ট নিয়ে এসে অট্টহাসি দিয়ে আমাকে জানালেন ” শোন! ব্যাংকে তোমার আমার দুজনের একাউন্টে অবশিষ্ট টাকা আছে মোট বারোশত! হাসবো না কাঁদবো বুঝে ওঠার আগেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলো ” তাও আলহামদুলিল্লাহ “

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box