গাইলেন, পুড়লেন গীতা দত্ত

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তখন সত্তরের দশক। ভারতবর্ষে জ্বলছে নকশাল আন্দোলনের আগুন। টালমাটাল হয়ে উঠেছে তখনকার রাষ্ট্রযন্ত্র। ঠিক সেই সময়েই মুম্বাইতে বসে ধুঁকছেন গানের পাখি গীতা দত্ত। তাঁকে ভুলে গেছে গোটা ইন্ডাস্ট্রি। তেত্রিশ বছর কেটে গেলে হয়তো কেউ মনে রাখে না। মদ, নেশা কোনো কিছু বাদ ছিলো না তাঁর। গুরু দত্ত আরও আগেই বিদায় নিয়েছেন। বিধ্বস্ত, একা গীতা দত্ত। আর তাঁর প্রিয় বলিউড?কেউ ফিরেও তাকায়নি বাংলা আর হিন্দী গানের দুনিয়ায় রাজত্ব করা এই রাজরাণীর দিকে।

গুরু দত্ত

গুরু দত্তকে বিয়ে করার পর একটু একটু করে খাঁচায় ঢুকে পড়ছিলেন যেন এই মানুষটি। তখন মনে করা হচ্ছিল আশা ভোঁশলের আগমনে নিজের সিংহাসন হারাতে চলেছেন গীতা দত্ত। কিন্তু ঠিক তখনই ফিরেছিলেন তিনি। প্রত্যাবর্তনের পথে সব কস্টলি অতীতকে দু’হাতে সরিয়ে ফিরে আসা তাঁর।

কলকাতার টালিগঞ্জে শুটিংয়ের ফাঁকে বিরতিতে গোল হয়ে বসে কথা বলছেন উত্তমকুমার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় জানালেন, এবার তিনি ছবির গান রেকর্ড করবেন মুম্বাইতে, আর গাইবেন গীতা দত্ত। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কথায় আড্ডার মানুষরা একটু চমকেই উঠেছিলেন হয়তো সেদিন। কারণ তখন বাংলা সিনেমায় সুচিত্রা সেনের লিপে গান মানেই সন্ধ্যার গান। কিন্তু প্রায় এক ধরণের রেওয়াজ ভেঙে হেমন্তবাবু চলে গেলেন মুম্বাইতে। গান গাইলেন গীতা দত্ত, ‘ওগো তুমি যে আমার’। সিনেমার নাম ‘হারানো সুর’। কালজয়ী বাংলা গানের তালিকা থেকে এই গান আর বাদ পড়ে যাবার কোনো সুযোগ নেই সম্ভবত। এই গানটির হাত ধরেই আবার ফিরে এসেছিলেন গীতা দত্ত।

বাংলা ও হিন্দী গানের দুনিয়ায় তাঁর সুরেলা কন্ঠ আজও রাজত্ব করে।

গীতা দত্ত

বাংলাদেশের ফরিদপুরের জমিদার বাড়ির মেয়ে গীতা দত্ত বেড়ে উঠেছিলেন এ দেশে। এখানেই তার গানের পৃথিবীতে পা ফেলার শুরু। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালো মেঘ তাদের পরিবারকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলো মুম্বাইতে। ফরিদপুরের জমিদার বাড়ি ফেলে তাঁর বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ রায়চৌধুরী চলে গেলেন অচেনা শহরে। দারিদ্র তখন তাদের সঙ্গী। জমিদার কন্যাকে দিন কাটাতে হয়েছে মুম্বাই শহরের ফুটপাতেও। তখন কী গীতা দত্ত ভেবেছিলেন একদিন এই শহরের রাণী হয়ে উঠবেন তিনি? গীতা দত্তের কন্ঠস্বরের ভিন্নতাকে বুঝতে ভুল করেননি শচীন দেব বর্মণ। গীতা দত্তের গান শুনে বলেছিলেন, ‘এই মাইয়্যার জন্মই তো হইছে ফিল্মে গাওয়ার জন্য।’ প্রথম রেকর্ডিংয়েই বলে বসলেন, ‘এইখানে বাঙ্গালীর সুনাম অনেক, গান গায়া তোর মান রাখতে হবে।’ তাঁর হাত ধরেই উত্থান ঘটলো গীতা দত্তের। একটার পর একটা হিট গান গেয়ে গানের সাম্রাজ্য দখল করলেন তিনি।শোনা যায়, বিখ্যাত সুরকার ওপি নাইয়ার আশা ভোঁশলেকে সব সময় বলতেন, ‘গীতার মত গলাটা বানাও।’ আশা ভোঁশলে ভাগ্যবান। ওপি নাইয়ারের সঙ্গে তিনি গান গাইতে পেরেছেন ৮১টা। আর গীতা দত্তের গান মাত্র ১৮টা। এই ১৮টা গানেই তিনি দেখিয়েছেন, কন্ঠশি

লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে

ল্পী কাকে বলে?

কৈশোর বয়সেই প্রেমে পড়েছিলেন বসন্ত কুমার পাডুকোনের। এই নামটা এখন আর কারো চেনার কথা নয়। শুধু সার্টিফিকেটে রয়ে গেছে। তিনি পরিচিত হয়েছিলেন গুরু দত্ত নামে। মুম্বাইয়ের ফিল্মী দুনিয়ার প্রবাদসম মানুষ নিজের জীবন নিজের হাতেই নিভিয়ে দিয়েছিলেন এক রাতে। গীতা দত্ত প্রেমে পড়েছিলেন গুরু দত্তের। সিনেমা সুত্রেই পরিচয়। গুরু দত্তের বোন স্মৃতি রোমান্থন করতে গিয়ে বলেছিলেন, শাড়ী পরে লিমোজিন থেকে নামতেন গীতা দত্ত। প্রেমিকের বাসায় ঢুকে আগেই গুরু দত্তের বোনের সঙ্গে গল্প করতেন। শাড়ীটাকে কোমড়ে গুজে মাঝেমধ্যে রান্নাও করতেন। তারপর চিঠি দিয়ে, গুরু দত্তকে এক পলক দেখেই আবার লিমোজিনে নিজের বাড়িতে ফিরে যেতেন। কী  দারুণ প্রেমের গল্প! গীতা দত্তকে যে তখন দেখতো বলে দিতো, তোমার সিনেমায় এত কানেকশন, তুমি তো নায়িকা হতে পারো। কিন্তু গীতা তো নায়িকা হতে চাননি, তিনি হতে চেয়েছিলেন দুর্দান্ত প্রতিভার অধিকারী সিনেমা পরিচালক গুরু দত্তের সহযাত্রী। গীতার বাসা থেকে এই বিয়ের নুন্যতম সায় ছিল না। একটা বাঙ্গালী ছেলেকে দিয়ে গীতাকে প্রায় রাজী করিয়ে ফেলছিলো বিয়ের ব্যাপারে। কিন্তু গুরু দত্ত প্রেমের চিঠিগুলো ফিরতে দেয়নি গীতা দত্তকে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তাদের বিয়ে হলো। বিয়ের পরে সন্তানের জন্মও হলো। কিন্তু সুর মিললো না দুজনের আর। হঠাৎ করেই ছন্দ হারিয়ে গেলো। তখন গীতা দত্তকে বলা হয়েছিলো, গুরু দত্ত ছাড়া আর কারোর ছবিতে গান গাইবেন না। ঠিক ওই সময়েই সামনে চলে এলেন লতা মুঙ্গেশকার। যদিও গীতা দত্ত সম্পর্কে লতাকে বলতে শোনা গেছে, ‘গীতার গলা অনেক জন্ম নিলে একবার পায় মানুষ।’

বাতাসে নায়িকা ওয়াহিদা রেহমানের সঙ্গে গুরু দত্তের উথাল পাতাল প্রেমের গুঞ্জন। গীতা দত্ত গানও কম করেন। তার কাঁধে হাত রাখলো মদ। বলা হয়ে থাকে, কল্পিত দেবদাসের চেয়েও বেশি আসক্ত হয়ে উঠেছিলেন তিনি সুরায়। ওয়াহিদা রেহমানের ভাই তখন হঠাৎ-ই দাবী করে বসেন, তার বোনের সঙ্গে গুরু দত্তের বিয়ে শুধু সময়ের ব্যাপার। অস্থিরতা আর বিষাদ ঘিরে ধরেছে গীতাকে তখন। তার হাতে সামান্য কয়েকটি গান। বাংলা গানে যিনি কিংবদন্তী তাকে নিয়ে নচিকেতা ঘোষ আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ছাড়া আর তেমন কেউ সেই অস্থির সময়ে গান গাওয়ানোর চেষ্টা করেননি। ঠিক তখনই বিষাদাক্রান্ত কন্ঠে গীতা গাইলেন,‘তুমি যে আমার’।

তারপরেই এলো গুরু দত্তের আত্মহত্যার খবর। দুজন তখন একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন। ওয়াহিদা রেহমানের প্রেম প্রবাহিত দেবানন্দের দিকে। মদের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খেয়ে প্রদীপ নিভিয়ে দিলেন গুরু দত্ত। নার্ভাস ব্রেকডাউনের মতো পরিস্থিতিতে চলে গিয়েছিলেন তখন গীতা দত্ত। তাঁর কাঁধে মদের সঙ্গে ভর করেছিলো অর্থনৈতিক সংকট। তবু গান তো গাইতে হবে! হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁর জন্য প্রচুর শো করার ব্যবস্থা করে দিতেন।  কিন্তু শরীর সায় দিতো না। একদিন গান গাইতে উঠে স্টেজে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান গীতা দত্ত।

মাত্র ৪১ বছর বয়সে মৃত্যু আসে পরান সখার মতো। তখন শরীরে বাসা বেঁধেছে লিভার সিরোসিস। মৃত্যুর ঘড়ি এগিয়ে চলেছে অবিচল লক্ষ্যে। ক্যারিয়ারের অথবা জীবনের একেবারে অন্তিমে এসে গাইলেন ‘ মুঝে জান না কাহো মেরি জান’। বেদনায় নীল হয়ে যাওয়া পাত্র থেকে ছলকে পড়লো যেন জীবনের বিষাদ। আকন্ঠ অভিমান পান করে যেন তাল হারাতেই চেয়েছিলেন গীতা দত্ত। ১৯৭২ সালের ২০ জুলাই চলে গিয়েছিলেন তিনি।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ফিচার, উইকিপিডিয়া
ছবিঃ গুগল   

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]