গল্প নয় 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

জেরীন  আফরীন

আমি জন্মের পর থেকেই আলাদা করে সবার গন্ধ পাই।বিষয়টা নিশ্চয়ই ভাবছেন ভীষণ হাস্যকর কিংবা অবান্তর। আসলে আমার ক্ষত্রে কিছুটা ভিন্ন ,আমি প্রতিটি মানুষকে তার শরীরের গন্ধ দিয়ে আলাদা করতে পারি।কেমন গা গুলানো ব্যাপার তাই না। জানেন আমিও বিষয়টা  নিয়ে  ভীষণ অস্বস্তিতে থাকি। কিছু কিছু মানুষ আছে তাদের গায়ের গন্ধ ভয়াবহ অথচ কোন পারফিউম কিংবা বডি স্প্রে ব্যবহার করে না। এই রকম মানুষ গুলো আশেপাশে থাকলে আমার কেমন গা গুলাতে থাকে।

মানুষের শরীরের গন্ধ পেতে আমার তার খুব কাছে যেতে হয় না। অনেক দূর থেকেই আমি গন্ধ পাই। দুটি ছোট্ট ঘটনা বলি। আমার জন্মের পর পর আমার বড় বোন বেশ অসুস্থ  হয়ে পরে ,তখন আমার  মেজো চাচার উপরে পরে আমার বেবী সিটিংয়ের  দ্বায়িত্ব।উনার কাছে থাকতে থাকতে আমি উনার গায়ের গন্ধে এতটাই অভস্ত্য  হয়ে পরি  উনি ছাড়া আর কারো কাছে আমি ঘুমাতে পারতাম না। অন্য কেউ আমার পাশে  শুলে গন্ধে আমার ঘুম ভেঙ্গে  যেত।এই গল্পটা বাসার বড়দের কাছে শোনা।

এবার দ্বিতীয়  গল্পে আসি ,আমি তখন ইন্টারমিডিয়েট সেকেণ্ড  ইয়ারের ছাত্রী। আমার বাবার এক ছোট বেলার বন্ধুর ছেলে এসেছে ঢাকায় পড়তে। প্রথম পরিচয়েই  ভীষণ বিরক্তিকর লাগলো। তার যাবতীয় আগ্রহ আমাকে ইমপ্রেস করা। আম্মাকে বললাম আম্মা গা করলো না। এই ছেলে বাসায় আসলে আমি পালতে পারলে বাঁচি এমন একটা অবস্হা।একদিন বিকেলে ছাদে বসে গল্পের বই পড়ছি। বসন্ত কাল আম্মার সব গাছ ভর্তি অসংখ্য ফুল। হঠাৎ ভীষণ বিশ্রী কড়া  একটা গন্ধ আমার নাকে লাগলো ,কোন একজন মানুষের গন্ধ ,গন্ধেই আমি বুঝে গেলাম সেই ছেলে  এসেছে।আমাদের বাসা ছিলো চারতলা আর ছাদটা  তার উপরে।কেউ বেল বাজালে চাবি নিয়ে যেতে হতো  গেট খুলতে। কিছুক্ষন পর ঠিক বেল বাজলো। আম্মা আমাকে চিৎকার করে ডাকছে গেট খুলতে।  আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি সেই বিরক্তিকর ছেলেটা এসেছে। আমি চুপ করে বসে আছি ছাদের  কোনায়। কিছুক্ষণ  পর সেই লোক ঠিক ছাদে এসে হাজির। সেদিন তার সঙ্গে এতটাই খারাপ ব্যবহার করেছিলাম আজ পর্যন্ত আর তার সঙ্গে দেখা হয় নি।

আমার শ্বাশুড়ী  আর  বড় ফুফু একই বছর মারা যান। আমার এই প্রিয় দুই জন মানুষ মারা যাবার পর হঠাৎ হঠাৎ মনে হতো তারা আমার খুব কাছে আছেন। আমি কেমন একটা গন্ধ পেতাম। এবং আমার আশেপাশে যারা থাকতো তাদের বলবার পর তারাও গন্ধটা  পাওয়া শুরু করতো। একদিন গভীর  রাতে আমি আর আমার ননাশ  বসে গল্প করছি ড্ৰয়িং  রুমে। আর ভেতরের রুমে ঘুমাচ্ছিলো আমার বর। হঠাৎ টের পেলাম ভেতরে ঢুকবার মেইন এন্ট্রি থেকে পুরো ড্রইং রুম  জুড়ে তীব্র একটা ফুলের গন্ধ কেমন  ঢুকে  যাচ্ছে আমাদের বেড রুমের দিকে।আমার ননাশ কে বলতে উনিও স্বীকার করলেন এবং খানিকটা ভয় পেলেন। এই গভীর রাতে এমন গোলাপ ,আগরবাতির গন্ধ পেয়ে। এমন সময় ঘুমের মধ্যে আমার বর  আম্মা আম্মা বলে চিৎকার করে উঠতেই গন্ধটা কেমন  মুহুর্তেই  ছুটে  পালালো ঘর থেকে। আর আমার বর  কাঁদতে কাঁদতে  তখন বলছে আম্মা প্লিজ চলে যেওনা আম্মা।

অস্ট্রেলিয়াতে আসবার পর আমরা একটা পুরানো  ক্যামরি কিনি। এই বছরই  গাড়িটাতে হুট্ করে আগুন ধরবার আগ পর্যন্ত বুড়ো গাড়িটা  আমাদের সাপোর্ট দিয়েছিলো ২০০% ।যাই হোক প্রথম প্রথম আমরা রাতে শহর দেখতে বের হতাম। কিছুই চিনি না। একমাত্র মোবাইলের জিপিএসই  ভরসা। এমনই  ঘুরতে ঘুরতে একদিন আবারো  সেই তীব্র আতরের গন্ধ।কিছুক্ষন অপেক্ষা করে আমার মেয়ে আর বর কে বললাম তারাও টের পেলো গন্ধটা। ভয়ে  বাসায় চলে আসলাম। পরদিন সকালে যেয়ে দেখি ওখানে ছিল বিশাল এক কবরস্থান।

এর পর থেকে এই গন্ধটা প্রায়ই আসে আমার কাছে। শধু  ভিন্ন হয় গন্ধের সঙ্গে ভেসে আসা মানুষগুলো।

সেদিন দুপুরে ছেলের স্কুলে প্রোগ্রাম। ছেলে এওয়ার্ড পাবে।ছেলের আবদার আমাকে যেতেই হবে। দুপুর দু’টায় বাসা থেকে বের হলাম বাস ধরবো বলে। সুনসান  দুপুর কেউ নাই রাস্তায় হঠাৎ একটা মানুষের গন্ধ এসে লাগলো নাকে। আমি যত বাসস্ট্যান্ডের দিকি এগুচ্ছি গন্ধটা আরো আরো তীব্র হচ্ছে। অথচ সামনে পিছে ,আশেপাশে একটা মানুষও  নেই। বাসের টাইমেও দেখাচ্ছে আরো দশ  মিনিট লেট্। আমি দাঁড়িয়ে অপক্ষা করছি বাসের জন্য আর গন্ধের উৎস  খুঁজছি। দশ মিনিট পর বাস আসল ড্রাইভার ছাড়া  বাসে  বসা  মাত্র একটি যুবক। আমার কাছাকাছি বয়স হবে। সাদা চামড়া , কটা  চোখ ,সোনালী চুল ,বিশাল লম্বা। পড়নে লেবারের হলুদ পোশাক। চোখে চোখ পড়তেই  বিস্তৃত হাসি দিয়ে বললো , হাই  মেটস। আমিও হ্যালো বলে একটু পেছনের উঁচু সিটে  বসলাম। হঠাৎ আবিষ্কার করলাম এতক্ষন যেই গন্ধটা পাচ্ছিলাম সেটা এই ছেলেটির গায়ের গন্ধ। অবাক হয়ে ছেলেটিকে দেখতে থাকলাম লুকিয়ে লুকিয়ে। পরের স্টপেজ এ নেমে গেলো সে, গন্ধটাও চলে গেলো।একই ভাবে ছেলেটির সঙ্গে দেখা হলো বার কতোক সেই একই  হাই  -হ্যালো। সপ্তাহ খানিক আগে গিয়েছি কেমার্ট এ  কিছু টুক টাক  কেনা কাটা করতে। আবার ও হঠাৎ সেই একই তীব্র গন্ধ,  তাকিয়ে দেখি সেই যুবক। আবারো হেসে হাই – হ্যালো। খানিক বাদে হঠাৎ যুবক একটু কাছে এসে বললো ;বাই  মেটস ,সম্ভবত এটাই আমাদের শেষ দেখা। উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে চলে গেল। কেমন ভীষণ অস্বস্তির মধ্যে পরে গেলাম।

গতকাল অনেকদিন পর বের হয়েছি  একটু ঘুরবো বলে। বাসা থেকে খানিকটা দূরে। ফোনে জিপিএস সেট করে খুঁজছি বাস স্টপেজ।  হঠাৎ একটা ইলেকট্রিক পোলে  চোখ আটকে গেল। অসংখ্য ফুলদিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলী দিয়ে ঝোলানো হয়েছে কোন এক মৃতের ছবি।অবাক হয়ে দেখলাম বাসের সহযাত্রী যুবকের হাসি মাখা মুখ স্থির হয়ে আছে ল্যাম্পপাস্টের দেয়ালে। তার নীচে  কেউ একজন লিখেছে; ‘এই পৃথিবীতে তুমি শান্তি খুঁজে পাওনি ঠিকই ,নিশ্চয়ই  তুমি শান্তি পাবে তারার দেশে ,ঈশ্বরের কোলে ’।

পড়ন্ত  বিকেল সূর্য ডুবে যাবে যে কোন মূহুর্তে। ভীষণ বিষণ্নতা নিয়ে জিপিএসের  দেখানো পথে আমি খুঁজে চলেছি বাস স্টপেজ। ঘনিয়ে আসছে অন্ধকার ,হুট্ করে কেমন একটা আতর মাখা গন্ধ ছেয়ে  ফেলছে আমায়। আমি গতি বাড়ালাম বাস আসবে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে।  কিছুতেই বাসটা  মিস করা যাবে না ,কিছুতেই না।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]