খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি আমার মনে বলবো কি করে

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

আমার ছেলে মাশুক আর ওর বউ

সন্তান বুকে নিয়ে আমার জীবন কেটে যাচ্ছিলো আনন্দেই।সবাই গিফট আনছিলো আমার মাশুকের জন্য।মায়ের মন তো, নিজের জীবনের আর সব প্ল্যান ভুলে গিলে খেয়ে বসে আছি।বাচ্চাকে কিভাবে সুস্থ ভাবে বড় করা যায় সে চিন্তা ছাড়া আর কিছুই মাথায় ছিলো না।গান গাওয়া ও বন্ধ ছিলো আবার গাওয়ার ডাক আসলেও আমি গাইতে চাইনি।এতো টুকু বাচ্চা ফেলে কোথাও যেতে চাইনি।মাশুক কে যে-ই দেখতে আসতো সেই বিস্মিত হতো। এতো সুন্দর শিশু কোত্থেকে এলো! আমি মাশুক কে পায়ের ওপর ফেলে গায়ে তেল মাখতাম,মায়ের হাতে পেড়ানো কাজল এঁকে ছড়া কাটতাম, বলতাম পার হয়ে কত নদী কত যে সাগর কোথা থেকে এলি তুই শিশু যাদুকর! সত্যিই আমার সন্তান আমার কাছে যাদুকর ই ছিলো। কি শান্ত, কি মিষ্টি, আমি ভাবতেই পারছিলাম না এটা আমার সন্তান! এটা ভেবেই আমি বলতাম হে আল্লাহ, কতই তুমি দিলা আমায় বিনা কারণে! মাশুকের জন্মের এক দেড় মাসের মধ্যে আমার স্বামী মধুমিতা মুভিজের চলচ্চিত্রে সুর করার কাজ পেলেন। একটা ঘরে বসেই আমি বাচ্চা সামলাই,উনি গান সুর করেন। গানের গীতিকার এলে আমি বাচ্চা নিয়ে শাশুড়ির ঘরে বসে থাকি, উনি গীতিকার এর সঙ্গে গান রেডি করেন। এভাবে মোটামুটি ছয়টি গান সুর করা হলো। ছবির মহরতের গান গাইবেন এন্ড্রু কিশোর দাদা।সঙ্গে কে গাইবে জানিনা।

রেকডিং-এ

আমাকে আমার স্বামী কিছুই বলেন নাই।আমিও কখনও বলবো না যে এই গান আমাকে দিয়ে গাওয়াও।এমন অভ্যাস আমার কখনও গড়ে ওঠে নাই।নির্দিষ্ট দিনে গান রেকর্ড হবে তার আগে দিনাদুয়েক রিহার্সাল হয়েছে। রেকর্ড হবে স্রুতি স্টুডিও তে।বিশাল ব্যাপার। যেদিন রেকর্ড হবে তার আগের দিন আমার স্বামী ছবির মিউজিক ডিরেক্টর বললেন এই গান কিশোর’দার সঙ্গে তুমি গাইবে।খুশি হবো কি , ভয়ে অস্থির হয়ে গেলাম।কারণ বাচ্চা হওয়ার জন্য অনেক দিন আগে পরে গানের সঙ্গে সম্পর্কহীন আমি।সেই আমি গান গাইবো কন্ঠরাজ কিশোর দাদার সঙ্গে! নিজের আত্মবিশ্বাস আমার কখনও কম না কিন্তু অনভ্যাস জনিত কারণ আমাকে দ্বিধায় ফেলে দিচ্ছে।যাইহোক, সকাল থেকেই শ্রুতি স্টুডিও তে গান তৈরি হচ্ছিলো, আমি গেলাম সন্ধ্যায়, আমার যাওয়ার পর কিশোর দাদা এলেন। ওইদিনই আমি ওনাকে সামনাসামনি পয়লা দেখলাম। এতো বড় একজন শিল্পী, শ্রমিকের মতো তার আচরণ। ঠিক সময় এ এসে জায়গা মত বসে মেশিনের দক্ষতায় গান তুললেন। বিজনেস এক্সিকিউটিভ দের মতো সুন্দর একটা চামড়ার ব্যাগ থেকে কাগজ কলম বের করে গান নিজ হাতে লিখলেন এবং নিমেষেই তুলে নিলেন।

আমাকেও নাম ধরে ডাকছিলেন যেন কতদিনের চেনা আমি।গানের জন্য গলা খুলতেই বাজীমাৎ! কি ভয়ংকর সুন্দর কণ্ঠ, যেনো সারা স্টুডিও তে তরল সোনা গলে গলে আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। আমি যে কিশোর’দার মতো বিশাল শিল্পী দেখে ভয়ে কুকড়ে গেছিলাম তা নয় , আমি ভয় পাচ্ছিলাম আমার দূর্বল শরীর নিয়ে।এবং সত্যিই দু’এক জায়গায় আমি আমার মন মতো ডেলিভারি দিতে পারছিলাম না।কেউ টের না পেলেও আমি সন্তুষ্ট ছিলাম না।গান শেষ করলাম। অবশ্যই একটি তৃপ্তিদায়ক অধ্যায় ছিল। স্বামী সুরকার, এন্ড্রুকিশোর কো-আর্টিস্ট , শ্রুতি স্টুডিওতে রেকর্ড, বাঘা বাঘা মিউজিশিয়ানদের বাদন! সত্যিই আমার জীবনে একটি মাইল ফলক। কিন্তু শারীরিক দুর্বলতার জন্য শুধু মনে হচ্ছিলো এতো দিন পর আবারও গাইলাম কিন্তু মনমতো হলো না।এটাকেই আসলে শিল্পীর” অতৃপ্ত হৃদয়” বলে। অনেক কিছু ঠিকঠাক হলেও মনে হয় কি যেন বাকী রয়ে যায়। সত্যিকার অর্থে এ জীবন তো গান গেয়েগেয়েই পার করলাম কখনও ভুল গেয়েছি কখনও ঠিক ভাবে গাইতে পেরেছি। কিন্তু এই খুঁতখুঁত ভাব আমার কখনও যায়নি।আমার বিশ্বাস যখনি আমি তৃপ্ত হবো তখনই আমার শিল্পী স্বত্বার মৃত্যু হবে।আমার মৃত্যুর আগে আমার স্বত্বার মৃত্যু হোক এ আমি কখনও চাইনা।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে