গল্পের পেছনের গল্প

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

জাতীয় পুরষ্কার পাওয়ার পরে আনন্দিত হওয়ার বদলে কেমন যেন আতংকিত হয়ে গেলাম। বুঝতে পারছিলাম কাঁধে আরও দায় এসে ঠেকলো।এরপর আমাকে আরও ভালো করে গান গাইতে হবে।প্রতিটি গানই আমি একদম নিজের করে, নিজের ভেবে খুব যত্ন করে গাই।কিন্তু এখন থেকে আমাকে প্রতিটি গানের প্রতিটি লাইনের সুরের ফাঁকে নিশ্বাস গুলোও যত্নে প্রক্ষেপণ করতে হবে। গানের চাপে অথবা গানের চিন্তার চাপে মনে একটা আতংক কাজ করা শুরু হলো। গান রেকর্ডিং আছে শুনলেই একটা চুইংগাম এর মতো সর্দি আমার নাকের গোড়ায় আটকে যায়! রেকর্ডিং এর আগে গার্গল করি,ভ্যাপার নেই,মেন্থল টানি নাকে,তুলসীপাতা আদা মধু বজ যষ্টিমধু খাই,কিন্তু নাকের চুইংগাম সরেনা।নাক টানলে নাকের গোড়ায় সর্দির অনুভবটা খট করে ওঠে কিন্তু সেখান থেকে আর নড়েনা। একজন বললেন গানের আগে কুসুম গরম লবন পানি ড্রপার দিয়ে নাকে টানতে।কি যে বিশ্রী অনুভূতি হতো এই নাকে স্যালাইন ঢালতে! তবুও আমি সেটাই করি।এমনিতে নর্মালই থাকি।যেই খান সাহেব বলেন রেকর্ডিং আছে অমনি সেই নাকের গোড়ার চুইংগাম আমাকে জ্বালায়। আমি পর্যুদস্ত হয়ে যাচ্ছিলাম। শ্রদ্ধেয় সুরকার সংগীত পরিচালক আলাউদ্দিন আলী ভাই বললেন রাতে ঘুমানোর সময় কান ঢেকে যেন ঘুমাই।ফ্যানের বাতাস যেন কানে না ঢোকে।আমি তাই করি।এমন জায়গায় ঘুমাই যেন ফ্যানের বাতাস সরাসরি না লাগে।ঘুমানোর বিছানার দিক পরিবর্তন করি।এবং নরম একটা ওড়না দিয়ে গলা কান সব ঢেকে গুটিশুটি হয়ে ঘুমাই।কিন্তু মুশকিল হলো আমার এক ঢাল চুল! সেই চুল ধুতেও লাগে অনেক সময়, শ্যাম্পু করতে খান সাহেব বাথরুমের বাইরে থেকে চেঁচাতে থাকেন আর ভিজোনা আর ভিজোনা অথচ শ্যাম্পু না করলে আমার চুলই শুকায় না। এগুলো যে কতবড় পরস্পর বিরোধী অসুবিধা, তা আমি ছাড়া কেউ বুঝবেনা।ইএনটি ডক্টর বললেন বারবার ঠান্ডা লাগা বা নাকের গোড়ায় চুইংগাম প্রবলেম কেটে যাবে কিন্তু আমার চুল কেটে ছোট করতে হবে।এমন ছোট যে ঘাড়ের কাছে কোন চুল থাকবেনা। বয় কাট টাইপ আর কি।আমি বলতে চাইলাম লাগলে গানই ছেড়ে দেবো কিন্তু তা কি আমি বলতে পারবো? কারণ গান আমার অক্সিজেন, আমার জীবিকা এবং তারচেয়ে ও অনুচ্চারিত কিছু শক্তি।আমি বুঝলাম ডক্টর কিছু করতে পারবেন না। চুল একদিন ভিজাই তো তিনদিন ভিজাই না।হেয়ার ড্রায়ার আমি সহ্য করতে পারি না।আমার মাথা ধরে। আমি আরও কেমন যেন পায়ে জটবাঁধা অসহায় মুরগী হয়ে গেলাম। হিসাব করে গোসল, হিসাব করে শ্যাম্পু, শোওয়ার সময় ওড়না পেঁচানো, ফ্যানের উল্টাদিকে ঘুমানো, কথা কম বলা, ঠান্ডা কিছুই না খাওয়া আর আরও বেশি ভালো করে গান গাওয়া, কোথাও বেড়াতে না যাওয়া এগুলো আমার উপর চেপে বসলো। কারণ জাতীয় পুরষ্কার পাওয়ার পরে আমার প্লেব্যাক এর সংখ্যা ভয়াবহ ভাবে বেড়ে গেলো এবং সবারই প্রচেষ্টা দাঁড়ালো আরও ভালো গান আমাকে দিয়ে গাওয়ানোর। একটা ভারী পুরস্কার হাতে নিয়ে হাসিমুখে হতভম্ব আমি জীবনের পথে জীবনের জন্য দাঁড়িয়ে রইলাম নিজেকে নিজের বোঝা হিসেবে জেনে বুঝে কাঁধে নিয়ে।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]