খুন হয়েছিলেন আলবেয়ার কামু

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইতালীয় কবি জিওভান্নি কাতেল্লি তার মাথার ভিতরে ঘুরতে থাকা চিন্তাটাকে আলোর মুখ দেখালেন প্রথম ২০১১ সালে। তখনও বইটা লিখে ফেলেননি তিনি।কিন্তু চিন্তা অনেককেই বেশ নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করলো। কারণ প্রসঙ্গ হচ্ছেন, নোবেল বিজয়ী ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক আলবেয়ার ক্যামু। জিওভান্নি দাবি করছেন এখন থেকে প্রায় ষাট বছর আগে গাড়ি দূর্ঘটনায় কামু‘র মৃত্যু হয়নি, তাঁকে খুন করেছিলো রুশ গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টরা। আঁতকে ওঠার মতো তথ্যই বটে।

আলবেয়ার কামু‘র উপন্যাস ‘দ্য আউটসাইডার’, ‘প্লেগ’, প্রবন্ধের বই ‘মিথ অফ সিসিফাস অথবা ‘দ্য রেবেল’ বিংশ শতাব্দীতে মানুষের চিন্তার জগতটাকে পাল্টে দিয়েছিলো। নৈরাশ্যবাদের অতল অনুসন্ধান থেকে শুরু করে বিদ্রোহের নন্দনতত্ত্ব আবিষ্কারের প্রচেষ্টা কামুর লেখাকে নিজের সমকালেই করে তুলেছিলো অনন্য। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে কামুর মৃত্যুর ঘটনা পৃথিবীর সাহিত্যমনষ্ক মানুষকে করেছিলো বিষন্ন।কিন্তু সেই মৃত্যুর এত বছর পরে আবারো নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমে এই মতের পক্ষে বিপক্ষে কলমও ধরেছেন অনেক গবেষক। এবার তাই প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো আলবেয়ার কামু‘র মৃত্যু নিয়ে ‘কামুকে খুন করা হয়েছিলো?’  

নোবেল বিজয়ের পর প্রাবন্ধিক আলবেয়ার ক্যামু

এ ধরণের আলোচনাকে পশ্চিমা বিশ্বে বলা হয় ‘কন্সপিরেসি থিওরি’। কবি জিওভান্নি কিন্তু শুধুই তত্ত্বে রুদ্ধ হয়ে থাকতে চাননি। এই ভাবনা অবলম্বন করে তিনি লিখে ফেলেছেন গোটা একটি বই-‘ডেথ অফ কামু’।বইয়ে তিনি জানিয়েছেন এই ভাবনার সূত্রপাত হয় চেকোশ্লভাকিয়ার বিখ্যাত কবি জেন জাবরানার ডায়েরি থেকে। জাবরানা তার ডয়েরিতে উল্লেখ করেছেন যে, খুব উচ্চপদস্থ এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র তাকে বলে কামুকে আসলে পরিকল্পনা করে খুন করা হয়েছিলো তখনকার রুশ প্রশাসনের উঁচু মহলের নির্দেশেই।

আউটসাইডার অথবা প্লেগ উপন্যাসের রচয়িতা আলবেয়ার কামু গাড়ি অ্যাসিডেন্টে মারা যান ১৯৬০ সালের ৪ জানুয়ারী। তার সঙ্গে একই গাড়িতে ছিলেন একজন প্রকাশক মিশেল গিলিমার্ড। দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিক ভাবে কামুর মৃত্যু হলেও গিলিমার্ড বেঁচে ছিলেন আরো একদিন। তারপর হাসপাতালে তারও মৃত্যু হয়।ফ্রান্সের ছোট্ট একটি শহর লে গ্রান্দ ফোসার্দ থেকে প্যারিসে ফিরছিলেন তারা ছুটি কাটিয়ে। সেই ফেরার পথেই কামুর জীবনের পথ সংক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিলো। ঝড়ের গতিতে ছুটতে থাকা গাড়ির অ্যাক্সেল আচমকাই ভেঙে যায়। ছুটন্ত গাড়ি পথের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারায়। তারপর ফুলস্টপ। দুমড়েমুচড়ে যাওয়া গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় আলবেয়ার কামুর প্রাণহীন দেহ আর তার আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘দ্য ফার্স্টম্যান’ বইটির পাণ্ডুলিপির ১৪৪টি পৃষ্ঠা।পরে এই অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি থেকেই কামু‘র কন্যা ক্যাথারিন ১৯৯৫ সালে বইটি প্রকাশ করেন।

মৃত্যুর মাত্র তিন বছর আগে কামু সাহিত্যে অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার পান।

দুর্ঘটনা কবলিত গাড়িটি

চেক কবি জেবরানা ১৯৮০ সালের প্রায় ফুরিয়ে আসা এক গ্রীষ্মে নিজের ডায়েরিতে আলবেয়ার কামুর মৃত্যু বিষয়ে কতগুলো কথা লিখেছিলেন। আর সেই ডায়েরিই হচ্ছে কাতেল্লির ভাবনার মূল সূত্র। সিম্প্রতি প্রকাশিত বইতে কাতেল্লি লিখেছেন, জেবরানের ডায়েরি পড়তে পড়তে তিনি আবিষ্কার করেন কামুর মৃত্যু বিষয়ক এই অভিনব তথ্য। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় লেখা আছে, কোনো একটি যন্ত্র দিয়ে সেই গাড়িটির চাকার স্ক্রু আলগা করে রেখেছিলো রুশ এজেন্টরা। আর তাতেই মহাসড়ক ধরে দ্রুতগতিতে ছুটতে থাকা গাড়িটি দূর্ঘটনা কবলিত হয়। জেবরান এই তথ্যের উৎস হিসেবে ইঙ্গিত করেছেন তার পরিচিত একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার প্রতি। কিন্তু সেই কর্মকর্তার পরিচয় রহস্যময় ভাবে তিনি রেখে দেন অন্ধকারেই।সেই দিনলিপিতে তিনি এই পরিকল্পিত দূর্ঘটনা ঘটানো এবং কামুকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনাকারীর নামও উল্লেখ করা আছে। তৎকালীন সোভিয়েত রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রি শেপিলভই নাকি ছিলেন সেই অপকর্মের নায়ক।

প্রশ্ন উঠেছে, সোভিয়েত রাষ্ট্রযন্ত্র কেন হঠাৎ করেই সে সময় আলবেয়ার কামুর খুনের পরোয়ানা জারি করেছিলো? নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি লেখা ছেপেছে। সেখানে এই তত্ত্বকে প্রায় উড়িয়েই দেয়া হয়েছে। কিন্তু জেবরান লিখেছেন, ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরিতে রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কামুর একটি লেখা প্রকাশি হয়েছিলো ফরাসী পত্রিকায়। সেই লেখাটিই নাকি রুশ প্রশাসনের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।কামু তখন প্রকাশ্যেই হাঙ্গেরিতে রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করছিলেন। পাশাপাশি তিনি রাশিয়া থেকে বিতাড়িত লেখক বরিস পাস্তারনাকের পক্ষেও দাঁড়িয়েছিলেন। আর তাতেই সেই ঠাণ্ডা যুদ্ধ’ বলে কুখ্যাত সময়ে রুশ প্রশাসন কামুকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করে!

কাতেল্লির ভাষায় রহস্যময় দূর্ঘটনা ও খুন নিয়ে তিনি নিজেই গবেষণা করেছেন। কথা বলেছেন অনেকের সঙ্গে। ইতালীর এক বিখ্যাত ব্যারিস্টার গুইলোয়ানি স্পাজিলির সঙ্গে কথা বলেন। এই ভদ্রলোক আবার বিতর্কিত ফরাসী উকিল জ্যাঁক ভার্গিসের সঙ্গে কথা বলেন এই বিষয় নিয়ে। ভার্গিসের মৃত্যুর বেশ অনেক পরে কাতেল্লির সঙ্গে কথা হয় স্পাজিলির। তিনি জানান, কামুর মৃত্যু যে রহস্যের আবরণে ঢাকা সেটা ভার্গিস প্রথম বলেছিলেন। তিনি স্পাজিলিকে জানিয়েছিলেন, তিনি নিশ্চিত গোটা অ্যাকসিডেন্টটি ছিলো সাজানো এবং তাতে ফরাসী গোয়েন্দাদেরও সম্পৃক্ততা ছিলো।

কাতেল্লি বইতে লিখেছেন, রাশিয়ার তখনকার সাম্রাজ্যবাদী অবয়বকে কামু আক্রমণ করেছিলেন প্রকাশ্যেই। তার লেখা এবং সমালোচনা রুশদের জন্য একটি বিষফোঁড়া হয়েই দাঁড়িয়েছিলো। তাই তারা কামুকে পৃথিবী থেকে সরানোর পরিকল্পনা করে।

বিশ্বখ্যাত এই সাহিত্যিকের কন্যা ক্যাথারিন অবশ্য লেখকের এই সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। বাবার মৃত্যুকে ঘিরে কোনো ধরণের রহস্যের আবরণ আছে সেটা তিনি মনে করেন না। একই ভাবে বেশ কয়েকজন গবেষকও কাতেল্লির আবিষ্কিৃত তত্ত্বের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তবুও আলোচনা শুরু হয়েছে নতুন করে। প্রশ্ন জেগেছে কামুর মৃত্যুর সঙ্গে আসলেই কি কোনো রহস্য জড়িয়ে আছে? কামু তো নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বেলেছিলেন, তার কাছে মনে হয় মানুষের সবচাইতে অর্থহীন মৃত্যু হলো গাড়ি দূর্ঘটনায মারা যাওয়া।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্র ও ছবিঃ দ্য গার্ডিয়ান, গুগল  

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]