গঙ্গার তীরবর্তী এক শহর কাশী

মৃদুলা মুখোপাধ্যায়
লেখক

বর্তমানে বারাণসী নামের এই নগরী ভারতবর্ষের এক প্রাচীনতম নগরী। পুরাণে এই নগরীর উল্লেখ আছে কৌশল জনপদ রূপে। ঋগ্বেদ, অথর্ববেদে ও এই নগরীর উল্লেখ আছে। জ্ঞান, ধন, মোক্ষ ও ভারতীয় সংস্কৃতির অতি পুরাতন পীঠস্থান এই কাশী নগরীতে অতি বিদ্বজন, জ্ঞানী গুণী পন্ডিতদের বাসস্থান ,টোল ( শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) এবং আশ্রম ছিলো।

বরুণা এবং অসি গঙ্গার এই দুই উপনদী বেষ্টিত কাশী নগরী গঙ্গার তীরবর্তী এক শহর। কাশীতে গঙ্গার ধারা দক্ষিণ থেকে উত্তরমুখী। কাশী নগরীর গঙ্গার তীর অসংখ্য ঘাটের সমন্বয়। প্রধানঘাট দশাশ্বমেধ ছাড়াও মণিকর্নিকা ঘাট, হরিশ্চন্দ্র ঘাট, অস্সি ঘাট, সিন্ধিয়া ঘাট, পঞ্চগঙ্গা ঘাট অন্যান্য ঘাটগুলির মধ্যে বিখ্যাত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজা মহারাজা এবং সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ঘাট গুলিকে পুনঃ নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করিয়েছেন। প্রত্যেকটি ঘাটের স্বতন্ত্র ইতিহাস আছে যা গল্পের ছলে লোকমুখে আজও প্রচলিত।

পুরাণ মতে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার দ্বারা দশটি অশ্বের বলি এবং যজ্ঞ সম্পন্ন হয় দশাশ্বমেধ ঘাটে।দক্ষ রাজার যজ্ঞ সভায় দেবী সতীর আত্মাহুতি এবং দেবাদিদেব মহাদেবের দেবীর পার্থিব শরীর নিয়ে তান্ডবের গল্প কারো অজানা নয়। অতঃপর বিষ্ণুদেব সুদর্শন চক্রের দ্বারা দেবীর শরীরের ৫১টি খন্ড করেন যা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে পড়ে একান্নটি শক্তিপীঠের সৃষ্টি হয়। দেবীর কানের অলঙ্কারের মণি যে ঘাটটিতে পড়েছিল সেই ঘাট মণিকর্নিকা ঘাট নামে পরিচিত।

কৌশল রাজ্যের রাজা মহা জ্ঞানী দাতা হরিশ্চন্দ্রের গল্পও কারো অজানা নয়। বিশ্বামিত্র মুনিকে নিজের সর্বস্ব ( রাজ্য, ধন, সম্পত্তি) দান করে তিনি গ্ৰাসাচ্ছাদনের জন্য এই মণিকর্নিকা ঘাটে চন্ডালের পেশায় নিজেকে নিযুক্ত করেন। এদিকে তাঁর স্ত্রী শৈব্যা যখন পুত্র রোহিতাশ্বকে নিয়ে জঙ্গলে জঙ্গলে ভ্রাম্যমান তখন ঝড় ঝঞ্ঝার এক রাত্রে সর্পদংশনে রোহিতাশ্বের মৃত্যু হয়। সেই মৃতদেহ সৎকারের জন্য শৈব্যা মণিকর্নিকা ঘাটে পৌঁছালে বিদ্যুতের আলোয় স্বামী স্ত্রী পরস্পরকে চিনতে পারেন। সর্বদা সত্যনিষ্ঠায় অচল রাজা হরিশ্চন্দ্র নিজের হাতে সন্তানের পারলৌকিক ক্রিয়ার্থে যেই মুহূর্তে সন্তানের মুখাগ্নি করতে যান সেই মুহূর্তে দেবতারা তাঁর কর্তব্যনিষ্ঠায় সন্তুষ্ট হয়ে রোহিতাশ্বকে পুনর্জন্ম দান করেন এবং ঋষি বিশ্বামিত্র রাজা হরিশ্চন্দ্রকে তাঁর যাবতীয় রাজ-পাট ফিরিয়ে দেন।

কাশীতে মণিকর্নিকা এবং হরিশ্চন্দ্র এই দুই ঘাটে আজ ও দাহ সংস্কার হয়ে থাকে। কথায় আছে মণিকর্নিকা ঘাটের চিতার আগুন কখনো নেভে না এবং সেটা যে সত্য তার চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা হয়েছে।পুরাণ মতে কাশীতে মৃত্যু হলে আত্মার মোক্ষ লাভ অবশ্যম্ভাবী। জীবন মরণের এই সীমারেখায় যতবার পা রেখে দাঁড়িয়েছি ততবারই সেই চূড়ান্ত মুক্তির স্বাদ আস্বাদনের ইচ্ছে হয়েছে। কিন্তু উপলব্ধি শক্তি জানিয়েছে এখনও কর্মযজ্ঞের সমাপ্তি ঘটেনি। নশ্বর শরীরে প্রত্যাবর্তন করতে করতে বারংবার মন বলেছে-

“আরো কতদূরে আছে সে আনন্দধাম

আমি শ্রান্ত, আমি অন্ধ, আমি পথ নাহি জানি” !!

কাশী বা বেনারস- সমস্ত শহরটাই গলি সর্বস্ব। অবশ্য বর্তমানে শহরের সীমারেখা ব্যাপ্ত হয়েছে- কারণ শহরের আধুনিকীকরণ হচ্ছে।

এটি আমার তৃতীয় বার বেনারস ভ্রমণ। শহরটিতে বর্তমান সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের পর প্রথমবার যাওয়া। এবারে গিয়ে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের বাইরে বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলুম- কিছুই বোধগম্য হয়নি। কোথায় সেই বিশ্বনাথ গলি! কোথায় সেই বিশ্বনাথধাম! মন্দিরের সামনের গলি এখন মোটামুটি চওড়া রাস্তা আর মন্দির প্রাঙ্গনের আধুনিকীকরণে প্রাচীন শিল্পকর্মের অপ্রতুলতা।

কথায় বলতো- কাশীর গলি, ষাঁড় আর বিশ্বনাথধাম- এই তিন হি কাশীকা পহচান। তবে হ্যাঁ,গঙ্গার তীরবর্তী শহরের অংশে গলি এখনও বিদ্যমান। সেই গলিতে মন্দির, বাসস্থান, খাবারের দোকান, ব্যবসা বাণিজ্য মানে সেই tradition আজ ও সমানে চলেছে কিন্তু রঙটা কিছুটা ফিকে হয়ে এসেছে । আমার মতো যারা সত্তর, আশির দশকের বেনারস দেখেছেন তাঁরা পুরোনো শহরটার সঙ্গে নতুন বেনারসকে মেলাতে সক্ষম হবেন কি? সন্দেহ আছে!

ঘাটের সঙ্গে লাগোয়া ঘাট- আগে অনায়াসেই এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে হেঁটে যাওয়া যেতো। এখন কিছু কিছু ঘাটের আধুনিকীকরণের জন্য ঘাটের সঙ্গে ঘাটের যোগাযোগ আপাতত বিচ্ছিন্ন। বড় রাস্তা দিয়ে ঘুরে যেতে হয়। তবে সকাল সন্ধ্যে দশাশ্বমেধ ও মণিকর্নিকা ঘাট থেকে সিন্ধিয়া ঘাট (এখানে গঙ্গার তীরে পূবমুখো একটি হোটেলের প্রশস্ত ছাদ সমেত চারতলার একটি বড় ঘরে দুরাত কাটিয়ে এলুম) অবধি গলি ঘুপচি দিয়ে হেঁটে বেড়িয়েছি, street food খেয়েছি। গা ঘেঁষে গরু, মোষ, ছাগল, কুকুর এমনকি মৃতদেহ বাহকেরা চলে গেছে- এতটুকু অস্বস্তিবোধ হয় নি।

স্মৃতির বাক্স প্যাঁটরা হাতড়ে সেই পুরোনো গন্ধটা খোঁজার চেষ্টা করে গেছি। আধুনিকীকরণ অবশ্যই ভালো- উন্নয়নের লক্ষণ। মানিয়ে চলতে না পারলেই বিপদ! বুঝতে পারছি বয়স বাড়ছে। মন বারবার পেছনে ফিরতে চাইছে… নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বাঁচতে শিখছি…।

ছবি: লেখক

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box