গানকে পেশা হিসেবে নেয়া শিল্পীদের আজীবনের দুঃখ, তা আর হয়তো মুছে ফেলার উপায় নাই

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

একাধারে নিজের জীবনের গল্প বলে যাচ্ছি।তাতে এসে যাচ্ছে দুঃখ বেদনা শ্রম অধ্যাবসায় অভিজ্ঞতা এবং নিজস্ব ভাবনার কিছু দর্শন। আটানব্বই সালের কথা বলছি।তখন আমি ইতোমধ্যেই চলচ্চিত্রে গাওয়ার জন্য ছবির গানের যতরকম শাখায় পুরষ্কার দেয়া সবই পেয়ে ফেলেছি।গানের সর্বোচ্চ পুরস্কার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার ও পেয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা সবাই আমাকে তখন চেনে একজন কণ্ঠশিল্পী হিসেবে। দু’য়েক মাস পরপরই লন্ডন আমেরিকা দুবাই কাতার যাচ্ছি গাইতে। গানই জীবন গানই মরণ অবস্থা। তখনও থাকি রামপুরায় মহানগর প্রজেক্টে। সেখানে আমি আসলে একলা হয়ে গেছিলাম। মানে মায়ের বাড়ি মাদারটেক, শশুর শাশুড়ী তাঁর ছোট দুই ছেলেকে নিয়ে শান্তিনগর থাকেন। তাঁরা কেউই অতদূর থেকে আমার বাচ্চাদেরকে একটু দেখাশোনা করার জন্য আসতে পারেন না।কারণ তাঁরা তখন পুরাদস্তুর সংসারী মানুষ।

আমার সেঝ ভাশুর থাকেন রামপুরা টিভি রোডের গলিতে। সেঝ ভাবি সেখান থেকে কষ্ট করে এসে মাশুক ফারিয়াকে পড়ান।আমি আসলে চাচ্ছিলাম আবারও একসঙ্গে শাশুড়ীকে নিয়ে একত্রে একটা বাসা নিতে। ঢাকা শহরে বা যে কোন জায়গাতেই নিজেদের বাড়িঘর না থাকলে অনেক বড় পরিবার অর্থাৎ যৌথ পরিবারের জন্য পাঁচ ছয় রুমের বাসা পাওয়া খুব কঠিন। আমি আমার শাশুড়ীকে বললাম ইচ্ছার কথা। উনি সায় দিলেন। আমার বাচ্চা দুটোকে বুকে পিঠে করে বড় করেছেন।উনার ও আমাদের ছেড়ে থাকতে খুব কষ্ট হয়।সবকিছু বিবেচনা করে সেঝ ভাবি বললেন আমাদের বাসার সামনে একটা বড় বাড়ি আছে টু-লেট দেয়া।ইন্ডিপেন্ডেট হাউজ বলা যায়।বাড়িওয়ালা উপর তলায় থাকেন। নীচতলা ভাড়া হবে।বাইরে থেকে দেখেই বোঝা যায় বড়ই বাসা।সামনে উঠান আছে।ভালোই হবে।আমারও মাশুক ফারিয়াকে পড়াতে এতো দূরে আসতে হবেনা। সবারই প্রস্তাবটা খুব মনে ধরলো। কয়দিন পরেই ঈদ।আমরা আবার একসঙ্গে ঈদের আনন্দ উৎসবের মতো করে উদযাপন করবো এটাও আমাদের সেসময়ে একসঙ্গে বাসা নেয়ার তাগাদার প্রধান কারণ ছিলো। আমার শাশুড়ী সহ ছোট দেবর সহ সেঝভাবী সেই বাসা দেখাতে নিয়ে গেলেন।লাল মেঝের পুরাতন দালান। বড় বড় ঘর।রান্নাঘরের সঙ্গে ভাঁড়ার ঘর আছে।গোসলখানায় পানি রাখার হাউজ আছে।একটু পুরনো টাইপ হলেও আমার ভালো লাগলো। ভদ্রলোক চাকরিজীবী ছিলেন। বাড়িওয়ালার অহংকারী ভাব প্রচ্ছন্ন চোখে মুখে। অনেক শর্ত চিবিয়ে চিবিয়ে শুদ্ধ উচ্চারণে বলে যাচ্ছেন ।বাগানে পেয়ারা গাছ গোলাপজাম গাছ ইত্যাদিতে হাত দেয়া যাবেনা। বেশি মেহমান আসা যাবেনা। অনেক রাতে বাড়ি ফিরলে বৃদ্ধ কেয়ারটেকার দরোজা খুলবেনা।আবার গেটের এক্সট্রা চাবিও দেবেন না।ছাদে কাপড় শুকাতে দেয়া যাবেনা। ছাদে হঠাৎ গেলেও আওয়াজ যেন না হয়।উঠানে বাচ্চারা সাইকেল চালালেও কিচিরমিচির করা যাবেনা। এতো কিছুর পরেও পাঁচটা বেডরুম চারটা বাথরুম ইত্যাদি দেখে আমরা শর্ত মেনে নিয়ে ভাড়া জানলাম। সেটাও চলনসই। এবার ভদ্রলোক ( ভদ্রলোকের সংজ্ঞা কি আসলে আমরা জানি?) জানতে চাইলেন ভাড়া কে নেবে? উনি বুঝেই গিয়েছেন আমরা দুইটা ফ্যামিলি। তখন আমার সেঝভাবি বললেন ভাড়া আমার দুই দেবর দেবে।মানে আমরা এবং আমার ছোট দেবর।উনি জিজ্ঞেস করলেন তাঁরা দু’জন কি করে! সেঝভাবি বললেন একজন প্রকৌশলী আর একজন মিউজিক ডিরেক্টর। উনি অবাক হয়ে বললেন মিউজিক ডিরেক্টর? ভাবি গর্বিত কণ্ঠে বললেন হ্যাঁ। আমার দেবর নিজে মিউজিক ডিরেক্টর এবং তাঁর স্ত্রী কন্ঠশিল্পী কনকচাঁপা বলে আরও গর্বিত ভাবে আমাকে দেখালেন । উনি অবাক হয়ে বললেন কনকচাঁপা কে! ভাবি আবারও আমাকে দেখালেন! ভদ্রলোক স্পষ্টতই ভ্রু কুঁচকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে আমাকে দেখলেন আপাদমস্তক! আমি ভূগর্ভে ঢুকে যাওয়ার গর্ত খুঁজছিলাম! উনি বললেন শোনেন ইঞ্জিনিয়ার ঠিক আছে কিন্তু আমি কোন শিল্পী টিল্পীকে বাসা ভাড়া দেবোনা। শিল্পীদের ইনকাম আজ আছে কাল নেই।আমি এইসব ঝামেলায় পড়তে পারবো না।আপনারা আসেন। আমি এই কনকচাঁপা টাপার নাম জীবনেও শুনিনি।

আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন সেঝভাবি। তিনি এমন অপমানিত হলেন।ফর্সা টকটকে মানুষ লাল হয়ে গেলেন।ভাবি জোর করেই আমাদের তার বাসায় নিয়ে গেলেন। তারপর ইচ্ছামত শাপসাপান্ত করতে লাগলেন। আমি কান্না আটকে স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম।ভাবির চা নাস্তা আমার গলা দিয়ে ঢুকছিলো না।

খালি উনার কথা আমার কানে বাজছিলো! শিল্পীরা এতো অচ্ছুৎ! এতো অনিশ্চয়তার জীবন আমাদের! এতো অসম্মানজনক অবস্থান! আমার শাশুড়ী আমাকে শান্তনা দিচ্ছিলেন। বলছিলেন ওই লোকের এটা ব্যাক্তিগত আচরণ। তুমি এভাবে নিজের উপর নিওনা।উনাকে কয়জন চেনে! এই ভাড়া খেতে খেতেই উনার জীবন শেষ হবে।তুমি শিল্পী, ঠিকঠাক কাজ করে গেলে তোমার জীবন অমর হয়ে যাবে।তুমি উনার আচরণ ব্যাক্তিগত ভাবে নিওনা।আমি শান্ত হলাম কিন্তু প্রশ্ন আমার রয়েই গেছে!

আমরা শিল্পীরা কি সারাজীবনই এমন ব্রাত্যজন, অবাঞ্চিত,প্রান্তিক গোষ্ঠী, দুস্থ শিল্পী হয়েই থাকবো! আমরা জাতীয় পুরস্কার পেলেও জাতীয় কোন পদমর্যাদা কখনওই কি পাবোনা!

সেবার আর আমাদের একসঙ্গে ঈদ করা হলো না।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]