গায়ত্রীকে আপনার কী প্রয়োজন?

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কবি বিনয় মজুমদার কাউকে ভালোবাসতেন? গায়ত্রী কি ছিলো তাঁর সেই ভালোবাসার মানুষ? বিনয়ের দ্বিতীয় বই ‘গায়ত্রীকে’— এক ফর্মার চটি বই, সাকুল্যে জায়গা হয়েছে চৌদ্দটি কবিতার। নাম অনুযায়ী মনে হতেই পারে কবিতাগুলি জনৈক গায়ত্রীকে উদ্দেশ্য করেই। এই গায়ত্রী কে, সে সম্পর্কে পরিষ্কার করে বিনয় কখনোই কিছু বলেননি, ইচ্ছে করেই হয়তো অনেকটা ঘনীভূত হতে দিয়েছেন রহস্য।সেই বইতে রহস্য ছড়িয়ে আজও বেঁচে এমন সব লাইন-

অনেক সন্ধান করে নীতি নয়, প্রেম নয়, সার্থকতা নয়,

পেয়েছি আহত ক্লান্তি-ক্লান্তি, ক্লান্তি শুধু।

বিনয়ের সমসাময়িক অনেকের স্মৃতিচারণ থেকে পরে জানা গেছে ,এই গায়ত্রী পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে প্রেসিডেন্সি কলেজের উজ্জ্বল ছাত্রী গায়ত্রী চক্রবর্তী। পরবর্তী সময়ে যিনি গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক নামে খ্যাত হয়েছিলেন। ফরাসি থেকে ইংরেজিতে দার্শনিক জাক দেরিদার ‘অফ গ্রামাটোলজি’ বইয়ের অনুবাদ, ‘ডিকনস্ট্রাকশন’  বা অবিনির্মাণ তত্ত্ব (গায়ত্রী বাংলা ভাষায় বিনির্মাণের বদলে এই শব্দটি পছন্দ করেন) থেকে শুরু করে মহাশ্বেতা দেবীকে ইংরেজি ভাষায় বিশ্বের সামনে তুলে ধরা সব মিলিয়ে গায়ত্রী নিজেই এক উজ্জ্বল উপস্থিতি হয়ে উঠেছিলেন তাঁর নিজের সময়ে। অথচ তাঁর সঙ্গে বিনয় মজুমদারের তখন ভাল করে পরিচয়ই হয়নি। তাঁর জন্য তিনি উন্মাদনার সকল পারদ অতিক্রম করে গিয়েছেন। এক সময় গায়ত্রীকে উপনীত করেছেন ‘ঈশ্বরী’তে, যাতে মনে হতে পারে বিনয়ের ঈশ্বরীই গায়ত্রী।

কবিদের ভালোবাসার কথা চিরকালই এক রহস্যময় এলাকা। বিনয় মজুমদারের দিকচিহ্নহীন ভালোবাসার পৃথিবীতে এই রহস্যময়ীর অনুসন্ধান করাটা তো রীতিমতো ডুবুরী নামানোর মতো বিষয়। এই অনুসন্ধানে অবশ্য আরও এক গায়ত্রীর সন্ধানও পাওয়া যায়। বিনয় কিছু দিন হিন্দু হোস্টেলের আবাসিক ছিলেন। তখন সেখানে সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন অধ্যাপক জনার্দন চক্রবর্তী। তাঁর কন্যার নামও ছিলো গায়ত্রী, যদিও বয়সে সে বেশ খানিকটা ছোট। যে সময়টায় কবি হিন্দু হোস্টেলে থাকছেন, তখন সেই তরুণীর বয়স চৌদ্দ থেকে পনেরো হবে। কিন্তু এই গল্পের সূত্র পরে বেশি দূর এগোয়নি। গ্রন্থজগৎ প্রকাশনার কর্ণধার দেবকুমার বসুর জবানীতে জানা গেছে, গায়ত্রীর সঙ্গে বিনয়ের সাক্ষাৎ মাত্র দিন দুয়েকের জন্য হয়েছিলো, কফি হাউসে— আর তা ছিলো নেহাতই সৌজন্যমূলক।গ্রন্থজগৎ প্রকাশনা সংস্থা থেকেই বিনয় মজুমদারের প্রথম কবিতার বইটি প্রকাশিত হয়। মজার বিষয় হচ্ছে, সেই সামান্য পরিচয়ের সূত্র থেকে বিনয় মজুমদারের প্রায় উন্মাদনায় পৌঁছনো, সে কি কেবলই আর্তি ছিলো না কি উন্মাদনার এক পূর্বসূত্রের উপস্থাপনা তা বলা কঠিন।

দূর্গাপুরে হোস্টেলে থাকাকালীন একটি চিঠিতে বিনয়ের বাবা লিখছেন, ‘‘তোকে নিয়ে আমার চিন্তা। তোকে শুধু একটু ‘ভালো ভাবে আছিস’ দেখে যেতে পারলে শান্তিতে মরতে পারব।’’

গায়ত্রী বিষয়ে বিনয় মজুমদারের উন্মাদনার কিছু কথা জানা যায় গায়ত্রীর বন্ধুদের মারফৎ। শমীক বন্দ্যোপাধ্যায (যিনি গায়ত্রী চক্রবর্তীর সহপাঠীও ছিলেন) বলেছেন, এক দিন গায়ত্রী কলেজে ক্লাস করছেন জেনে বিনয় প্রেসিডেন্সির ইংরেজি ডিপার্টমেন্টে এসে হাজির হলে, তাঁর থেকে নিস্তার পেতে গায়ত্রী অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে যান।
এই সব ঘটনা যখন ঘটছে, বিনয়ের বয়স তখন আঠাশ। ‘ফিরে এসো চাকা’ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু গায়ত্রী যেন তাঁর অবসেশন হয়ে বসে রয়েছে। একমাত্র কবি বন্ধু শক্তির কাছে চিঠিতে বিনয় মজুমদার দুর্গাপুর থেকে জানতে চাইছেন গায়ত্রীর ঠিকানা, যার উত্তরে শক্তি লিখছেন, ‘গায়ত্রীর ঠিকানা আমি সুনীলের ভরসায় না থেকে জোগাড়ের চেষ্টা করছি এবং করে ফেলবোই। এক সপ্তাহের মধ্যে কথা দিচ্ছি তুমি ওর ঠিকানা পাবে। কেয়া বলে মেয়েটির খোঁজে আছি। তার সঙ্গে আমার পরিচয়ও আছে, দেখা হলেই চেয়ে নেব।’ আর একটি চিঠিতে শক্তি লিখছেন, ‘দুদিন কেয়ার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, দেখা হয়নি। তবে আগামী সপ্তাহে দেখা করে ঠিকানা জোগাড় করব, তুমি সুনীলকে ও বিষয়ে কিছু লিখো না।’ সম্ভবত বিনয় মজুমদার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কেও লিখেছিলেন এই মহিলার বিষয়ে এবং সুনীল বিরক্ত হয়েছিলেন, যার জন্য শক্তির এই সতর্কীকরণ। আরও অনেককেই বিনয় মজুমদার লিখেছিলেন গায়ত্রীর খোঁজ জানতে। ধানবাদ-নিবাসী জনৈক সলিল চক্রবর্তীকে তিনি লিখেছেন, যার সঙ্গে ছিলো গায়ত্রীর দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়তা। তিনি বিনয়ের চিঠির উত্তরে লিখেছেন, ‘ওর ঠিকানা জানি না, তবে শুনেছি আমেরিকা গেছে। কিন্তু আমার জিজ্ঞাস্য হলো গায়ত্রীকে আপনার কী প্রয়োজন? ওকে কি আপনি ভালোবেসে ফেলেছেন? আমি বলব ওর সম্বন্ধে আপনার কৌতূহল না থাকাই ভালো।’

১৯৬২ সালে ডায়েরির পাতার তলার দিকে বিনয় মজুমদার অঙ্কের ফরমুলা, উপরে লেখা আছে… ‘ভালবাসা অবশিষ্ট নেই/ অথবা গৃহের থেকে ভুলে বহির্গত কোনো শিশু/ হারিয়ে গিয়েছে পথে, জানে না সে নিজের ঠিকানা।’

কলকাতায় আসতে বিনয় মজুমদার ছিলেন মরিয়া। আত্মীয়দের কাছ থেকে ভরসা না পেয়ে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে অনুরোধ করেছিলেন কলকাতায় থাকার একটা ব্যবস্থা করতে। ১৯৬২ সালের ২৯ আগস্ট শক্তি বিনয়কে লিখছেন, ‘আমি একটি ঘরের সংবাদ পেয়েছি। সেটা সঠিক না জানা পর্যন্ত তোমাকে চিঠি লিখতে পারছিলাম না। কিন্তু সেটা এখনো স্থির হয়নি। যদি সেটা পাওয়া যায় ভালো, নচেৎ ইন্দ্রনীল বলে আমাদের এক বন্ধু গ্রে স্ট্রিটের ঠিক মোড়ে, একটি ঘর নিয়ে থাকে। সেখানে তুমি অনায়াসেই থাকতে পারবে।’ কলকাতায় থাকার একটা সাময়িক ব্যবস্থা করে দেওয়ার পরও বন্ধুকে সতর্কবাণী দিতে ভুলছেন না শক্তি— ‘হঠাৎ চাকরি ছেড়ো না যেন। শেষ পর্যস্ত সত্যিই চাকরি যদি খুব কষ্ট করে করতে হয়, তবে ছেড়ে দেওয়াই ভালো হবে।’ এই যে কলকাতায় ফিরে আসার অদম্য বাসনা ও প্রয়াস, সে কি হোস্টেলে থাকার অসুবিধে, না কি সাহিত্যজগৎ থেকে দূরে থাকার কষ্ট, না কি আরও অন্য কিছু? অনেকে বলেন কলকাতার প্রতি এই তীব্র টান বিনয় মজুমদারের মধ্যে জন্ম নিয়েছিলো গায়ত্রীর জন্য।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]