গল্পটা কিসের যেন! 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

দীপা ফিরোজ

ইথিওপিয়াতে এই আমার প্রথম দীর্ঘ সফর।

আমার আফ্রিকার কাউ্নটার পার্ট এঙ্গয়ার আমন্ত্রণে এবারের এই সফর। আমি যেখানে গোটা বাইশ নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছি ও সেখানে ৪৭ টি আফ্রিকান দেশের আঞ্চলিক উপদেষ্টা। ‘হলি কাউ!’ – আমি বলেছিলাম, যখন এঙ্গয়ার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষণের জন্য আয়োজন করা হয়েছে একটি উচ্চ পর্যায়ের মিটিং। আর আমার সম্পর্কে একটি বিভ্রান্তিকর ধারনার কারনে আমার এই কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা।

 ‘you are always very convincing in negotiations – এই ছিলো আমার ব্যাপারে এঙ্গয়ার আগ্রহের কারন। ওর  মতে জটিল বিষয়ে আমার ব্যাখ্যা শুনলে ওর নিজেরি নাকি কাজগুলো খুব সহজ মনে হয়!!যা আছে নিয়ে কাজে ঝঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। এই দেশে এক বিশাল প্রজেক্ট শুরু করতে যাচ্ছে ও। সেই কাজের সংশ্লিষ্ট সকলকে ‘রাজি’ করানোর দায়িত্ব আমার। আহা! আমার এই প্রতিভা যদি আমার সঙ্গে দীর্ঘদিন বসবাস করা স্থপতিটির ব্যপারে কাজে লাগানো যেতো!

 অনেকভাবে চেষ্টা করলাম ওকে নিরস্ত্র করতে যে এই বেলা থাকুক। কাজ হলোনা। অতঃপর নিগসিয়েশনের যাবতীয় স্কিল আর গাট্টি বোঁচকা বেঁধে আবার প্লেনে ওঠা।

 এঙ্গয়ার যেমন আমার সম্পর্কে মিথ, আমারও ইথিওপিয়া সম্পর্কে তেমনি কিছু মিথ আছে। আমার মিথগুলোকে গুছিয়ে বললে এরকম হবেঃ

 – ইথিওপিয়ান মানুষা অসম্ভব বিনয়ী এবং আবেগপ্রবণ মাঝে মাঝে যা সামাল দেয়া কষ্টকর

 – এই দেশীয় খাবার অত্যন্ত উপাদেয় (আমি প্রথম ইথিওপিয়ান খাবার খাই জিবুতি নামক একটি দেশে এবং দ্বিতীয়বার আমেরিকাতে)

 – হামেশা এরা বাংলাদেশী মানুষের প্রতি একধরণের গভীর মমতা ধারন করে থাকে। । এই ব্যপারে পরে একসময় লিখবো।

 – এদের কটন অর্থাৎ সুতী কাপড় এবং কফি অসাধারণ

 এই মিথ সঙ্গে নিয়ে আমি আদিস আবাবার বোলে এয়ারপোর্টে এক মাঝরা্তে নাজেল হলাম।

 লাগেজ নিয়ে বের হয়ে দেখি এঙ্গয়া হাজির। রাতের ঘুম বরবাদ করে সে এয়ারপোর্টে এসেছে আমাকে হোটেলে পৌঁছে দেয়ার জন্য। দেশটিতে তখন জরুরী অবস্থা জারী হয়েছে। হোটেলে নামিয়ে প্রথমেই আমাকে সে সতর্ক করলো ‘খবরদার সন্ধ্যায় একা একা রাস্তা ঘাটে হাঁটাহাঁটি করবে না। তোমার আবার সিকিউরিটি না মানার ব্যাপারে ‘সুনাম’ আছে! এখন রেস্ট নাও কাল দেখা হবে।’ এই বলে হুশ করে বেরিয়ে গেলো আমার তাঞ্জানিয়ান সহকর্মী।

 আমি আমার ‘সুনাম’ অক্ষুন্ন রাখার জন্য সারাদিন এক লম্বা ঘুম দিয়ে উঠেই মাগরিবের নামায পড়ে ওয়াকিং শু পায়ে গলিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে পরলাম। উদ্দেশ্য সান্ধ্যকালীন হাঁটাহাঁটি। পাহাড়ের গায়ে চমৎকার হোটেল। হোটেলের সামনের রাস্তা ঢাল হয়ে নেমে গেছে নিচে। আমি ঢাল বেয়ে নামছি আর মনে হচ্ছে চিটাগাং এর কোনও রাস্তা। যাচ্ছি তো যাচ্ছি পথের কোন শেষ নেই। আমারও কেমন যেন নেশা ধরে গেছে হাঁটার। একসময় মনে হলো চারদিকে আর কিছু দেখতে পাচ্ছিনা। চোখ রগড়ে বুঝলাম বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। আশেপাশে কাউকেই দেখতে পাচ্ছিনা। একটু যে গা ছম ছম করছেনা তা ঠিক বুকে হাত দিয়ে বলতে পারছিনা। এখন কি করা! এতদিন লোকজনকে দুর্যোগ প্রস্তুতির জন্য নানারকম উপদেশ দিয়ে আসছি এখন এই তীব্র তীক্ষ্ণ গভীর অন্ধকারে ইথিওপিয়ার এক পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে নিজেকে নিজে সেই সব কিছু উপদেশ দিলাম। তাতে খুব লাভ হলো বলে মনে হলোনা। এবার আমার ব্রহ্মাস্ত্র আয়াতুল কুরসি পড়ে তিনবার বুকে ফুঁ দিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। যে রাস্তাটাকে এতক্ষণ মনে হচ্ছিলো একটা মাত্র সরল রাস্তা সেটা ফেরার সময় দেখা গেলো কি করে যেন অজস্র শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে দিয়েছে। জ্ঞান হবার পর থেকেই দেখছি দিক নির্দেশনার ব্যাপারে আমার বুৎপত্তি মোটামুটি বেসলাইনেরও নিচে। তারপর ও এদিক ওদিক তাকিয়ে অনুমানের উপর নির্ভর করে প্রথম গোলচক্কর থেকে সোজাসুজি উপরদিকের রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকলাম। বেশ কিছুক্ষন হাটার পর মনে হলো দূরে রাস্তা ক্রমশ গভীর জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেছে। এর মধ্যে বেশ কিছুটা দূরে দু’টো নীল আলোর বিন্দু দেখা যাচ্ছে। আমার নিতান্তই মধ্যমানের বুদ্ধিবৃত্তি দিয়েও বুঝতে অসুবিধা হলোনা যে ওই চোখ দুটো শেয়াল মামা ছাড়া আর কারো নয়। আশপাশ জনহীন হলেও জীবহীন যে নয় সেটা বোঝার জন্য কোনো গবেষণা করতে হলো না। এই জীব পরিবেষ্টিত গভীর জঙ্গলে এসে আমার সবচেয়ে প্রথম মনে হলো এবার যদি কোনোভাবে বেঁচে ফিরতে পারি তবে আমার ইস্তফা পত্র আর কেউ আটকাতে পারবেনা। এই ঘোরাঘুরির চাকরীর এখানেই পরিসমাপ্তি। এই সিদ্ধান্ত নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো সাহস বেড়ে গেল কয়েকশ গুন! নিজেকে খুব হাল্কা লাগলো। আমি আমার জানা সব দোয়াদরূদ পড়ে শেষ করে ফেললাম। ছোটবেলার আরবি পড়ানোর হুজুরকে এই প্রথম মনে হলো ‘লোকটা খারাপ ছিলনা’!

এরই মধ্যে উপরের রাস্তাটাতে হাঁটতে হাঁটতে অনেকদুর চলে এসেছি। কোন এক অজ্ঞাত কারনে কিছুতেই হোটেল খুঁজে পাচ্ছিনা। আমার বার বার মনে হচ্ছে এই রাস্তার উপরেই হোটেলটা ছিলো। এইতো সেই জাকারান্ডা গাছের সারি!! আমি আরেকটু উপরে উঠলাম। আরেকটু হলেই পা পিছলে কোথায় যেয়ে যে পড়তাম! আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার নিচেই গভীর খাদ। এক লাফে পিছিয়ে এলাম। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়লো যে আমার পকেটে একখানা স্যাটেলাইট ফোন আছে যেটা দিয়ে আমি দিব্যি আমার লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি! বুঝলাম যে এতক্ষণে আয়াতুল কুরসির ফল পেতে শুরু করেছি!! পকেটে হাত দিয়ে দেখি ফোনটা নেই। আমি হাঁটার উদ্দেশ্যে বেড়িয়েছি তাই আমার সিকিউরিটি জ্যাকেট হোটেলেই ফেলে এসেছি। আর জ্যাকেটের পকেটেই আছে আমার ফোন। দোয়া দোরুদ পড়ে অর্জিত সমস্ত সাহস এক নিমেষে কোথায় যেন উবে গেলো। এই সময়ই প্রথম বাজটা পরলো। প্রচণ্ড শব্দে চারদিক আলোকিত করে বাজ পরার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হলো ঝমঝম বৃষ্টি।  বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেও মনে হলো কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। এই জীবন এখানেই শেষ এই ভেবে আমি একটা গাছের নীচে এসে দাঁড়ালাম। অন্তত বাজ পরে মৃত্যুর হাত থেকে তো বাঁচতে পারবো!

 কতখন ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম ঠিক মনে করতে পারছিনা। হঠাৎ দেখি দূরে একটা গাড়ীর হেডলাইট! এই নিকষ অন্ধকারেও কেন যেন আলো দেখে খুশী হতে পারছিনা। মনে অজানা ভয়। ভুতের যে দুয়েকটা সিনেমা দেখেছি তার সবগুলোই এ্কসঙ্গে মনে পড়তে থাকলো। ভুতের সিনেমার কথা ভেবে শেষ না হতেই হেডলাইটের আলো এসে আমার গায়ে পড়লো। আমি ঠিক সিনেমার মতই হাত দিয়ে চোখ ঢাকলাম। বৃষ্টির প্রচন্ড আওয়াজের মধ্যেও একটি তীক্ষ্ণ চিৎকার শোনা গেলো।

 ‘ডক্টর ডক্টর জলদি গাড়ীতে ওঠো’।

 আমার জানে পানি আসলো। যাক বাবা আমাদেরই লোকজন, আমাকে চেনে!গাড়ী থামার সঙ্গে সঙ্গে আমি লাফ দিয়ে গাড়ীতে উঠে গেলাম। গাড়ীর চালকের গায়ে রেইনকোট। নীচু হয়ে স্টিয়ারিং হুইলের উপর ঝুঁকে গাড়ী চালাচ্ছে।  বৃষ্টির আওয়াজে গাড়ীর ভেতরে বসেও কিছু শোনা যাচ্ছেনা। ড্রাইভারের চিৎকার শুনলাম আবার -‘তুমি টিস্যু দিয়ে মাথার পানিটা অন্তত মোছো!’ – বলেই সে আবার গাড়ী চালাতে থাকলো।

 আধা ঘন্টার মধ্যে গাড়ী এসে হোটেলের দরজায় দাঁড়ালো।আমি গাড়ীর দরজা খুলে এক দৌড়ে লিফটের দিকে ছুটলাম। লিফটের বোতাম টিপতেই আমার মনে পড়লো যে ড্রাইভার কে ‘থ্যাঙ্কু’ বলা হয়নি। আমি আবার ছুটলাম হোটেলের দরজায়। দেখি গাড়িটা নেই। সিকিউরিটি গার্ডকে জিজ্ঞেস করলাম

 ‘যে গাড়ীটা আমাকে পৌঁছে দিলো সে গাড়ীটা কোথায়?’

 সিকিউরিটি গার্ড দু’চোখ কপালে তুলে আমার দিকে তাকিয়ে বল্লো ‘কোন গাড়ী! তুমিতো এইমাত্র বৃষ্টির মধ্যে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে হোটেলে ঢুকলে। আমিতো তোমাকে দেখে নিজেই অবাক!’

‘ও মাই গড’

এই প্রথম ভেজা চুপচুপে কাপড়চোপড় নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে আমার প্রচন্ড কাঁপুনি দিয়ে শীত করতে থাকলো।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]