গা ঘেঁষে দাঁড়ানো একটি উপমহাদেশীয় সামাজিক ব্যাধি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নুসরাত নাহিদ
লেখক

শ্রীনগর থেকে কোলকাতায় পৌঁছতে পৌঁছতে রাত প্রায় পৌনে এগারো। ক্যারুজেল থেকে লাগেজ নিয়েই যাত্রীদের দৌড়ে যেতে দেখলাম। নিজেরা ধীরে সুস্থ্যে বের হতেই বুঝলাম এর মাজেজা। সরকারচালিত প্রি-পেইড ট্যাক্সির কাউন্টার লোকে লোকারণ্য। মেয়ের বাবা সারিতে গিয়ে দাঁড়ালে আমরা তার পাশেই ট্রলি নিয়ে এগুতে থাকি। সামনে এগিয়ে সরে দাঁড়াবার পথ ছিলো না। উদ্দেশ্য একটু খালি পেলেই সারির হ্যাপা থেকে মেয়েকে নিয়ে সরে দাঁড়াবো। এতে একই ট্যাক্সির জন্যে তিনজন মিলে স্থান দখল করে থাকতে হয়না। হঠাৎ পায়ে দড়াম করে পেছনের এক ট্রলি এসে লাগলো। ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখলাম ধোপদুরস্ত এক ভদ্রলোক। ভুল করে ট্রলি সামলাতে পারেননি ভেবে কিছু বললাম না। খানিক বাদে আবারও এক কাহিনী। মেয়ের বাবা ততক্ষণে মূল সারিতে এগিয়ে গেছেন। আর আমরা দুজন বেরিয়ে যাবার জন্যে বাঁয়ে সরে গেছি। এবার বিরক্ত হয়েই বললাম ট্রলি সামলে রাখতে। উনি এবার ট্রলি একেবারে পাশ দিয়ে এগিয়ে দিলেন আর উনি এসে দাঁড়ালেন ঘাড়ের কাছে। ওনার এক কম্পাউন্ডার বা এসিস্ট্যান্ট গোছের কেউ ততক্ষণে ওনার কাছে পৌঁছে গেছেন। বড়কর্তা হলেও ঘটে যে সভ্যজ্ঞান বলতে কিছু নেই বুঝে নিতে দেরি হলো না। যথাসাধ্য চেষ্টা করে সরে গেলাম নিরাপদ দূরত্বে। খানিক বাদে প্রিপেইড ট্যাক্সি কাউন্টারের কিউতে এই বড়কর্তা গিয়ে পড়লেন মেয়ের বাবার কাঁধে। সহকারী সমেত। এক ইঞ্চি পরিমাণ ফাঁকও রাখলেন না। মেয়ের বাবা ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন সরে দাঁড়াতে। ওনাদের কোন বিকারই হলো না। আমি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের ছবি তুললাম। নাহ্ পোস্ট করিনি। ভুলেই গিয়েছিলাম।

এই ঘটনা ভুলে গেলেও যেটা ভুলিনা সেটা হলো ঢাকা এয়ারপোর্টের লাগেজের কনভেয়র বেল্ট আর সেখানটায় উপচে পড়া পুরুষের পাল। প্রতিবার বাইরে গেলেই যে আতংক নিয়ে ফিরে আসতে হয় দেশে, তা এই লাগেজ ক্যারুজেল। আপনি যে শ্রেণীতেই ভ্রমণ করুন না কেন, ঢাকা এয়ারপোর্টে ক্যারুজেল থেকে লাগেজ নিতে গিয়ে ঘাড়ের ওপর ট্রলির ওপর গায়ের ওপর পুরুষের পাল এসে পড়েনি এমনটা বিরল। একবার অনেক বুঝিয়েও যখন ট্রলির ওপর, গায়ের ওপর ঝুঁকে পড়া বন্ধ করতে পারলাম না, কষে ধমক লাগালাম। ব্যস, এরপর পুরুষের পালে গুঞ্জন শুরু হলো। সামনের মহিলার মাথা গরম। একজন অতি উৎসাহী তালগাছ এসে আবার ঘুরে ঘুরে দেখেও গেলেন সামনে দাঁড়িয়ে আপত্তি জানানো মহিলাটা কে। এইতো আমরা, এই আমাদের একটা রূপ।

নাহ্ আমি ছবি তুলিনি, চিল্লাপাল্লা করে ব্যক্তিগত দূরত্ব নিশ্চিত করতেই চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম, যাই। পাবলিক ট্রান্সপোর্টও ব্যবহার করতে হয়না। যারা করেন কী ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যান, অনুমানও করতে পারিনা। কিন্তু আমি নিশ্চিত জানি, গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না একটি সার্বজনীন প্রতিবাদ। আমিও এই প্রতিবাদে সামিল। তাতে যাদের আঁতে ঘা লেগে নানান ছুতো, নানান কথায় যুক্তি প্রতিযুক্তি দাঁড়া করিয়ে দিয়ে কোমর বেঁধে লড়াই করে যাচ্ছেন, তাদের জন্যে সমবেদনা। কেঁচোর মুখে নুন পড়লে মোচড়ামুচড়ি করবেই, করেই। অসুখে জীবাণুতে ওষুধ পড়লেও যেমন হয়। এটা যেমন অসত্য নয় যে কিছু পুরুষ শুধু সুপুরুষ নন, সত্যিকারের মানুষও, আবার এটাও অসত্য নয় যে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আমাদের নারীদের, যারা নিজেদের মানুষ বলেই ভাবতে ভালোবাসি।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]