গারবেজ ডে

আশিকুজ্জামান টুলু

বিদেশ বিভূঁইয়ে ময়লা ফেলানো এক ঝক্কি বলা যায় কারন আমাগো বাঙ্গালীদের সাধারণত দেশে যাইতে গেলে যেমন লাগেজ বেশী, ময়লা ফেলতে গেলেও ময়লা বেশী অর্থাৎ পাশের বাসার সাদা নিলের ময়লা হয় মাত্র একটা কালো বড় ব্যাগ । আর আমাদের বাসায় ময়লা হয় মিনিমাম ৩টা এক্সট্রা সাইজের ব্যাগ এবং যে ব্যাগের মধ্যে ডাটা শাক আর চিংড়ী মাছের ময়লা থেকে শুরু কইরা পুরান বদনা, তবলা, হাতুড়ি, কোলবালিশ সবই থাকে । জীবনে যতবার দেশে গেসি প্রত্যেকবারই নিজেদের মনে হইসে শালা কেবল লঞ্চ থেইকা নামলাম কারন সাদাগো হাতে শুধুমাত্র একটা ব্রিফথকেস থাকে আর আমাগো এক হাতে এয়ারলাইন্সের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ৯”X১৫.৫”x২১.৫” সাইজের হ্যান্ড ব্যাগ কিন্তু ওটার ওজন মাইপা দেখলে ওরা আমাগোও প্লেনে উঠেতে দিবোনা অর্থাৎ মিনিমাম ২০ কেজি ঠেইলা ধাক্কাইয়া ঢুকানো হয় এবং ওগো সামনে দিয়া প্লেনে ঢুকার সময় এমন একটা ভাব করি যে খুবই হালকা । আরেক হাতেও সেম সাইজের প্লাস্টিকের ব্যাগ, কান্ধে ঝুলানো থাকে আরেকটা ভারী ব্যাগ, দেখলে মনে হয় দেশে যাইতেসি না বরং প্লেনে ঔষধ বিক্রি করতে উঠসি । আমাগো হাতে অতকিছু দেইখা বিমান বালাগো হাতের বালা খুইলা যাওয়ার মতো অবস্থা হয় কিন্তু ভদ্রতা কইরা কিচ্ছু কয় না ।
একদিন সোমবারে অর্থাৎ যেদিন ময়লা নিতে আসে ময়লাওয়ালারা ট্রাক নিয়া, জানালা দিয়া দেখি যে ময়লার বিশাল গাড়িটা পাশের বাসার নিলের ‘একটি পরিচ্ছন্ন কালো ব্যাগ’ ময়লা নিয়া আমাদের বাসা পার হইয়া পরের বাসায় রওনা দিয়া দিসে । আমাদের সেদিন ময়লা বাসার সামনে তখনও দেয়া হয় নাই । একবার গাড়ী মিস হইয়া গেলে আবার পরের সোমবার । যাইহোক হঠাৎ দেখলাম আমার স্ত্রী দুই হাতে বিশালকায় দুইটা ময়লার ব্যাগ লইয়া ট্র্যাকের পিছনে দৌড় দিসে আর মুখে বাংলায় চিল্লাইতেসে ‘এই দাড়াও এই দাড়াও’ বইলা । আসলে উত্তেজনায় ইংলিশ থুইয়া মাদার টাং আইসা পড়সে, হুশ নাই যে ওই বেটা সাদা, বাংলা বুঝেনা ।
ঠিক এইরকম আমার এক বন্ধুর বাসায় ও রেনোভেশন করাইসে এক বাঙ্গালী ভাইরে দিয়া । ওনার সঙ্গে কথা ছিলো যে উনি রেনোভেশনের সব গারবেজ কাজ শেষ হইলে নিয়া যাইবো গারবেজ ব্যাঙ্কে ফেলাইতে । উনি কাম শেষ হওয়ার পর চামে কমোডসেট অর্থাৎ টয়লেটের উপরে লাগানো পানির জারটাসহ টয়লেটটা ওর বাসার সামনের লনে ফালাইয়ে নিরুদ্দেশ হইয়া গেসে এবং ফোন করলেও ধরেনা । ওর লন আর পাশের বাসার স্টিভের লন লাগোয়া । স্টিভের মেজাজ খারাপ হইয়া গেছে ওর লনের সামনে কমোড দেইখা এবং সেটাই স্বাভাবিক । স্টিভ এইটা নিয়া বন্ধুরে আপত্তি জানাইয়া কাউ কাউ শুরু করসে । বন্ধু জিনিসটারে কোনরকমে ঠাণ্ডা কইরা রাখসে সোমবারে ময়লার গাড়ী নিয়া যাইবো কইয়া । যাইহোক সোমবারে বন্ধু সকালে উইঠা চামে জানালা দিয়া দেখতে শুরু করছে যে কখন গাড়ী আসে । চামে দেখতেসে এই কারনে যে এতবড় কমোড নেয় কিনা ওরা কারন ময়লার গাড়ী সাধারণত বাসার রান্নাবান্না টাইপের গারবেজ নেয়, এইসব রেনোভেশনের গারবেজ নেয়না । ও দেখলো দূর থেইকা গাড়ী আইতেসে, ওর উত্তেজনা বাইড়া গেলো, মনে মনে ভাবতে থাকলো ‘নিবো তো? না নিলে তো ওটা আবার নিজের গাড়িতে তুইলা গারবেজ ব্যাঙ্কে নিয়া ফালাইতে হইবো’ । গাড়ী ধীরে ধীরে আইসা ওর বাড়ির সামনে থামলো, গারবেজওয়ালা গাড়ী থেইকা নাইমা কমোডের কাছে আইসা একটু আশ্চর্য হইলো, চারিদিকে তাকাইলো একবার, এইবার দুই হাত দিয়া নাড়াইয়া দেখলো কমোডটারে, বেশ ভারী, আবার তাকাইলো চারিদিকে, মনে হয় হেল্পের আশায় । ওদিকে আমার বন্ধু পর্দাটা আরেকটু বন্ধ কইরা যথাসম্ভব নিজেরে বেগানা পুরুষের সামনে থেইকা আড়াল রাইখা খুব সামান্য ফুটা দিয়া দেখতে থাকলো আর ভাবতে থাকলো যে দেখিনা বেটায় কি করে । যখন ময়লাওয়ালা চারিদিকে তাকাইতেসে ঠিক তখনি পাশের বাসার স্টিভ ওর বাচ্চার ভাঙ্গা সাইকেলটা দিতে ট্র্যাকের সামনে আইসে । আর যায় কই, ময়লাওয়ালা স্টিভরে কইলো, ওয়, একটু ধরোতো মালটা ।
স্টিভ ওই কমোড দেইখা ধরবো, না ধরবো না, সেই দ্বিধাবিভক্তিতে ভাসতে থাকলো । ওদিকে ময়লাওয়ালা আবার কাউ কাউ কইরা উঠলো স্টিভরে,কিবে, কানে কি পায়ের বুড়া আঙ্গুল দিয়া রাখসোস? হুনোস না ডাকতেসি তোরে??
স্টিভতো ওরে কইতে পারতেসে না যে ও ধরবো না । কারন না কইয়া দিলেতো ময়লাওয়ালাও ওরে একদিন ময়লা ঠিকমতো না নিয়া সাইজ কইরা দিবো । স্টিভের আরও মেজাজ খারাপ হইসে কারন এই কমোড লইয়াই গতকাল ঝগড়া হইলো, আবার সেই কমোড ওরে ধইরাই ফালাইতে হইবো । কি আর করা, বিড় বিড় করতে করতে স্টিভ কমোডটা ধইরা উচা কইরা আমার বন্ধুর জানালার দিকে তাকাইলো, আমার বন্ধু ঠিক স্বাধীনতা সংগ্রামে শত্রুসেনার হাত থেইকা বাচার জন্য বাঙ্কারে ঝাপাইয়া পড়ার মতো ওর মেঝেতে মাথা নিচু কইরা বইসা পড়লো যাতে স্টিভ কোনভাবে দেখতে না পায় যে বাঙ্গালী চামে চামে পাশের বাসার সাদারে দিয়া নিজের পাকস্থলী প্রক্ষালক যন্ত্র গারবেজ ট্রাকে উঠানোর ব্যাবস্থা করাইতেসে । এদিকে স্টিভের অনিচ্ছা দেইখা গারবেজয়ালা দ্বিতীয় ঝাড়িটা স্টিভরে ইতিমধ্যে মাইরা দিসে এই বইলা, কিবে, বিয়ানে ভাত খাস নাই? ঝিমাইতেসোস কেন? হাত চালা তাড়াতাড়ি।
মনে খুব কষ্ট আর রাগ নিয়া পাশের বাসার বাবা স্টিভ কমোডটা ট্রাকে উঠাইয়া দিয়া ইংরেজিতে গালি দিতে থাকলো মনে মনে ।

লেখক: গায়ক/ মিউজিশিয়ান

ছবি: গুগল