গোলাপের নিচে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘অনেক রক্ত আগুন পার হয়ে এসেছে এ গোলাপ

আমার বিব্রত করতলে, প্রত্যহের কালো রণাঙ্গনে’।

কবি শহীদ কাদরীর লাইন। সত্যিই অনেক রক্ত আগুন পার হয়ে এসেছে গোলাপ। ইতিহাস বলে, গোলাপের ইতিহাস লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এই ফুল তার রূপে, সুঘ্রাণে আর  কাঁটায় পৃথিবীতে সম্রাট থেকে শুরু করে প্রেমিক, কবি, সাহিত্যিক আর সাধারণ মানুষকে মোহমুগ্ধ করে রেখেছে। কবে গোলাপ মাথা তুলেছিলো পৃথিবীর বুকে? কবে ছড়িয়ে দিয়েছিলো তার সুঘ্রাণ? কবে কাঁটার আঘাতে নিজেকে বিখ্যাত করে তুলেছিলো রক্তপাতে? ইতিহাস বলে হাজার পাঁচ বছর আগে চীনে প্রথম গোলাপের চাষাবাদ হয়েছিলো। গোলাপকে ঘিরে যুগে যুগে কত কী ঘটনা! গোলাপকে ঘিরে যুদ্ধ, গোলাপ ভালোবাসার প্রতীক, বিশ্বাসঘাতকতারও। এই ফুল হয়ে উঠেছে পৌরাণিক কাহিনীর অংশও।এই গোলাপ নিয়েই রইলো এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন ‘গোলাপের নিচে ’।    

রোমান সম্রাটরা পূর্ব গোলার্ধ থেকে এই গোলাপ নিয়ে গিয়েছিলেন তাদের বাগানে। সেখানে তাদের প্রেম ভালোবাসার ওপর আলো ছড়ানো ছাড়াও গোলাপের ছিলো অনেক দায়িত্ব। রোমান সমাজে আধিপত্য আর আভিজাত্য প্রকাশ করতে গোলাপের সুগন্ধী মাখা জলের ব্যবহার রোমানদের স্নানাগারে হয়ে উঠলো অপ্রতিরোধ্য। তারা খাবার এবং পানীয়তে গোলাপের নির্যাস ব্যবহার করতে শুরু করলো। রোমান আমলে কবরে গোলাপ ফুল দেয়ার বিষয়টা হয়ে উঠেছিলো বিশেষ সংস্কৃতি। তারা বলতো, মৃতের আত্মাকে সম্মান জানানোর জন্যই এই রীতির প্রচলন ঘটেছিলো। শোনা যায়, রোমান সম্রাট নীরো তার একটি রাজকীয় ভোজ সভায় শুধু উড়িয়ে দেয়ার জন্য ৪ লক্ষ রোমান মুদ্রা ব্যয় করে গোলাপের পাপড়ি কিনেছিলেন।

গ্রীক পূরাণে আছে, প্রেমের দেবতা কিউপিড মিশরে নীরবতার দেবতা হিসেবে পরিচিত হারপোক্রিটাসকে গোলাপ উপহার দিয়েছিলেন তার নিজের মায়ের অবৈধ প্রণয় কাহিনী গোপন রাখার জন্য। সেই কাহিনীর সূত্র ধরে আজকের পৃথিবীতে একটা কথা প্রচলিত আছে ‘আন্ডার দ্য রোজ’। এখনো কোনো ব্যক্তিগত কথা গোপন রাখার অনুরোধ জানাতে এ কথাটা ব্যবহৃত হয়।গোলাপের উজ্জ্বল লাল রঙ নিয়েও পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত আছে। বলা হয়, দেবী ভেনাস তার মৃত্যুপথযাত্রী প্রেমিককে দেখতে যাবার সময় তার পায়ে গোলাপের ঝাড় থেকে কাঁটা বিঁধেছিলো। সেই রক্তের রঙ থেকেই গোলাপের লাল রঙে এসেছে এত উজ্জ্বলতা।

ভারতে যে মোগল রাজপুত্র প্রথম গোলাপের চারা রোপন করেছিলেন মাটিতে তাঁর নাম ‘বাবর’। বাবর কেনো গোলাপ ফোটাতে আগ্রহী হয়েছিলেন পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পারস্যের চিঠিতে তার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-‘এ পর্যন্ত সমস্ত পারস্যে দেখে আসছি এরা বাগানকে কী ভালোই না বাসে। এখানে চারিদিকে সবুজ রঙের দুর্ভিক্ষ, তাই চোখের ক্ষুধা মেটাবার এই আয়োজন। বাবর ভারতবর্ষে বাগানের অভাব দেখে অবজ্ঞা প্রকাশ করেছিলেন। ভারতে যা যা না পেয়ে বাবর বিরক্ত, সে দীর্ঘ তালিকায় প্রধানতম দুটো হলো সামঞ্জস্য আর বাগান। আগ্রায় পৌঁছেই তাই বাগানে হাত, ঠিক যেমন গড়েছিলেন কাবুলে’।

বাবরের এই বাগান আগ্রা থেকে ক্রমশ শিকড় ছড়িয়ে দিলো নানা প্রান্তে। ভিন দেশের গোলাপ চারদিক আলো করে ফুটে উঠলো। সেইসব বাগানের ফুল উঠে এলো রাজপুত্র আর রাজকন্যাদের হাতে। অবশ্য তখনও এ অঞ্চলের কবিতায় পাঁপড়ি মেলেনি গোলাপ। উঁকি-ঝুঁকি ছিলো গোলাপের ফারসী কবিতায়।

ইউরোপের মাটিতে গোলাপ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে ১৮ শতকে। বিশেষ করে ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সে শুরু হয় গোলাপের চাষ। গোলাপ ফুটে ওঠে তাদের সাহিত্যেও। তখন গোলাপ আর শুধু বাগান বিশেষজ্ঞদের সম্পত্তি হয়ে রইলো না। ছড়িয়ে পড়লো তার সুগন্ধ সমাজের সর্বত্র। ঘর সাজানো থেকে শুরু করে নারীদের পোশাকেও এই ফুল প্রধান্য বিস্তার করলো। ইংল্যান্ডে ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা হয়ে উঠলো গোলাপ।ভিক্টোরিয়ান যুগে মানুষ নিজেদের অকথিত কথা প্রকাশ করতে গোলাপের ব্যবহার শুরু করলো। গোলাপ হয়ে উঠলো ভালোবাসার ভাষা।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসে কুসুম যতবার শশী ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করতে আসতো ততবারই সে শশীর লাগানো গোলাপের চারাগুলোকে মাড়িয়ে দিতো। অনিচ্ছাকৃত নয়, কাজটা কুসুম করতো ইচ্ছাকৃত ভাবেই। সেটাই ছিলো কুসুমের ভালোবাসা ব্যর্থ হওয়ার ক্রোধ, অসহায়ত্ব প্রকাশের ভাষা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় চাইলে গোলাপের বদলে যে কোনো ফুলের চারা তাঁর লেখায় ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। গোলাপ মাড়িয়ে গেলে এক ধরণের কোমলতা আর গভীরতা দলিত হয়। কথাশিল্পী গোলাপের চারা ব্যবহার করে হয়তো সে অনুভূতিটাই পাঠকের মধ্যে সঞ্চারিত করতে চেয়েছেন।

গোলাপ যে নামে ডাকো, গোলাপ তাতেই সাড়া দেয় যেন। কত রঙের গোলাপ, কত ধরণের গোলাপ বাগান আলো করে ফুটে থাকে। কিন্তু দিন শেষে সে গর্বিত গোলাপ। ব্যবহারে, প্রকাশে, ঘ্রাণে একঘেয়ে হয়ে গিয়েও গোলাপ মানুষের নন্দনতত্ত্বে ধরা দেয় ভিন্ন ভাবে। সম্রাট, কবি, প্রেমিক যুগল কারুরই গোলাপ ছাড়া চলে না।উইলিয়াম শেক্সপীয়ারেরও চলেনি।রোমিও জুলিয়েট নাটকে জুলিয়েটের মুখে উচ্চারিত হয়েছিলো সেই বিখ্যাত সংলাপ,‘গোলাপকে অন্য নামে ডাকা হলেও সে সুঘ্রাণ ছড়াবে’। এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে গোলাপের ১৫০টির বেশি প্রজাতি পাওয়া যায়। রান্নাঘর নিয়ে, রান্নার নানা উপাচার নিয়ে যারা মাথা ঘামান তারা বলছেন, গোলাপের পাঁপড়ি খাওয়া যায়।ব্যবহার করা যায় স্যালাডে।

লোরকা গোলাপ বিষয়ক কবিতায় লিখেছেন, ‘সে খোঁজে অন্য কিছু’।গোলাপ কী খোঁজে, ভালোবাসা? নাকি গোলাপেই জড়ো হয়ে থাকে বিখ্যাত সব প্রেমের গল্প?

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক কমলকুমার মজুমদারের আলোচিত উপন্যাস ‘গোলাপ সুন্দরী’। উপন্যাসে যক্ষারোগে আক্রান্ত বিলাস। তাকে সুস্থ করে তুলতে বোন আর বোনের স্বামী নিয়ে আসে তাদের কর্মস্থলে। বিলাসের দিদির এক গোলাপ বাগান আছে। সেখানে অসংখ্য দূর্লভ গোলাপ ফোটে। বৃষ্টির রাতে সেই গোলাপ বাগানে বিলাস এক অসম্ভব সুন্দরী মেয়েকে দেখতে পায়। বাগানে তুমুল বৃষ্টির ভেতর আকাশে বিদ্যুৎ চমকে ওঠে। ডোমের দল আসে বিলাসের কাছে মড়া পোড়ানোয় সাহায্য চাইতে। গোলাপ সুন্দরী, বৃষ্টিতে বিলাসদের বাগানে আশ্রয় নেওয়া মেয়েটি, একসময় অদৃশ্য হয়। আকাশে বিদ্যুৎ ঝলকাতে থাকে আর বিলাসের হিমগ্রস্থ ফুসফুসে সারতে থাকা যক্ষার জীবাণু আবার উদগ্র হয়ে কাশির সঙ্গে রক্তপাত ঘটায়। দূর থেকে ভেসে আসে ডোমদের দাহক্রিয়ার সঙ্গীত ও মাদলের বাজনা। গোলাপকে ঘিরে বিলাসের সেই এক মোহান্ধ মানসিক অংশের প্রকাশ পাঠকের চেতনাকে নিয়ে যায় অচেনা অনুভূতিতে। গোলাপ ফুলের সঙ্গে এভাবেই জড়িয়ে থাকে গল্প, কাহিনি, কাব্য। জড়িয়ে থাকে রহস্যময় প্রেম।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,
‘আমারি চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ
চুনি উঠল রাঙা হয়ে
আমি চোখ মেললুম আকাশে
জ্বলে উঠল আলো
গোলাপের দিকে তাকিয়ে বললুম সুন্দর
সুন্দর হল সে…’
আর অনেক বছর পরে এসে প্রয়াত কবি আবুল হাসান লিখলেন দীর্ঘশ্বাসের মতো লাইন, ‘গোলাপ এতো মলিনতা নিয়ে তবুও গোলাপ।’

গোলাপের মতো অবিস্মরণীয়কিন্তু গোলাপের কাঁটাও। প্রেমে যেমন গোলাপ অনন্য তেমনি প্রত্যাখ্যানে খ্যাতিমান তার কাঁটা। গোলাপের মতো সে-ও তো বিখ্যাত, আলোচিত। কাঁটা যেন প্রেমের দ্বিতীয় পৃষ্ঠা। প্রত্যাখ্যানের বেদনা, বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক কাঁটা। লম্বা ডাঁটির ডাচ গোলাপের কাঁটা থাকে না। দেখতে অনেকটা ‘কাপ’-এর মতো এই গোলাপের সুরভি কম হলেও স্থায়িত্ব অনেক বেশি। ডাচ গোলাপের ডাঁটিও প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার লম্বা। কাঁটা ছাড়া গোলাপ ফুলের গাছ ভাবা যায়? তবুও এখন এই নয়া পৃথিবীতে বছরের নির্দিষ্ট দিনে প্রেমিক প্রেমিকাদের লাগে গোলাপ ফুল। দিনটা ভ্যালেনটাইন্স ডে। গোলাপের উৎসব সাজিয়ে তোলে ভালোবাসার অনুভূতিকে। সে উৎসবে গোলাপ যেমন থাকে, থাকে তার কাঁটাও। তরুণ তরুণীরা হয়তো প্রেমে পড়ে এই দিনে। আবার ভেঙেও যায় সেই প্রেম।

কবি রাইনার মারিয়া রিলকে মারা যান আঙুলে গোলাপ কাঁটা ফুটে। সত্যিই কি এমনটাই ঘটেছিলো? কবি জানতেনই না যে গোলাপ তার মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে তার মৃত্যুকেও করে দেবে গোলাপের মতন রক্তিম। এলিজি ও সনেটগুচ্ছ লেখা শেষ করার পরের বছর থেকেই রিলকের শরীর খারাপ হতে শুরু করে। মাঝে মাঝেই তাকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে তখন। এরই মাঝে একদিন বাগানের একটি গোলাপ ফুল তুলতে গিয়ে আঙুলে কাঁটা ফুটল তাঁর। সেই ছোট ক্ষতের ছিদ্রপথ ধরেই হয়তো তাকে আক্রমণ করেছিল লিউকিমিয়া। যন্ত্রণাময় রোগ কবিকে টেনে নিয়ে গেলো মৃত্যুর দিকে। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে কবর দেওয়া হয়েছিলো কাছেই একটি গির্জার প্রাঙ্গণে। সমাধিস্তম্ভে উৎকীর্ণ হলো সেই ক্ষুদ্রাকার, কিন্তু বহু স্মৃতিসহ কবিতা, যা তিনি মৃত্যুর এক বছর আগে লিখে রেখেছিলেন ‘‘গোলাপ বিশুদ্ধ স্ববিরোধ, কারোরই নিদ্রা/না-হবার আনন্দ তুমি, অনেক চক্ষু পল্লবের তুলে’’।

কথাশিল্পী কমলকুমার মজুমদারের ‘গোলাপ সুন্দরী’ উপন্যাসের কয়েকটি লাইন দিয়ে লেখাটা শেষ হোক- ‘‘হায় গোলাপের মতো বিস্মৃত ফুল আর নাই সমস্ত মুহূর্তে যাহার অনিত্যতা, প্রথমে শুকায় ধীরে, ঝরিয়া চুপ, ক্ষণেকেই কোথায় ফুটিয়া ওঠে, সমক্ষে থাকিয়াও চির-বিস্মৃত’ বিলাস এই রুগ্ণ কথাটি প্রত্যহই বারবার উদ্বিগ্ন প্রষ্ফুটিত গোলাপের প্রতি চাহিয়া ভাবিয়াছে এ সত্য তাহার নিজস্ব অভিজ্ঞতা।’’

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ বিবিসি
ছবিঃ বিবিসি, গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]