গান আলয় বাঁধতে লেগেছি আমার মনে বলবো কি করে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি অসম্ভব সুন্দর সুন্দর কয়েকটি গান গেয়ে ফেললাম।লাভস্টোরী ছবিতে সব্যসাচী সুরকার শ্রদ্ধেয় আহমদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাইয়ের কত মানুষ ভবের বাজারে তোমারই নাম হৃদয়ে আমার, চিরঋনী ছবিতে সুরসম্রাট আলাউদ্দীন আলী ভাইয়ের তুমি ছাড়া জীবনে আমার কোন চাওয়া নেই , গান সম্বৃদ্ধ ছবি তোমাকে চাই ছবির নায়িকা শাবনুরের সব কটি গান, আলী ভাইয়ের সুরে ঘায়েল ছবিতে এই সুখ এ মিলন দুটি জীবনের, কান্দে কেনে মন ছবির আমার লাইন হইয়া যায় আঁকাবাঁকা, আনন্দ অস্রু ছবিতে বুলবুল ভাইয়ের সুরে ওরে থাকতো প্রেমের আদালত, তুমি আমার এমনই একজন , তুমি মোর জীবনের ভাবনা,লুটতরাজ ছবিতে তুমি নাই কিছু নাই তুমি আছো সবই আছে ইত্যাদি গান গেয়ে ফেলেছি।এবং আরও অজস্র গান আমি রোজই গাচ্ছিলাম।ছবির দরকারে রোজই গান গাই কিন্তু সেগুলো গান তো আর সব হৃদয়ে গাঁথা থাকে না।আমেরিকার লম্বা সফর থেকে এসে বুলবুল ভাই , আলী ভাইয়ের অনেক বকা শুনলাম। ছবির পরিচালক, প্রযোজক তারাও উষ্মা জানালেন। নামকরা পরিচালক প্রযোজক শ্রদ্ধেয় কামাল ইউসুফ, (যার ছবি তোমাকে চাই) বললেন শোন মা,লতা মুঙ্গেশকরের হাঁচি হলে সারা বলিউডের সর্দি লাগে।তোমাকে আমি কি বললাম বুঝছো? আমি নিরুত্তর। কারণ তখন এই বাক্যটি আমি আসলেই বুঝিনি।উনি রেগে গিয়ে বললেন তোমাকে ট্যালেন্টেড ভেবেছি কিন্তু এই মেয়ে রামবোকা। এতো বোঝার কাজ নাই।তোমার কোন বিদেশ টিদেশ যাওয়া হবেনা। বিয়ে শাদি জন্মদিন কিছুর দাওয়াত ও তুমি নেবেনা। তোমার জীবন এখন আর তোমার না।তুমি আমাদের। আমি নির্বাক।ভীতও হয়ে পড়লাম। উনি আমাদের তার গাড়িতে করে একদিন আমার বাসাবোর বাসায় নামিয়ে দিতে গিয়ে আমার বাসায় ঢুলেছিলেন। দুইরুমের বাসা।আমি ড্রইংরুমে তার লাগিয়ে কাপড় শুকাতে দিয়ে এসেছিলাম ওই অবস্থায় উনি আমাদের বাসায় ঢুকেই জিজ্ঞেস করলেন ” জামাই? কাপড় গুলো কে ধুয়েছে? আমার সাহেব উত্তর দিলেন ” কনক” উনি বললেন এটা কোন কথা? তোমার সংসারে এগুলো কাজ কনক করলে সে গান গাইবে কিভাবে! না না জামাই তুমি অন্য ব্যাবস্থা করো। কনকচাঁপার গান হতে হবে সুপার মল্টেড।সে সারাদিন কাপড় কেচে ঘর মুছে ক্লান্ত হলে ঠিকই মাইক্রোফোন এ ধরা পড়বে।

 আমি এবং আমার স্বামী আমাদের জীবন সেভাবেই গুছিয়ে নিলাম। কিন্তু রোজকার কাপড় বুয়া ধুয়ে দিলেও আমার কিছু কাপড় কাপড় কাচা সোডা দিয়ে সেদ্ধ করে নিজ হাতে ধোয়ার বাতিক আছে সেটা বন্ধ করবে কে! আমি লুকিয়ে লুকিয়ে আমার সংসারের কিছু কাজ করে উনার কাছে বকা খেতে লাগলাম।

 সহজ সরল জীবন আমার ভয়ানকভাবে “কেজো” হয়ে উঠলো। ফ্রী ল্যান্সার আমি চাকুরিজীবী হয়ে উঠলাম। বাসায় ফোন লাইন লাগানো হলো। দু‘জন কাজের লোক রাখা হলো। গলাসাধা বেড়ে গেলো। আলাউদ্দীন আলী ভাই বললেন রাতে ঘুমানোর সময় সরাসরি বাতাসে শোয়া যাবেনা।শোয়ার সময় অবশ্যই গলায় কাপড় পেঁচিয়ে শুতে হবে। আমার হাজব্যান্ড আমাকে সেভাবে অভ্যস্ত করে তুললেন। প্লেব্যাক এর পরিধি আরও বেড়ে গেলো। বলতে গেলে সব মিউজিক ডিরেক্টর ডাকা শুরু করলেন। গান তুলতে আমার সময় লাগে পাঁচ মিনিট গাইতে দশ থেকে পনেরো মিনিট। এটা যেন একটা দেখবার মতো বিষয় হয়ে গেলো।রেকর্ডিং বুথে গাইবার সময় টের পেতাম রেকর্ডিং প্যানেলের রুমে দর্শক জমা হয়েছে। ছবির গানে কতরকম এক্সপ্রেশন থাকে। কান্না হাসি রাগ ঘৃনা অভিমান সেক্স মাতলামি সব ফুটিয়ে তোলার কাজ শিল্পীর। অনেক সময় লজ্জা পেতাম। বুথে মাইক্রোফোন সরিয়ে আড়ালে নিয়ে গাইতাম।

 রেকর্ডিং স্টেশন এ থাকলে মনে হতো বাচ্চাদের কথা। বাসায় রান্না ঘরে মনে হতো রেকর্ডিং স্টেশন এর কথা। কি যে এক দোটানা ব্যাপার হলো আমার জীবনে। শেষমেশ বুঝলাম আমি আমার সংসারের এবং গানের। কিন্তু আমার আমি কই? আমার আমি কে খুঁজতেই আমি সত্ত্বা আমাকে জানালো ওরে পাগলী, তুমি যেমন গান আর সংসারের তেমন গান ও সংসার তোমার বটে।এগুলো নিয়ে ভেবে কাজ নেই।তুমি আপাতত ভাবো পুরো ব্যাপার গুলোই তোমার খেলাঘর!

আমার জীবন এভাবেই আঁকা হয়ে গেলো।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]