ঘরে ফেরা এক উদ্বাস্তু

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নীনা হোসেল

আয়ল্যান্ডে ফিরে এলাম সকালের ফেরীতে। পানামা থেকে ফিরে এসে তিন রাত ভ্যাঙ্কুভারে কাটিয়েছি। পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে খুব ভালো লাগলো। প্রায় তিন সপ্তাহ পর বাড়ী ফিরছি। ঘুমের মায়া কাটিয়ে সাত সকালে ফেরী ধরে আয়্যোন্ডে ফিরে এলাম। মঙ্গলবার, ২১শে জানুয়ারী ২০২০।
লটবহর নিয়ে পারে উঠতে জিব বেরিয়ে গেল প্রায়। গাড়ী স্টার্ট নিলো সঙ্গে সঙ্গেই। মনটা খুশীতে ভরে গেল বরফে ব্যাটারী জমে যাওয়ার কথা। যা বরফ পড়েছিলো বিসিতে এবার তাপ মাত্রা নাকি – ২০ এর নীচে নেমেছিলো।হৃষ্ট চিত্তে ছুটলাম বাড়ীর দিকে। ভাবলাম বাড়ীতে পৌঁছে বাক্স প্যাটরা নামিয়ে রেখে প্রথমে বাজার করতে বেরুবো। লোকজনের সঙ্গে দেখাও হবে। চায়ের জন্য দুধ,ডিম, শাকসব্জি কিনতে হবে। যাওয়ার আগে ফ্রিজ খালি করে ধুয়ে মুছে রেখে গেছি। দশদিন লম্বা সময় খাবার দাবার নষ্ট হয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক।
তারপর মনের মত করে এক কাপ গরম চা বানিয়ে আয়েশ করে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ধীরে সুস্থে আগুন জ্বালিয়ে বাড়ীটা গরম করবো। যদিও বেইজবোর্ড হিটার চালিয়ে রেখে গিয়েছিলাম যাতে বাড়ীটা ড্যাম্প না হয়ে যায়। তাতে বাড়ী খুব ভালো গরম হয় না। বিশেষ করে শোবার ঘর গরম হতে গনগনে আগুনে কমপক্ষে ঘন্টা দুয়েক লাগে। আহা বরফজমা দুপুরে গনগনে আগুনের কথা চিন্তা করতেই এক রকম উষ্ণতা অনুভব করলাম। আহা আমার জন্য কতো না বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে যদি জানতাম।
আজ রাতে নিজের বিছানায় ঘুমাবো দীর্ঘ ২১ দিন পর।ভাবতেই বিছানাটা পিঠে অনুভব করলাম।
হাতের জিনিষপত্র নামিয়ে রেখে নিরাপদ লুকানো যায়গা থেকে চাবি হাতরে নিয়ে চাবি দিয়ে দরজা খুললাম। চারিদিকে থই থই বন্যার জল। পা রাখার মত শুকনো যায়গা নেই। স্তম্ভিত হয়ে নির্বোধের মত জলের দিকে তাকিয়ে রইলাম কতক্ষন বলতে পারবো না। সম্বিত ফিরে আসতেই ফোন উঠালাম। ল্যান্ড লাইন ডেড। এমনই শক যে সেলফোনের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। পার্স থেকে হাতড়িয়ে ফোন পেলাম। প্রথমে ফোনবুক থেকে একে একে আয়ল্যান্ডের লিস্টেড প্লাম্বারদে ফোন করলাম। শোনার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধু ফ্র্যান ছুটে এলো তার বন্ধুকে সঙ্গে করে আমি ততক্ষনে বালতি আর মপার নিয়ে পানি নিঙরাতে শুরু করেছি। প্রচন্ড জলোচ্ছাসের তরঙ্গ আমার ছোট রান্না ঘর থেকে ছুটে আসছে।
শেষ পর্যন্ত হোম হার্ডওয়্যার থেকে রব এলো । তখনও তুমুল ধারয় রান্নাঘরের সিঙ্কের তলা দিয়ে জলের প্রপাত নেমে আসছিলো। রব এসে প্রথমে পাম্টা বন্ধ করে দিলো। তারপর কিছু ভগ্ন অংশ কাউনটারের উপর রাখলো। ইন্সুরেন্স কোম্পানীকে ফোন করলাম। পানি মুছতে মুছতে দিনটা কেটে গেলো। কিন্তু পানি আর শুকায় না। রব ঘোষনা করলো বাড়ীতে থাকা নিরাপদ নয়।
ফ্র্যান সঙ্গে সঙ্গেই বললো তুমি আমার বাড়ীতেই থাকবে। যতদিন দরকার হয়। ওরা সবাই চলে গেলো। আমি পানি কাচাতেই থাকলাম অন্ধকার নেমে আসা পর্যন্ত ।
জানুয়ারীতে সন্ধ্যার অন্ধকার তাড়াতাড়ি নামে। আগুনটা বারবার তাতিয়ে দিচ্ছি ঘর তাড়াতাড়ি শুকোবার জন্য। বৃষ্টিতে দ্বীপগুলি ভিজছে রাতদিন। ঘর বন্ধ করে বেরুলাম। ফ্র্যানের বাড়ী সাত আট মিনিটের ড্রাইভ। ওর বয়ফ্রেন্ড ডিনার বানালো। মেকসিকান ডিস চিকেন কেসেদিয়া। সঙ্গে দিল সালসা, (টমেটোর চাটনির মত ), গুয়াকোমলি (আভাকাডো, রশুন আর লেবুর রস দিয়ে তৈরী) ও সাওযার ক্রীম।সঙ্গে সাদা ওয়াইন। খাওয়ার তেমন রুচি ছিল না।গোসল করে ঘুমাতে গেলাম আটটার মধ্যেই।
২২শে জানুয়ারী, আমার ইন্স্যুরেন্স ক্লেইমের জন্য একজন এডজাসটর নিয়োগ করা হয়েছে। সে বললো ওদের নির্ধারিত ইন্সপেক্টর তথা রিস্টোরেশনের লোক এসে দেখার পর সে জানাবে তার সিদ্ধান্ত।সে লোক আসতে আসতে দুদিন পেরিয়ে গেলো। আমি ফ্র্যানের গেস্টরুমে ক্রমশ অভ্যস্ত হচ্ছি।
শেষ পর্যন্ত রিস্টোরেশন ইনস্পেকশন হলো শুক্রবার ২৪শে জানুয়ারী। এদিকে আমার এডযাসটার গেছেন ছুটিতে। আমি মুভ করলাম প্রতিবেশী আনিতা আর মার্কের বাড়ীতে। ওরা আমাকে সাগর আমন্ত্রণ জানাল ওদের বাড়ীতে থাকার জন্য। ওরা দুজনেই স্কুল বোর্ডে কাজ করে ভযাঙ্কুভারে। গরমের ছুটিটা কাটায় এখানে ওদের কিশোরী কন্যাটিকো নিয়ে। ওদের খালি বাড়ীতে গত চার রাত ধরে আছি। ওদেরকে ছাড়া বাড়ীটা বড্ড খালি খালি লাগছে।
খালি বাড়ীটা আমাকে আতিথ্য দিয়ে যাচ্ছে ।আনিতা খোঁজ নিচ্ছে সব সময়।
আমার কার্টুনিস্ট বন্ধু গেইলো আমাকে ডাকছে ওর ওখানে গিয়ে থাকার জন্য। এই বিপদের দিনে একটি মহার্ঘ অভিজ্ঞতা হলো কত মানুষ আমার জন্য কেয়ার করে কত মানুষ আমার প্রকৃত বন্ধু। আমার পরম সৌভাগ্য আমার এমন সহৃদয় বন্ধু আছে। সারা পৃথিবীটাই যেন দু হাত বাড়িয়ে নিয়েছে আমাকে । ৮ই জানুয়ারী থেকে আমি নিজের বাড়ীতে নিজের বিছানায় ঘুমাই নি।
আমি রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করছি বন্যা
দুর্গত উদ্বাস্ত আমার জীবন। সৌভাগ্য আমার ফ্র্যান ও আনিতার মত বন্ধু আছে।
বাড়ীতে কাজ শুরু হয়েছে। মেঝে শুকাতে বেশ কদিন লেগে যাবে। যে কয়দিন লাগে তারপর নতুন ফ্লোর ইনস্টল করা হবে। ইলেক্ট্রিশিয়ান, প্লামবার আর রিস্টোরেশন গাই পাশাপাশি কাজ করছে।তারপর একটু ফ্রেশ কোট অফ পেইন্ট তারপর ঘরে ফেরা। আরো সপ্তাহ তিনেক এই শরনার্থী জীবন আমার জন্য নির্ধারিত।
আশ্চর্য রকমের ভালো আছি আমি এই স্বজনহীন ভুখন্ডে। বন্ধু পরিবেষ্টিত প্রকৃতির বুকের ভিতর। প্রকৃতির ভালবাসা ও রোষ দুটোই গ্রহন করি গভীর ভালোবাসা নিয়ে।
আমাকে নিয়ে কারু দুশ্চিন্তা করার কারন নেই। দুর্যোগ জীবনে বার বার আসে এবং আসবে তাই নিয়েই মানব জীবন।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]