খুনের গল্পে ইস্তাম্বুল

ইস্তাম্বুল শহরটিকে ঘিরে গোয়েন্দা কাহিনিতে খুন জখমের শেষ নেই। নোবেল বিজয়ী লেখক ওরান পামুকের শহর ইস্তাম্বুল।নরওয়ের নোবেলজয়ী আরেক সাহিত্যিক নুট হামসুন ইস্তানবুলে ঘুরতে এসে লিখেছিলেন ‘হুইস্পার্স ইন দ্য ল্যান্ড অব ডেথ’ বইটি।

এই শহরের পেরা প্যালেস নামে হোটেলটির ৪০১ নম্বর ঘরে বসে নাকি আগাথা ক্রিস্টি লিখেছিলেন তার বিখ্যাত রহস্য কাহিনি ‘মার্ডার অন দি ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’। ‘নাকি’ কথাটা বলার কারণ হচ্ছে  আগাথা ক্রিস্টির এই রহস্য কাহিনি কখন ও কোথায় লেখা হয়েছিলো তা নিয়েই আছে গভীর রহস্যের হাতছানি। তবে বহু বিশেষজ্ঞের ধারণা, কনস্ট্যান্টিনোপলের এই হোটেলেই লুকিয়ে আছে রহস্যের চাবি।

গোয়েন্দা কাহিনির লেখকরা তাদের প্লটের রহস্যজাল কেনো এই শহরেই ছড়াতে ভালোবাসতেন সে প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন। কিন্তু বাস্তবেও তো ইস্তাম্বুল শহর নানা কারণে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ভূমি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ২০১৮-তেই ইস্তানবুলের এক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সূত্র ধরে বিশ্ব রাজনীতির পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিলো। ইস্তানবুলে সৌদি আরবের দূতাবাসে খুন হয়েছেন সাংবাদিক জামাল খাশোগি। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, খোদ সৌদি রাজপরিবার জড়িয়ে এই অপরাধের সঙ্গে। খুন তো শুধুই ব্যক্তিগত লোভ আর জমানো ক্রোধের কারণে ঘটে না। খুন হয় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রেও। আর এই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পালা গুনতে বসলে ইস্তানবুল টেক্কা দিতে পারে যে কোনও শহরকে।

আগাথা ক্রিস্টির সেই পেরা প্যালেস থেকে মিনিট কুড়ি গাড়িতে গেলে অধুনা সুলতান আহমেত নামে একটি ঐতিহাসিক জায়গা আছে। সেখানেই আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে সুন্দরী স্ত্রী থিওফানোর ষড়যন্ত্রে খুন হয়েছিলেন তদানীন্তন বাইজেন্টাইন সম্রাট দ্বিতীয় নিকিফোরাস। সে হত্যায় পরকীয়ার গন্ধ থাকলেও আসলে তা ছিলো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। থিওফানো চেয়েছিলেন তাঁর প্রথম পক্ষের সন্তানকে রাজার আসনে বসাতে। এই সুলতান আহমেতের প্রাসাদেই ঘটেছে অসংখ্য গুম খুন। অটোমানরা ক্ষমতায় আসার পর একের পর এক সুলতান মসনদে বসেছেন নিজেদের আত্নীয়স্বজনদের গুপ্তঘাতকদের হাতে খুন করিয়ে। একই বংশের মানুষের রক্ত অভিশপ্ত। তাই সে অভিশাপ কাটাতে তখন ঘাতকদের নির্দেশ দেওয়া হতো রেশমি স্কার্ফের ফাঁসে শ্বাসরোধ করে খুন করতে।

কিন্তু ইস্তানবুল-ই কেন? কী এমন বৈশিষ্ট্য আছে এই শহরের, যার কারণে বারবার এই সুপ্রাচীন শহরটিকে সাক্ষী থাকতে হয় নৃশংস সব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের? অনেকে বলেন ভৌগোলিক অবস্থান একটি বড় কারণ। ইস্তানবুল ইউরোপ ও এশিয়ার মিলনস্থল, এ শহর থেকে সমুদ্রপথে আফ্রিকায় চলে যাওয়া সহজ। তিন মহাদেশের সঙ্গেই নৈকট্য ভূ-রাজনীতিতে এই শহরের মর্যাদা বাড়িয়েছে। তাই দুই বিশ্বযুদ্ধের বহু আগে থেকেই এখানে গুপ্তচরদের আনাগোনা। এরকুল পোয়রো, জেমস বন্ড, ইথান হান্ট বা জেসন বোর্ন-এর মতো কাল্পনিক গোয়েন্দা ও গুপ্তচররাই শুধু এ শহরে দাপিয়ে বেড়াননি। শহরের অজস্র কাফের নিভৃত অন্তরালে বসে গোপন মিটিং সেরেছেন ব্রিটিশ ডাবল এজেন্ট কিম ফিলবি। চল্লিশের শেষে সিআইএ এবং বৃটেনের এমআই-সিক্স’এর বহু এজেন্ট রাশিয়া এবং আলবানিয়ায় ধরা পড়ে। শোনা যায়, ইস্তানবুলে বসে খবর ফাঁস করেছিলেন ফিলবিই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে তুরস্ক মিত্রশক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে জার্মানির বিরুদ্ধে লড়েছে, ফলে শহর জুড়ে চলেছে ব্রিটিশ, মার্কিন বা ফরাসি গুপ্তচরদের আনাগোনা। তখন কৌশলগত কারণে ইস্তানবুলে ঘাঁটি গেড়েছে সোভিয়েট সিক্রেট সার্ভিস। জর্জিয়া বা আজারবাইজানের মতো সোভিয়েট অঞ্চলগুলির সঙ্গে ইস্তানবুলের ভৌগোলিক নৈকট্য কাজটা আরও সহজ করে দিয়েছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর ইন্টেলিজেন্স বিভাগে কাজ করায় জেমস বন্ড স্রষ্টা ইয়ান ফ্লেমিং জানতেন, ইস্তানবুলে সোভিয়েট গুপ্তচরদের প্রভাব কতটা, তাই বারেবারেই জেমস বন্ড থ্রিলারগুলিতে ব্রিটেন-আমেরিকা ও সোভিয়েট ইউনিয়নের সংঘাতের পটভূমিকা গড়ে উঠেছে এই শহরেই।

ইস্তানবুলে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক খুনের কারণ বুঝতে হলে চোখ বোলানো প্রয়োজন শহরটির রাজনৈতিক ইতিহাসেও। তুর্কি গণতন্ত্রের সূচনাও দেখেছে এ শহর, আবার শেষ ষাট বছরে অন্তত বার পাঁচেক সেনা অভ্যুত্থানও দেখেছে। এ সেই শহর, যেখানে ইসলামিক শাসক অটোমানরাও যেমন রাজত্ব চালিয়েছেন, তেমনই ক্ষমতা বিস্তার করেছেন প্রবল ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ কামাল আতাতুর্ক। ইস্তানবুলের ধর্মনিরপেক্ষতার ইতিহাস অবশ্য আজকের নয়। রোমান এবং গ্রিক ইতিহাসের মর্যাদা দিয়ে এ শহরে কলোনি গড়ে উঠেছে অর্থোডক্স খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের। এমনকী, হিটলারের অভ্যুত্থানের অনেক আগেই এ শহর স্থান দিয়েছে ইহুদিদের। ফলে এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকা থেকে বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম এবং রাজনৈতিক আদর্শের মানুষ বারেবারেই আশ্রয় খুঁজেছেন এ শহরে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
ছবিঃ গুগল