গান আমি গেয়ে যাই এই আসরে!

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

 বিটিভি এবং রেডিওর গানের সঙ্গে মঞ্চেও গাইছিলাম।বিয়ের পর পেশাদার জীবনের পয়লা মঞ্চ ছিলো বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুষ্ঠান এ গান গাওয়া। সে অনুষ্ঠানে গাইতে গিয়ে দেখি ছোট বেলার বন্ধু সাবাহ তানি ও সে অনুষ্ঠানে গাইবে।আমি তার উপস্থিতি এবং পোষাক আসাক দেখে একইসঙ্গে চমৎকৃত এবং দ্বিধান্বিত হলাম। আমি বুঝলাম ওকে দেখতে দারুণ স্টার স্টার লাগছে।তার জেশ্চার পশ্চার ঠিক সেরকমই কিন্তু এ পথ আমার নয়।মঞ্চানুষ্ঠান প্রায় রোজই করি।মোটামুটি অনেকে চিনছেন।জীবনের পয়লা পেশাদার ভাবে ঢাকার বাইরে যাই হাটহাজারী। এতো দর্শকদের মাঝে কি গাইবো বুঝতে পারিনা।ঘাবড়ে গিয়ে আমার স্বামী, আমার জীবনসঙ্গীকে বললাম আমি কি সাবিনা আপার ‘তোমার ও দুনিয়া দেখিয়া শুনিয়া’ এই গান দিয়ে শুরু করবো? উনি বললেন অবশ্যই না।মঞ্চ জমানো শিল্পী তোমার হবার দরকার নেই।তুমি তোমার নিজের গান গাও। আমি ভয় পেয়ে যাই।ভাবি আমার নিজের অপ্রচলিত, না শোনা, অ-জনপ্রিয় গান এই ভরা আসরে কে শুনবে? উনি বলেন তুমি বুঝতে পারছোনা, তোমার গান দিয়েই তোমাকে চেনাতে হবে।গাও, নিজের গান গাও।আমি নিজের একটা গান গাইতেই শ্রোতাদের ভাব বদলে গেলো।তারা ওয়ানমোর বললেন! আহা! কি শব্দ ‘ওয়ানমোর’ কি মধুমাখা এক‌টি শব্দ! একজন শিল্পীর সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত শব্দ, এ শব্দের জন্য এক‌টি শিল্পী আজীবন অপেক্ষমান থাকে হয়তো। এরপর নজরুল সংগীত লালনগীতি গাইলাম। খুব তৃপ্তি নিয়েই বাড়ি ফিরলাম।এভাবে শিল্পকলা একাডেমির অনেক অনুষ্ঠান, কিছু কর্পোরেট অনুষ্ঠান এ অংশগ্রহণ করতে থাকলাম।আমার কিন্তু মন পড়ে থাকে রেকর্ডিং বুথের ভেতর। নিজের গান তৈরির আকাঙ্ক্ষা আমাকে চাতক পাখি বানিয়ে দেয়।বাসায় গান শিখাই প্রায় দশ জনকে। তারা উচ্চাংগসংগীত শেখে আমার কাছ থেকে, আসলে ওই সময় নিজেই নিজেকে ঝালিয়ে নিতে চেষ্টা করি।অনুশীলন আসলে আমারই হয় নতুন করে।সংসার পুরাদস্তুর শুরু হয়নি, তবুও দু’চারটি থালাবাসন, আলনা, চেয়ার কিনি বিছানার চাদর কিনি, বালিশ কিনি, কিন্তু আসলে আমার কেনা দরকার শাড়ি জামা।অনুষ্ঠানে ম্যাড়মেড়ে মার্কা শাড়ি আর তেলচর্চিত লম্বা চুলের বেনী দেখে কিছু সিনিয়র শিল্পী বিস্ফারিত চোখে তাকান। আমি সব বুঝি।নিজের সাজসজ্জা নিয়ে কখনোই আমি কুন্ঠিত নই।কিন্তু শাড়ি? তখনকার ফ্যাশনের মত ঝকমকা জরিচুমকীর শাড়ি আমি কখনোই পরিনি কিন্তু অনুষ্ঠানে যাবার মত পাড় ওয়ালা সুন্দর ভদ্রস্থ শাড়ি কেনা আমাদের সাধ্যের বাইরে।এগুলো নিয়ে ভাববো নাকি ভাববো না তাও বুঝতে পারিনা! ওই সব জরিচুমকীর জর্জেট শাড়িগুলো আমি আসলেই পরবো কিনা তাও বুঝতে পারিনা।আমার স্বামী, আমার পথপ্রদর্শক আবারও বলেন শোন, তুমি যেমন আছো তেমনই সই।তোমার গানই মুখ্য এবং প্রধান ব্যাপার।অন্য শিল্পীদের মতো সাজসজ্জা ঝকমকে শাড়ি জামা এগুলো তোমার ভাবনার বিষয় হতে পারেনা।তোমার গান কেউ দেখবেনা।কিন্তু সবাই শুনবে। চোখ বোজে শুনবে।তুমি শুধু সেই ধ্যানে থাকো।আমি নিজের পথ খুঁজে পেয়ে যাই।আমি বুঝে নেই বাবা কেনো এই মানুষের হাতে আমাকে তুলে দিলেন। গান ছাড়া আমার আর কোন চিন্তা থাকতেই পারে না।নানাভাইয়ের কথা মনে পড়ে যায়, তিনি আম্মাকে বলেছিলেন ‘মেয়েকে গান শেখাচ্ছো শেখাও।কিন্তু আমার কথা হলো সে কি একজন ফেরদৌসী বেগম হতে পারবে? তা যদি পারে তাহলে আমার কোন আপত্তি থাকবেনা বরঞ্চ আমার আশীর্বাদ থাকবে।’ আমি আমার নিজস্ব পথ, ধারা বেছে নিলাম। সকাল আমার গান, দুপুর আমার গান বিকেল আমার গান রাত্রি আমার গান, এভাবে গানে গানময় হয়ে উঠছিলো আমার জীবন। আপাতত আমি প্লেব্যাক না করার যাতনা প্রায় ভুলে গিয়ে গান সাধনা এবং নিজেকে গুছিয়ে নেয়ায় ব্যস্ত হয়ে গেলাম।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে