গুড টাচ, ব্যাড টাচ আর #Me Too

সংঘমিত্রা রায়চৌধুরী দাসগুপ্ত

(কলকাতা থেকে): চলতি বছরটিতে সামাজিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটো কয়েনেজ পেয়েছি আমরা, দুর্ভাগ্যজনক কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে।এক ‘গুড টাচ, ব্যাড টাচ’ এবং দুই ‘ মি টু’। শব্দবন্ধদুটি ছিলোই বেশ কিছুকাল ধরে; ইদানীং আমাদের দৈনন্দিন লব্জ, আলোচনা,এবং(বিশেষত দ্বিতীয়টি) খিল্লির পরিসরে ঢুকে পড়েছে। প্রথমটি শিশুদের বিরুদ্ধে একের পর এক ঘটে চলা যৌননিগ্রহ (পিডোফিলিয়া) রোধ করার কিছু সিস্টেম্যাটিক প্রসিডিওর এবং দ্বিতীয়টি,প্রধানত কর্মস্থলে, নারীর বিরুদ্ধে যৌননিগ্রহের অভিযোগ-বিবৃতি, হার্ভি ওয়াইনস্টিনকে দিয়ে যার সূত্রপাত হয়ে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বর্তমানে যা একটি আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। যে আন্দোলনের ঢেউ হালফিল আছড়ে পড়েছে আরবসাগর তীরে, রাজধানীর ক্ষমতার অলিন্দেও।

শিশুদেহে ‘ব্যাড টাচ’-এর সূত্রপাত হয় পরিবারের ভেতর থেকে; নিকটাত্মীয় এবং অনতি-নিকট আত্মীয় থেকে শুরু হয়ে পারিবারিক বন্ধু, প্রতিবেশী, কারপুল, স্কুল ইত্যাদি নানা পরিসরে ব্যাপ্ত এর পরিধি। আমার ছেলেবেলা, আমার ছেলের ছোটোবেলা, এবং সম্ভবত আমার মায়ের ছোটোবেলায়ও, এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি, ঘটার কথা নয়, আমার নাতি/নাতনির ছেলেবেলাতেও ঘটবে এমনটি আশা করার কোনো কারণ এখনো দেখছি না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রক্রিয়াটা জটিলতর এবং কদর্যতর হচ্ছে, তফাৎ বলতে এইটুকুই। ‘ব্যাড টাচ’ -এর প্রকার-প্রতিক্রিয়া-প্রতিকার ইত্যাদি শিখিয়ে সমস্যা কিছুটা হলেও কমবে নিশ্চয়, শিশুটি এড়িয়ে চলতে শিখবে, যদিও মানসিক বিকৃতি তার নিবৃত্তির নতুন নতুন রাস্তা খুঁজে নেবেনা, এমনটি ভাবা বোকামি। তবে এই সার্ভাইভাল স্ট্যাটেজি শেখার জন্যও তো ন্যূনতম একটা পরিপক্কতা লাগে। একটা সদ্যোজাত শিশুকে বা আটমাসের হামাগুড়ি দেওয়া বাচ্চাকে কী গুড/ব্যাড টাচ শেখাবো আমরা? তার জন্য কোন স্ট্যাটেজি কার্যকর হবে? তাছাড়া খুব দ্বিধার সঙ্গেই আরেকটি কথা মনে হয় আমার।আজকের শৈশবের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছি আমরা; পড়ার আনন্দ, খেলার মাঠ, প্রতিযোগিতাবিহীন বন্ধুতা, ঠাকুমা-পিসি-কাকুর প্রশ্রয়, স্পর্শের প্রকারভেদ শেখাতে গিয়ে অবশিষ্ট শৈশবটুকুও কেড়ে নিচ্ছি না তো?

এবার আসি দ্বিতীয় প্রসঙ্গটিতে। যদিও শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার সূচকে একদম ওপরদিকে থাকা সমাজের একটা খুব সীমিত অংশ এই আন্দোলনটিতে সামিল হচ্ছেন,হিমশৈলের সিংহভাগই জলের তলায় ডুবে আছে এখনো, তবু এই যে একসঙ্গে অনেকে সরব হচ্ছেন, দেরাজে সঙ্গোপনে লুকিয়ে রাখা অনেক কঙ্কাল বেরিয়ে আসছে, স্ক্রীনশট ব্যাপারটা অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে, কেউ কেউ আইন-আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন, ক্ষমতাবান মানুষদের ল্যাজেগোবরে হতে দেখে আমরা আম-আদমী সঙ্গতভাবেই আহ্লাদিত হচ্ছি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই না হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, প্রাথমিকভাবে খুব পরিতৃপ্তির একটা অনুভূতি হচ্ছিল সব মিলিয়ে। কিন্তু, অন আ সেকেন্ড থট, এবং বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আলোচনার ফলশ্রুতিতে, কিছু অন্যতর মাত্রা যুক্ত হচ্ছে চিন্তাভাবনায়, কিছু প্রশ্ন তৈরী হচ্ছে নিজের ভেতরেই। এবং, কিছুটা রিগ্রেসিভ শুনতে লাগার আশঙ্কা সত্ত্বেও সেই দ্বিধাগুলো প্রকাশ করছি এই পরিসরে।

প্রথমত, কর্মস্থলে নিগ্রহ, মহিলা সহকর্মীর বিরূদ্ধে, শুধু ‘যৌন’ হলেই মি টু-র আওতায় আসবে? আর বাকি সব? এই যে মহিলা কর্মচারী তার গার্হস্থ্য দায়িত্ব সামলে ( আমাদের সামাজিক পরিকাঠামোতে যেটা এখনো প্রিডমিনেন্টলি মহিলাদেরই কাজ) অফিসের কাজ করছে মানেই সে অফিসের কাজটাতেই ফাঁকি দিচ্ছে- এই যে প্রতিষ্ঠিত শভিনিস্টিক ধারণা, এবং তার ফলশ্রুতিতে বিভিন্নরকম ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, যেটা থেকে উত্তরণের জন্য সাধারণভাবে একজন মহিলাকে কর্মক্ষেত্রে হামেশাই তার প্রয়োজন,ক্ষমতা এবং পুরুষ সহকর্মীর থেকে অতিরিক্ত উদ্যোগ নিতে হয়, সেটা নিগ্রহ নয়? আমি একটি মেয়েকে জানি যার বাড়ি কোলকাতার বাইরে হওয়ায় সে অনলাইন শপিং করলে অফিসের ঠিকানায় ডেলিভারি নিতো এবং তার কাজটা মূলত ফিল্ড-ওয়ার্ক হওয়ায় সহকর্মীদের কারোকে বলে যেত পার্সেলটা রিসিভ করতে এবং অচিরেই সে বুঝতে পারে যে বই/ পারফিউম / অন্তর্বাস নির্বিশেষে পার্সেলটা খুলে দেখা হচ্ছে… এটা নিগ্রহ নয়? কর্পোরেট আবহে তো অনেকরকম পদ্ধতি, সরকারী অফিসের আবহেই বা কম কি? কারোকে জব্দ করতে হবে? ট্রান্সফার করতে হবে?  ‘গিভ দ্য বীচ আ ব্যাড নেম অ্যান্ড হ্যাং হার।’ আর কে না জানে একজন মহিলার চরিত্রহননের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পন্থা কি?এসব আসবে না মী টু-র চৌহদ্দিতে?

আবার অন্য দিক থেকে দেখলে , পুরো ব্যাপারটাই তো মৌখিক অভিযোগের ওপর নির্ভরশীল, মূলত। সুতরাং, কিছু এক্সেস, কিছু প্রতিশোধপরায়ণতা, কিছু ঘোলাজলে মৎস্যশিকার থাকবে না, এটাও বুকে হাত দিয়ে কেউ বলতে পারে না। ধরুন, সাজুগুজু করে অফিস গেছি, বস বললো, চল্, ডেটিং-এ যাই, আমিও হালকা ফ্লার্ট করে এড়িয়ে গেলাম, এত পর্যন্ত ঠিক ছিল, এবার কিছুদিন পর তীব্র মতবিরোধ বা স্বার্থের সংঘাতের ফলশ্রুতিতে আমি ওই নির্দোষ রসিকতাটাকেও যদি নিগ্রহের তকমা দিয়ে ফেলি সেটা কি ঠিক হয়? সুধীর মিশ্র-র ‘ইনকার’ ছবিটার কথা মনে পড়ে গেল লিখতে লিখতে। আপাতদৃষ্টিতে এই এক্সেসগুলো প্রাথমিকভাবে কোল্যাটারাল ড্যামেজ মনে হলেও আসলে তো একটা বিশাল বিশ্বাসভঙ্গও বটে। খাপ বসিয়ে যে পুরুষটির বিচার করা হলো, তাকে ঘিরে যে সামাজিক-পারিবারিক আবহ তার ভারসাম্যটিও তো নষ্ট হচ্ছে এর ফলে। সেই ক্ষতিপূরণ কে কিভাবে করবে? আবার এটাও ঠিক যে এত চিন্তাভাবনার মধ্য দিয়ে গেলে এই আন্দোলনটি যে অসীম সম্ভাবনার সূচনা করেছে সেটাও ধূলিসাৎ হয়ে যায়। তবু, দশজন প্রকৃত অপরাধীকে শাস্তি দিতে গিয়ে একজন নির্দোষ মানুষও যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সে বড় সুখের হবে না…তাই নয় কি?

ছবি: গুগল