ঘরবন্দিকালের জার্নাল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

বাহ! আরো একটি সকাল। শেষ চৈত্রের আরো একটি রোদ ছড়ানো দিনের শুরু। তারমানে জীবনের অনিশ্চিত যাত্রায় আরো একটি সকাল পাওয়া গেলো! ধন্যবাদ।
: সুপ্রভাত, বাতাস আপনি ভালো আছেন?
: রোদ?
: এই যে দৃষ্টি সীমায় সবুজ গাছেরা, আপনারা কেমন আছেন?
: কিচির মিচিরতোলা পাখি সব, আপনারা কেমন আছেন? এই শহরে আপনারা এতোদিন ছিলেন, এখনো আছেন, আমাদের পাশে, তাইজন্য ধন্যবাদ।

: আকাশ, কাল আপনার মন খারাপ ছিলো; আজ ভালো হয়েছে?
: আর, আর এই যে পৃথিবী, মা আমাদের, আর কতোদিন এভাবে  আপনার সন্তানদের প্রতি মুখ ফিরিয়ে থাকবেন?

দুই.

আমার একটা প্রশ্ন ছিলো! করতে পারি? সময় কী পাওয়া যাবে প্রশ্নটা করার? আর উত্তরটা জেনে নেয়ার? এমনি এক সম্ভাবনাময় অনিশ্চয়তার সময় চলছে তো এখন! মানুষ ভুলেই গিয়েছিলো তারা একদা গুহাবাসী ছিলো। এই নগর, এই উন্নয়ন, এই দালানসভ্যতা মানুষের মাথায় ছিলো না। জীবন আর সময়ে প্রয়োজনে যুথবদ্ধ শিকারী মানুষ গুহা থেকে বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিলো। আবার কত কত কাল পরে সেই মানুষ ঠিক গুহায় নয়, ফিরে গেলো ঘরে। দেশে দেশে, নগরে নগরে মানুষ এখন ঘরবন্দি।  এখন এই ঘরবন্দি সময় মানুষ পার করবে কী করে? আর কী আসবে না আতঙ্কহীন এক একটা দিন? ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী-তে আর্টেস্ট হ্যামিংওয়ে বলছেন- ‘মানুষ মৃত্যুর জন্য জন্মায় না’। তাহলে মানুষ কিসের জন্য জন্মায়? মানুষ কি তা জানে? জন্মের পর থেকে এতো অশ্রু, এতো এতো শোক, এতো হাহাকার, এতো যুদ্ধ, এতো হানাহানি, মানুষের এতো এতো লোভ কেনো? তথাগত কেনো রাজ্য ছেড়ে বনচারী হয়েছিলেন, কোন সত্য সন্ধানে?

গীতা বলছে,

‘যা হয়েছে, তা ভালোই হয়েছে,
যা হচ্ছে, তা ভালোই হচ্ছে,
যা হবে, তা-ও ভালোই হবে।
তুমি কাঁদছ কেন— তুমি কি কিছু হারিয়েছ?
তুমি কি সৃষ্টি করেছ— যা নষ্ট হয়ে গেছে?
তুমি যা নিয়েছ, এখান থেকেই নিয়েছ।
যা দিয়েছ, এখানেই দিয়েছ।
তোমার আজ যা আছে, কাল তা অন্য কারো ছিল, পরশু সেটা অন্য কারো হয়ে যাবে, পরিবর্তনই সংসারের নিয়ম।’

তাহলে প্রশ্ন, জগতজুড়ে এখন এই হাহাকার কেনো? কে দেবে উত্তর? কেউ বলছে প্রকৃতি বিরূপ হয়েছে। মানুষ অনেক অত্যাচার করেছে প্রকৃতির ওপর, তার নির্মম প্রতিশোধ নিচ্ছে প্রকৃতি! তাই কি? প্রকৃতিতো মায়ের মতো। আমাদের জন্ম হয়েছে তার কোলে। মা কি এতো নিঠুর, নির্মম হতে পারে? কেউ বলছে আমরা  লোভে, পাপে দিনে দিনে নিজেদের নরক নিজেরাই নির্মাণ করেছি। তাই কি? এই প্রকৃতি কি আর মানুষকে চাইছে না?

তিন.

খবর চালাচালির এসময়ে দুনিয়াটা এখন আঙুলের ডগায়। প্রতিক্ষণ নানা প্রান্ত থেকে মানুষের মৃত্যুর খবর ভেসে আসছে। দুনিয়াজুড়ে লকডাউন। বুকপকেটে মৃত্যু নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষ। থেমে গেছে সব উন্নয়নকাণ্ড। এখন বড় প্রশ্ন মানুষ টিকে থাকবে কি না, তাই। এরমধ্যেও আমার দেশে ‘চালচুরি’র তাণ্ডবকাণ্ড খবর হচ্ছে। ঘুষ চাওয়ার তথ্যও ফাঁস হয়ে যাচ্ছে! সরকারি কর্মকর্তার হাসিমুখ বিয়ের দৃশ্যও ঘুরে বেড়াচ্ছে যোগাযোগ মাধ্যমে। এসবও হচ্ছে। কেবল প্রেমিক মিলতে পারছে না প্রেমিকার সঙ্গে। পৃথিবীতে শান্তি নেই!

সব রকম হিসেব বলছে, নিকট ভবিষ্যতে দিন আরো খারাপ হবে? কতোটা খারাপ? মানুষের ভাতে টান পড়বে?

সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী, সৃষ্টিশীল নির্মাতা চার্লি চ্যাপলিনের বই-‘আমার জীবন’। তাতে তার সময়, তার ছেলেবেলার লন্ডন শহর উঠে এসেছে নিপুণ নির্মমতায়। চ্যাপলিন তার কষ্টসময়ে একটু খানি বর্ণনা করছেন এভাবে-‘ খাবারের দোকানের পাশ দিয়ে যেতে যেতে দেখলাম, মাংসের রোস্ট থেকে ধোঁয়া উঠছে, সোনালি বাদামি রঙের আলু ঝোলের মধ্যে ডুবে আছে। কয়েক ঘণ্টা ধরে কেনাবেচা দেখে কাটালাম। মনটা একটু অন্যমনস্ক হয়ে খিদে আর দুঃখ কিছুটা ভুলিয়ে দিল।’

না, আমাদের শহরে, দেশে এখনো পরিস্থিতি এমন হয়নি। হবে না কখনো সেটাই তো চাইছি আমরা। অনেক অনেক মন খারাপের খবরে মধ্যে আলোকবার্তাও আছে। চীনের যে শহর উহান থেকে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়লো এই মানুষহন্তারক সেই শহর এখন স্বাভাবিক।  এমনি করে গোটা দুনিয়া স্বাভাবিক হবে এটাতো ভাবতেই পারি! এবং থাকতে পারি আরো একটি নতুন সকাল  দেখার অপেক্ষায়।

ছবিঃ গুগল
 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]