ঘূনেধরা সমাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিলেন নিশাত

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কাজল রিপন

আমাদের মঞ্চজগতে ইশরাত নিশাত এমন একজন ছিলেন যার অভাব পূরণ হওয়ার নয়। সদ্যপ্রয়াত এই অভিনেত্রী খুব অল্প বয়সেই অভিনয়ের জগতে আসেন এবং দর্শকমনে আসনও করে নেন। বিটিভি নাটকে তার অভিষেক ঘটে ১৯৮৪ সালে, মামুনুর রশিদ রচিত ও মুস্তাফিজুর রহমান পরিচালিত “সাম্প্রতিক” নাটকের মাধ্যমে।

বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত সেই নাটক দর্শকদের মাঝে বেশ আলোচিত হয়েছে। একটা গরীবঘরের মেয়ের বিয়ে ঠিকঠাক হয়। বাবা অনেক কষ্ট করে সাধ্যমতো যৌতুক দিয়ে মেয়েকে পাত্রের হাতে তুলে দেন। যৌতুক নিয়ে বিয়েবাড়ীতে অনেক কথাকাটাকাটি হয়। মেয়ের বাবাকে অনেক কটুকথা শুনতে হয়। অবশেষে পালকিতে করে মেয়েকে নিয়ে আসা হয় শশুরবাড়ি। সঙ্গে আসে তার ছোট ভাই। পালকি নামিয়ে সাইকেল ঘড়ি রেডিও নগদ টাকা কড়ি কি কি দেয়া হলো সেসব নিয়ে ছেলেরবাড়িতে আরেক দফা গালাগালি অপমান করা হয় মেয়ের ছোটভাইটিকে। বাড়ির নিয়মানুযায়ী কনের বাড়ি থেকে দেয়া যৌতুক পছন্দ না হলে কনেকে পালকি থেকে নামানো যায় না। বিয়েবাড়ির উঠোনের এক কোনায় একখানা জলচৌকির উপর মাথা নিচু করে বসে বসে সব অপমান সহ্য করে ছোট ভাই। যে-ই বেড়াতে আসে ছেলেটার সঙ্গে দুর্ব্যবহার ঠাট্টা তামাশা করে। যেন গরিব পাত্রীর ভাই হওয়া মহাঅপরাধ!!!

বেলা গড়িয়ে যায়। অবশেষে পালকি থেকে নামানো হয় সেই নববিবাহিতা পল্লীবধুকে। কিন্তু হায় !!! ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। পালকির ভেতরে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায় মেয়েটি। সেকি করুণ মর্মান্তিক মৃত্যু !!! তখন লোভী মিথ্যাবাদী শশুর বাড়ির লোকজন নানা দোষ দিতে থাকে মেয়েপক্ষকে। কেউ বলে – একটা অসুস্থ মেয়েকে গছিয়ে দিয়েছিলো। কেউ বলে – ভাগ্যবানের বউ মরে অভাগার মরে গরু। মেয়ের ভাইকে গালমন্দ করতে থাকে সবাই। কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা সইতে না পেরে মেয়ের ভাই বসে থাকা জলচৌকি হাতে নিয়ে মারমুখী হয়ে চিৎকার করে বলে উঠে – কুত্তার বাচ্চা……..!!!!!!

এখানেই একটা করুণ হৃদয় বিদারক গল্পের পরিসমাপ্তি ঘটে। আর উত্থান ঘটে একজন সম্ভাবনাময় অভিনত্রীর। সেই পালকিবন্দী হয়ে দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে শশুরবাড়ি যাওয়া মেয়েটার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ইশরাত কালাম নিশাত। তার অসহায় ছোটো ভাই আজিজুল হাকিম, মেয়ের শশুর সৈয়দ আহসান আলী সিডনি, শশুরবাড়ির বাকি মুরুব্বীরা ছিলেন আবুল খায়ের, জি এম আনসারী প্রমুখ।

প্রথম নাটকেই নিশাত দর্শকমনে সফট কর্নার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ডাগর টানা দুটো চোখ, হাঁটু-লম্বা চুল আর মায়াবী মুখের মেয়েটিকে দর্শক ভালোবেসে ফেলে। এর আগে বিভিন্ন টিভিম্যাগাজিনে নাট্যাংশে অংশ নেন নিশাত। “সাম্প্রতিক” নাটকের পরে মামুনুর রশিদ রচিত ও শেখ রিয়াজউদ্দিন বাদশা প্রযোজিত “আকাশছোঁয়া” নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রসহ বেশ কিছু নাটকে উল্লেখযোগ্য চরিত্রে চমৎকার অভিনয় করেন তিনি।

কন্যা রাশির জাতিকা নিশাতের জন্ম একটা সাংস্কৃতিক পরিবারে। মা খ্যাতিমান অভিনেত্রী নাজমা আনোয়ার ও খালা আজমেরী জামান রেশমা। অভিনয় প্রতিভা তার রক্তের সঙ্গে মেশানো। মায়ের অনুপ্রেরণায় যোগ দেন প্রথমসারির মঞ্চনাটকের গ্রুপ “আরণ্যকে”। সেখানে “ইবলিশ” নাটকের রুকু চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন নাট্যাঙ্গনে। তারপর গিনিপিগ, ক্ষুদিরামের দেশে, ইত্যাদি নাটকেও প্রাণবন্ত অভিনয় করেন। তারপর যোগ দেন “দেশনাটক” গ্রুপে। তার নির্দেশনায় দেশ নাটকের “অরক্ষিতা” মঞ্চায়ন বেশ প্রশংসিত হয়।

নিশাত ছিলেন প্রাণবন্ত তারুণ্যে উদ্ভাসিত একজন সাহসী নাট্যযোদ্ধা। মঞ্চে একাধারে অভিনেত্রী, নির্দেশক ও আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে খ্যাতি ছিলো তার। পাশাপাশি আলোকসজ্জা, সেট ডিজাইন ও সমন্বয়, তাকে সংস্কৃতি অঙ্গনে অনন্যসাধারন করে তোলে। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তার আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠ সর্বদা সোচ্চার ছিলো। ঢাকার মঞ্চ ও নাট্যাঙ্গনে “বিদ্রোহী কন্ঠ” নামে সুপরিচিত ছিলেন নিশাত। তার কাজগুলো সৃজনশীলতা ও বিচক্ষণতার পরিচায়ক। ঘূনেধরা সমাজের বিরুদ্ধে নিশাত ছিলেন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তিনি ব্যাক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। আত্ম সচেতন থাকার চেষ্টা করতেন সর্বদা। আড্ডা দিতেন, প্রাণখুলে হাসতেন, বন্ধুমহলে মধ্যমণি ছিলেন। ভয় পেতেন নিঃসঙ্গতা। সেই মেয়েটি সবাইকে ছেড়ে নিঃসঙ্গ জীবনের পথে পাড়ি জমিয়েছেন ১৯ জানুয়ারী ২০২০। তার আত্মার মাগফেরাত ও শান্তি কামনা করি।

ছবি:গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]