গোছানো ও গুটানো জীবন

বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখবেন তার জীবনের কথা।কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো। পড়ুন কাটাঘুড়ি বিভাগে।

কনকচাঁপা

এতো দিনের শৈশব কৈশোর ও রূপান্তরিত হল।দুষ্ট কনা একটু একটু করে বদলে শান্ত হয়ে যেতে লাগলো। বেল করে দেয়া চুল ঝাঁকড়া হয়ে দুই বেনীতে বদলে গেল।চুলের ভারে একটা ঝুঁটি বাঁধা দায়।বাবার হাতের বানানো যাদুকরি ফ্রক ছেড়ে একটু বড় বড় জামা পরা ধরলাম।নিজের পড়ার টেবিল অসম্ভব চকচকে ঝকঝকে নিটোল রূপ পেলো। রঙিন মলাটের বদলে সাদা মলাট জুড়ে গেলো আমার বইয়ের ভাগ্যে।গান সাধনা ভীষন রকম বেড়ে গেল।ওস্তাদজীর বাসায় গেলে যে ছবক আমাকে দিতেন তা সারা সপ্তাহ অতিরিক্ত চাপ দিয়ে আব্বা করিয়ে নিতেন।এ ছাড়া সকালে দুটো ও রাতে আম্মা ধমক না দেয়া পর্যন্ত গানের বায়না তো ছিলই।খেলাধুলা মোটামুটি বন্ধই হয়ে গেল।পাড়ার বন্ধুর সংখ্যা শুন্যের কোঠায় নামলো। জীবনটা একদমই অন্যরকম হয়ে গেল।স্কুলের পড়া,বাড়ির কাজ,গানের ছবক,বড় বড় সুরা শেখা,মাঝেমধ্যে রান্নার চেষ্টা, গাছ লাগানোর কাজ,সব চলতে লাগলো দারুন ভাবে।সঙ্গে একটা নতুন ব্যাপার আমাকে পরিচালিত করতে লাগলো।তা হল আয়না।নিজস্ব একটি আয়নাতে একান্ত নিজের করে নিজেকে দেখা! কেউ দেখে ফেলার আগেই আয়না চটজলদি লুকিয়ে ফেলার অভ্যাস ও রপ্ত করে ফেললাম।নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম।চুলের প্রান্তরেখা, ভ্রুর বাকানো অঙ্গন,চোখের গভীরতা, নাকের ভাঁজ,বরফি কাটা চিবুক, নিজেই দেখি আর প্রেমে পড়ি।নিজেকে দেখাই আমার শেষ হয়না।আমি ভাবি, আমি যে সুন্দর, কেউ বলেনা কেন? হাহাহা।বারান্দার নরম রোদে, বিকেলের ম্লান আলোতে যত নিজেকে ভালো লাগে সেটা যেমন তেমন, রাতে বিছানায় গিয়ে হ্যারিকেনের অদ্ভুত আলোআঁধারীতে নিজেকে রহস্যময়ী মনে হয়! অদ্ভুত এক ভাললাগায় নিজের ছোট পৃথিবী হেসে ওঠে। যে আমি খোলা প্রান্তরে হাঁসের রাখাল অথবা মুক্ত জলকন্যা হয়ে মুক্তো জীবন উপভোগ করতাম সেই আমি নিজের প্রেমে নিজের জন্য নিজের কাছে বন্দী হয়ে গেলাম স্বেচ্ছায়। পড়াশোনা, গান, বই পড়া. নামাজ পড়া. গাছ লাগানো আর নিজের সঙ্গে নিজের প্রেম আমার জীবনের রুটিন হয়ে দাঁড়ালো। শৈশব থেকে কৈশোর এ পৌঁছে গিয়ে বদলে গেলাম এই আমি।এবং এলোমেলো জীবনটাকে কারো হুকুম আদেশ ছাড়াই গুছিয়ে এবং পরিষ্কার ভাবে গুটিয়ে নিলাম।

ছবি: লেখক