গাছ মানে সবুজ,ঘরে বাইরে সবুজ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

শাহিদা আরবী ছুটি

অস্ট্রেলিয়ায় আমাদের অফিসগুলোতে অনেক ইনডোর প্লান্ট থাকে। যেহেতু অফিসে আলোবাতাস ঢুকতে পারেনা তাই ভেতরে প্রচুর বাতাস শুদ্ধিকরণ গাছ দিয়ে ভর্তি করে রাখা হয়। আমাদের অফিসে এখনো কেউ নিয়মিত আসেনা। শুধু আমি আসি। ইদানিং অফিসে এসে আমি গাছে পানি দেই। যদিও গাছে পানি এবং খাবার দেবার জন্য আলাদা লোক আছে, তারা সেগুলো করে। তবে এই করোনাকালে তাদের আসা যাওয়া অনিয়মিত, আমার খুব মায়া লাগে গাছগুলোর জন্য।

যেই ছেলেটা আমাদের অফিসের গাছগুলোতে পানি দেয়, সে একদিন বললো আচ্ছা তুমি কি গাছে পানি দাও? আমি খুব লজ্জার মধ্যে পরে গেলাম। অফিসে মানুষ কাজ করতে আসে, কেউ গাছে পানি দিতে আসেনা। কাজটা বোধহয় ঠিক হয়নি। সেই ছেলে খুব বিরক্ত হয়ে বললো, গাছে পানি দেবেনা, ওদের পানি-খাবার আমি এমনভাবে দেই যেনো পরেরবার আমি আসার আগে পর্যন্ত সেটা কভার করে।

আমি পানি দেয়া বন্ধ করে দিলাম।

যেকোনো প্রাণের উৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যুও নির্ধারণ হয়। তেমনি গাছের পাতাও মরে যায়, ঝরে যায়। আমি পানি দিতে না পেরে তখন অফিসের গাছের মরাপাতাগুলো ফেলে দিতে শুরু করলাম। আসলে গাছে হাত দিলেই আমার ভালো লাগে। আমার বাসায় গোলাপ গাছ ছাড়া অন্যসব গাছের পরিচর্যা আমি গ্লাভস না পরেই করি। হাতে মাটি মাখামাখি হয়ে যায়, হাত থেকে অদ্ভুত একটা গন্ধ আসে, মাটির গন্ধ। আমার এতো ভালো লাগে।

যাহোক ক’দিন পর সেই গাছওয়ালা ছেলেটা এসে আবার আমাকে ধমকের সুরে বললো, ‘এই তুমি কি আজকাল গাছের পাতা ছিড়ো?’ আমি বললাম পাতা ছিড়বো কেন, পুরোনো মরে যাওয়া পাতা ফেলে দেই। সেই ছেলে ক্লান্ত কণ্ঠে বললো, আর পাতা ছিড়বে না। মৃত পাতা ফেলে দেবারও নিয়ম আছে, শুধু ছিড়ে ফেললেই হলোনা।

আমি পাতা ছেড়াও বন্ধ করে দিলাম।

এখন শুধু মাঝে মধ্যে গাছের সামনে দাঁড়িয়ে থাকি, হাত দিয়ে ধরি।

আচ্ছা এইবার গাছ নিয়ে কিছু কাজের কথা বলি। যারা গাছ ভালোবাসেন তারা হয়তো জানেন এটা একটা নেশা এবং পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম উপকারী নেশা। একটা গাছ কিনলেই আরো কিনতে ইচ্ছা করে। গাছ মানেই যে সবসময় শাকসবজি, কাঁচামরিচ, ধনিয়াপাতা গাছের চাষ, ঠিক তা না। গাছ মানে সবুজ। ঘরে বাইরে সবুজ।

গাছে পানি দেবার পর যে ভেজা মাটির গন্ধটা আমাদের নাকে আসে, সেই স্পেসিফিক গন্ধটা সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীরে সেরোটোনিন রিলিজ করে। সেরোটোনিন যে সুখের হরমোন সেইটা আমরা সবাই জানি। মাটির সোঁদা গন্ধেও আমাদের সুখ আছে, ব্যাপারটা অদ্ভুত না?

গাছের পরিচর্যা করার সময়, মানে মাটি হাতানোর সময় বা মৃত পাতা হাত দিয়ে ফেলার সময়, আমাদের শরীর একটা স্পেসিফিক ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসে যা কিনা আমাদের ইমিউন সিস্টেম বুস্ট করে। মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট গাছের পরিচর্যা করলে, এমনকি আমার মতন অফিসে গাছের সামনে মুগ্ধ নয়নে দাঁড়িয়ে থাকলেও,মস্তিষ্কের মেমরি ক্যাপাসিটি কমকরে হলেও ৫% বাড়ে।

ডিপ্রেশন, এঞ্জাইটি, স্ট্রেস, হাই ব্লাড প্রেসার, কোলেস্টরেল এমন অনেক কিছু কন্ট্রোলে থাকে শুধুমাত্র আধাঘন্টা, মাত্র ৩০ মিনিট আপনি যদি আপনার বাগানের পরিচর্যা করেন। সাউথ কোরিয়ার এক ইউনিভার্সিটি রিসার্চ করেছে যে গার্ডেনিং ন্যাচারাল আয়ু বাড়ায়। জীবনে দেখেছেন যেসব চাচা মামা খালা খালু নিয়মিত গার্ডেনিং করে, তারা বিছানায় শুয়ে অসুস্থতায় চি চি করছে? একটু খেয়াল করে দেখবেন গার্ডেনিং করা মানুষগুলো অনেক ফিট।

আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার, জগতের সকল জাগতিক সম্পদ আমরা আগলে রাখলেও, যারা গাছ পালে, নিজের বাসায় গার্ডেনিং করে তাদের কাছে কেউ গাছ চাইলে সেইটা তারা দিয়ে দেয়। গাছের ডাল দিয়ে গাছ হয়। এই জিনিস অন্যকে দিলে কখনো কমে যায়না বরং বেড়ে যায়।

গার্ডেনিং শুনলেই মনে হতে পারে, এরজন্য ছাদ লাগবে, মাটি লাগবে, বারান্দা লাগবে, নানান তেলেসমাতির ব্যাপার। পৃথিবীতে বেস্ট ইনডোর গাছ হলো মানিপ্ল্যান্ট, এর একটা ডাল কেটে পুরোনো গ্লাসে পানি দিয়ে রেখে দেন। এরজন্য মাটি লাগবে না, বারান্দা লাগবেনা, ছাদ লাগবেনা। এই জিনিস নিজে নিজেই বড় হবে আর আপনার ঘরের ভেতর ফার্নিচার কিংবা সিগেরেটের ধোঁয়ায় যে বিষাক্ত কেমিক্যাল বাতাসে ঘোরাফেরা করছে সে সেইটা নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার করবে। আর যদি কারো অ্যাজমা বা শাসকষ্ট থাকে, তাহলেতো এই গাছ ঘরে রাখাটা দায়িত্বের মধ্যে পরে।

গাছ উপাখ্যান অনেক হলো, মূল গল্পটা শেষ করি। আজকে সকালে সেই গাছওয়ালা ছেলে আমার জন্য দুইটা গাছ নিয়ে এসেছে। টবগুলো আমার টেবিলে রাখতে রাখতে বললো, এই দুইটা গাছ তোমার জন্য। আমার মনে হয়েছে, তোমার গাছ পছন্দ, তুমি গাছ ধরতে ভালোবাসো। তবে দয়া করে অকারণে পানি দিবেনা আর পাতা ছিড়বেনা।

আমার ডেস্ক থেকে এখন ভেজা মাটির গন্ধ আসছে, সেরোটোনিন লেভেল উচ্চমাত্রায় চলে গেছে। ভেবেছিলাম লেখালেখি আর করবোনা। আজাইরা সময় নষ্ট। এর চাইতে ফেসবুকে এসে সবার ফার্স্ট ইম্প্রেশন চ্যালেঞ্জ কিংবা কনভিনিয়েন্ট উপায়ে গোপন প্রশ্ন উত্তর খেলাগুলো দেখাটা ইন্টারেষ্টিং। কিন্তু আজকে গাছের সংস্পর্শে এসে গাছ বিষয়ক তুচ্ছ টাইপ একটা লেখা লিখে ফেললাম।

পৃথিবীর সকল প্রাণগুলো ভালো থাকুক।

ছবি: লেখক ও গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]