খুনের সময়ে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সময় কাকে বলে? চোখ খোলা অথবা বন্ধ যাই থাকুক না কেনো সময় বয়ে যাচ্ছে। সময়ের প্রবাহ মিলি মাইক্রনে ভাগ হয়ে যাওয়া বালু কণার মতো বয়ে চলেছে অবিরাম। ‘সময় বহিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়… সেই অবিরাম স্রোতে ভেসে চলেছে মানুষ, তার মন। মানুষের মন আর সময় বোধ হয় খুব বেশি দূরত্বে থাকে না। মানুষের মন-ই তার চারপাশে প্রবলবেগে প্রবাহমান সময়কে কতকিছু ভেবে, বলে আর লিখে সাজায়। টেলিভিশনের পর্দায় বিজ্ঞাপন দেখছি বায়ুভর্তি ঠোঙ্গার ভিতরে আলুভাজার। সময়টা কী এখন আলুভাজার?  কোমল পানীয়র সঙ্গে ফাস্টফুডের?  কারো কাছে সময়টা ব্র্যান্ডেড পোশাকের,  দামি প্রসাধনের। কারো কাছে সময় পথের পাশে ছুঁড়ে ফেলা খাবারের উচ্ছিষ্ট অংশ।

সময় বয়ে চলেছে নিরাসক্ত। আমরা সাজিয়ে তুলছি তাকে। সময়ের শরীরে লাগিয়ে দিচ্ছি নানান চিহ্ন, বিশেষণ। কিন্তু আলুভাজা অথবা কোমল পানীয়র সময়ের চাইতেও এক মারাত্নক সময় এখন এসে হাজির হয়েছে আমাদের সামনে। সেটা খুনের সময়, অবিশ্বাসের সময় সেটা ঝড়ের সময়।  বালিতে মুখ গুঁজে থাকার সময়। ভুল বললাম? আশার বসন্তের মৌসুমে নিদারুণ সব বাক্য গেঁথে দিচ্ছি সাদা পৃষ্ঠায়। কিন্তু কথাগুলো অস্বীকার করা যাবে? মুছে ফেলা যাবে? পুঁতে ফেলা যাবে দশ হাত মাটির অন্তরালে?

প্রতিদিন গণমাধ্যম এমনি  বার্তা দিচ্ছে আমাদের এখন। সময়টা খুনের, সময়টা অবিশ্বাসের, সময়টা নিরাসক্ত হয়ে থাকার। এ কোন সমাজ আমরা গড়ে তুলেছি যেখানে পাশের মানুষটি ইচ্ছা হলেই পরে নিচ্ছে খুনির পোশাক? ভ্রান্ত ধারণার ওপর ভর করে গণপিটুনী দিয়ে খুন করছে মানুষ, পরিকল্পনা করে আগুনে পোড়াচ্ছে মানুষ, ধর্ষণ করছে, গুজব ছড়িয়ে নষ্ট করছে মানুষের মনের স্থিতি?  আমরা এ কোন সমাজ তৈরি করেছি যেখানে মানুষ সব জেনেও আশ্চর্য নিরাসক্ত হয়ে আছে? জানি, এমন প্রশ্নের উত্তর নেই। পৃথিবীজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হন্তারক হাওয়া। আঁধার নামছে। মধ্যযুগে ডাইনী বলে অভিযোগ তুলে মেয়েদের পুড়িয়ে মারা হতো। আমরাই তার নাম দিয়েছি ‘উইচ হান্টিং’। এতকাল পরে এ কোন সময় এসেছে আমাদের অধিকার করতে? আমরা কী শিকার করতে নেমেছি পৃথিবীর মাঠে?

যাতনাময় এক সময়ে বসে প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘খুনের সময়ে’। 

গত আট বছরে এই দেশে ৮০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে গণপিটুনিতে। তথ্যটা পাওয়া গেছে গণমাধ্যম থেকে। চমকে ওঠার মতোই। অপরাধ প্রমান হবার আগেই শুধু সন্দেহের বশে আমরা খুন করেছি এতজন মানুষকে! এই মানুষগুলো সবাই কি অপরাধী ছিলো?আর অপরাধ করলেই কী তাকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে মেরে ফেলার অধিকার আমাদের আছে? ক্যালেন্ডারের পাতায় যেন লাল দাগ ফেলে গেছে দিনটা। রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে ছেলেধরা গুজবের জের হিসেবে পিটিয়ে খুন করা হলো এক নারীকে। ভদ্রমহিলা তার সন্তানের স্কুলে ভর্তির তথ্য আনতে গিয়েছিলেন। কারা তাকে খুন করলো এভাবে? মানুষের ভিড়ে মিশে থাকা আমাদের অতীত? নাকি উচ্ছন্নে যাওয়া এই বর্তমান?

জনঘনত্বের চাপ মানুষের ভেতরে তৈরি করছে অস্থিরতা আর হিংস্রতা? মনোবিজ্ঞান এমন বক্তব্যকে সমর্থন করে। স্বল্পপরিসর একটা জায়গায় প্রচণ্ড ভিড়ের চাপ মানুষের মানসিকতাকে হিংস্রতায় বদলে দিতে পারে। নিজের অস্বিত্ব বিপন্ন হচ্ছে ভেবে মানুষ বেপরোয়া হয়ে ঘটাতে পারে যা খুশি। কিন্তু তাই বলে গুজবকে ভিত্তি করে খুন! গণপিটুনি অথবা জনরোষ যাই বলি না কেনো এই চেতনার অন্দরমহলে যেমন কাজ করে অবিশ্বাস তেমনি তীব্র ক্রোধ। সমাজের অন্য জায়গায় বঞ্চিত মানুষ তার ভেতরের বাষ্প বের করে দিতে আইন হাতে তুলে নেয়। কিন্তু আমরা ভাবছি কি কেন জনতার মন এভাবে পাল্টে যাচ্ছে? ফেনী জেলায় নুসরাতকে খুন করা হয়েছে আগুনে পুড়িয়ে। কিন্তু সেখানে নুসরাতের পক্ষে আদালতে লড়বার জন্য প্রথমে উকিলই পাওয়া যায়নি। অথচ খুনীদের পক্ষে প্রথম দিন আদালত সরগরম করে রেখেছিলেন উকিলরা। আমাদের বিষ্ময়বোধও বিপন্ন হয়ে পড়ে।নামতে নামতে এতদূর আমরা!

একদিনে এমন হলুদ হয়ে যায়নি আমাদের ভবিষ্যতের রেখা। আমরা নিজেরাই তৈরি করেছি লোহার বাসর। তৈরি করে তাতে ছিদ্রও রেখেছি যেনো সাপের প্রবেশ নিশ্চিত হয়। আমরা বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে  শুনতে গেছি রবীন্দ্রসঙ্গীত, দূরবীণে চোখ লাগিয়ে দেখেছি চন্দ্রগ্রহণ, নিয়েছি গোলাপের ঘ্রাণ, পড়েছি প্রেমের কবিতা। আর নিজস্ব সংস্কৃতি আর কৃষ্টির শরীরে বসন্তের হাওয়া লেগেছে ভেবে দুহাত তুলে উল্লাস করেছি। ভুল করেছি। আমরা বুঝতে পারিনি লোহার বাসরে এসে প্রবেশ করেছে সাপের বিনাশকাল।আমরা ধর্মের নামে খুন করছি মানুষ, আমাদের অবদমিত কামনার আগুনে আত্মাহুতি দিচ্ছে শিশু থেকে শুরু করে কিশোরী, যুবতী। আমরা অস্থির হয়ে যাচ্ছি ক্রমাগত, আমরা নিরাসক্ত হয়ে থাকছি ক্রমাগত। এই পলায়ন প্রক্রিয়া থেকে নিজের ছায়াকেও আর বিশ্বাস করতে পারছি না। কারণ আমরা তো জেনে গেছি পিতাও নিজের কন্যাকে ধর্ষণ করে। তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকে স্বয়ং জননী! অবিশ্বাস করবো এমন সংবাদ? তাহলে যে দেখছি প্রায় দিনই খবর প্রকাশিত হচ্ছে শিশুকন্যারাও রেহাই পাচ্ছে না ধর্ষকের হাত থেকে। ধরে নেবো বেশিরভাগ খবর অতিরঞ্জিত? তাহলে এমন অতিরঞ্জনের পেছনে কারা কাজ করছে সেটাও তো খুঁজে বার করতে হবে। কে খুঁজতে যাবে সে সত্য? আমরা তো এখন ভাইরাল করতে চাই দুঃসংবাদ। খুনের ধারাবাহিক ছবি ভিডিও করে, বাড়ি ফিরে ইলিশ মাছ আর খিচুড়ি খেয়ে আমরা সে ছবি অপলোড করতে ব্যস্ত।

কী ভীষণ মৃত আমাদের চেতনার একঘেয়ে প্রবাহ! কী ভীষণ নির্লজ্জ স্বাভাবিক আমাদের ঘুম!

মানুষ কী নিরাপত্তাহীনতা, অনিশ্চয়তা শিকার? তাই সে নিজেই শিকার করছে স্বগোত্রকে? পিটিয়ে মেরে ফেলছে, ধর্ষণ করছে, ছেলে শিশুকে বলাৎকার করে তার মাথা কেটে ফেলছে, আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে, নারী ও কন্যাকে বাক্যবানে অবিরাম অপমান করছে।নিজের বিপন্ন অস্বিত্বকে প্রমাণ করতেই এই হিংস্রতা? মনোবিজ্ঞানও বোধ হয় ব্যর্থ হয়েছে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে। এত অশিক্ষা, নিষ্ঠুরতা আর অমানবিকতা কোথায় সঞ্চয় করে রেখেছিলাম আমরা?

পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এই জনবর্বরতার। আমেরিকা, ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স দক্ষিন আফ্রিকা, হা্‌ইতি, গুয়াতেমালা কোথায় ঘটেনি এসব ঘটনা! ইংরেজিতে এ ধরণের জনরোষে মুখে খুনকে ‘লিঞ্চিং’ বলা হয়।  আমেরিকায় দাস ব্যবসায়ীরা কালো মানুষদের খুন করতে কে.কে.কে(ক্লু.ক্লাক্স. ক্ল্যান ) নামে সংগঠন তৈরি করেছিলো। ভয়াবহ এই বাহিনী হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে খুন করেছিলো।ফ্রান্সে বিপ্লবের সময় রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকার অভিযোগ তুলে অবলীলায় খুন করা হয়েছিলো বহু মানুষকে। আমেরিকায় ১৯১৫ সালেও এই গণপিটুনি বিষয়টাকে মহিমান্বিত করা হতো। সেই হিংস্র জনতা দলবদ্ধভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তার ছবি তুলে পত্রিকায় প্রকাশ করতো। ২০০০ সালে জেমস অ্যালান নামে এক ভদ্রলোক প্রাচীন সময়ের লিঞ্চিংয়ের ১৪৫টি দুর্লভ ছবি অনলাইনে প্রকাশ করেছিলেন।

গভীর অসুখ আমাদের। সাপের মতোন চাকা চাকা দাগ ফুটে উঠছে শরীরে। এ যেন এক ঘোর ব্যাধি। কিন্তু আমরা মুখ ফিরিয়ে আছি। কেবল তাকিয়ে আছি নিজের দিকে। নিশ্চিত করতে চাইছি নিজের নিরাপত্তা, নিজের জীবনের মূল্য। কিন্তু নগরে আগুন লাগলে তো দেবালয়ও নিরাপদ থাকে না। কোথায় পালাচ্ছি আমরা? কার কাছ থেকে পালাচ্ছি? আমাদের-ই সম্মিলিত ভুলেই তো গড়ে উঠেছে এই দানবীয় সময়। সময়ের কাছ থেকে পালানো অসম্ভব।

আজকাল যেখানেই যাই শুনি, কেউ না-কেউ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। মাতৃভূমির স্মৃতি পেছনে ফেলে তারা লগ্ন হতে চাইছেন নিরাপদ প্রবাসে। কিন্তু সেখানেও কি এই ভয়ংকর সময় আমাদের তাড়া করছে না? যুদ্ধবাজ রাজনীতি, ধর্মের নামে হানাহানি আর এরই ফাঁকে ফায়দা লুটে নেয়া মহলের কারসাজি কতটুকু নিরাপত্তা দেবে পৃথিবীর মানুষকে! ভাবতে গিয়ে শিউরে উঠি মাঝে মাঝে। শেক্সপিয়ার তোর ম্যাকবেথ নাটকে এক জায়গায় লিখেছিলেন, ‘‘টাইম ইজ আউট অফ জয়েন্ট’’; সময় তার গ্রন্থি থেকেই বিচ্যুত হয়েছে। সময়ের জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে মানুষের শরীর, চিন্তা আর বিবেক। ভোগবাদী সমাজ কায়েমের যে কাড়ানাকাড়া বাজছে চারপাশে সে সুর অথবা আর্তচিৎকার তো আমাদের এমন পরিণতির দিকেই ঠেলে দেবে। পথ কোথায়? বেঁচে থাকার কৌশল কী হবে এই খুনের সময়ের হাত থেকে? আমরা এখনো জানি না! উত্তর জানতে বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে।

ইরাজ আহমেদ

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]