ঘোড়া, ঘাস ফুল আর ফ্ল্যামিঙ্গো

ইরাজ আহমেদ

শীতের কুয়াশা মোড়া সকাল। আলো ফোটেনি তখনও। আকাশটা কেমন অদ্ভূত ছাইবর্ণ । স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক বছর আগের কথা। এই ঢাকা শহরের রমনা আর এখনকার সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা কালো পিচ মোড়ানো পথ তখনও নির্জন আর শিশিরে ভেজা। স্কুলের ছাত্র আমি। ঢাকার পরিচ্ছন্ন এক পাড়া নয়াপল্টন থেকে রিকশায় চেপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই ইউনির্ভাসিটি স্কুলে যাই ভোর সকালে। রিকশা ভাড়া পচাত্তর পয়সা।
তখন ঢাকা শহরের পথে এরকম দাঁতে দাঁত চাপা ভীড় লেগে থাকতো-না।বাতাসে ভাসতো না যানবাহনের হর্নের আর্তচীৎকার। একটা রিকশায় চেপে আমার স্কুল-যাত্রার মাঝে পড়তো সবুজে মাখামখি এই পথটা। সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের নাম ছিল রেসকোর্স, ঢাকা শহরের একমাত্র ঘোড়দৌড়ের মাঠ।স্মৃতি প্রতারণা না করলে শনিবার ওই মাঠে ঘোড়া ছুটতো টাকার বাজি ফেলে। শীতকালের কথা বলছি এজন্য যে সেই শীতের ভোরের দৃশ্যটিকে আমার দৃষ্টিসম্মুখে আজো ভিন্ন এক ব্যাঞ্জনায় উপস্থাপন করে।
রিকশাটা এখনকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট অতিক্রম করে কিছুটা এগুলেই চোখে পড়তো কুয়াশার চাদরে মোড়া রেকোর্স মাঠের সীমানায় কাটাতারের বেড়া। আর সেই বেড়ার ধার ঘেঁষে ফুটে থাকা অসংখ্য ঘাসফুল।আমি অপেক্ষা করে থাকতাম কখন সেই দৃশ্যটি দেখতে পাবো।আর ঠিক তখনই আমাকে চমকে দিয়ে কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে ছুটে বের হয়ে আসতো ঘোড়া।, রেসের ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠের ওপর একটু ঝুঁকে বসে আছে জকি। ঘোড়াটা এক ঝলক দেখা দিয়ে আবার অদৃশ্য হতেই কুয়াশা ছিঁড়ে বের হয়ে আসতো আরেকটি ঘোড়া। তারপর আরেকটি, তারপর আরেকটি। ভোরবেলা রেসের ঘোড়াগুলোকে দৌড় করানোর জন্য জকিরা বের করতো। পুরো মাঠটা এভাবে ছুটতো অনেক ঘোড়া। লিখতে বসে মনে পড়ছে, আমি রিকশায় বসে ঘোড়া গুনতাম। ছুটে ফেরা সেইসব ঘোড়াকে আমার মনে হতো অলৌকিক কোন এক পৃথিবীর প্রাণী। খুব বেশী শীতের দিনে ঘোড়াগুলোর নাক দিয়ে সাদা বাষ্প বের হতো। আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে রিকশায় বসে দেখে নিতাম ঘোড়াদের ছুট।
শাহবাগ মোড় থেকে যে রাস্তাটা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে গেছে তখন সেটার ফুটপাত লাগোয়া ছিল এই ঘোড়াগুলোর আস্তাবল।যতদূর মনে পড়ে, রাস্তার দিকে আস্তাবলের একটা দরজা ছিল।কোনদিন স্কুলে আসতে দেরি হলে ঘোড়াগুলোকে আর দেখতে পেতাম না। সেদিন খুব মন খারাপ হতো। আমার স্কুলে যাবার পথ ছিল এটাই। মোড় ঘুরেই দেখতাম জকিরা তাদের ঘোড়ার পরিচর্যা করার জন্য বসে গেছে ফুটপাতে। কেউ ঘোড়ার শরীর ঘসছে, কেউ পানি ঢেলে গোসল করাচ্ছে।বিচালি আর ঘোড়ার শরীরের গন্ধ ভেসে থাকতো রাস্তাটায়।কখনো দেখতে পেতাম ঘোড়ার খুরে নাল পরানো হচ্ছে। কালো, লাল, সাদা, খয়েরি রঙের ঘোড়াগুলোর নড়ে ওঠা শরীরের পেশী, পা ঠোকা আর নাক দিয়ে করা বিচিত্র আওয়াজ আজো আমার কানে লেগে রয়েছে। তখন খুব ইচ্ছে হতো ঘোড়ার জকি হবো একদিন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পর ঘোড়ার রেস নিষিদ্ধ হয়ে গেলো। আস্তে আস্তে সেইসব ঘোড়া আর জকিরা মুছে গেলো আমার দৃষ্টির সামনে থেকে।মুছে গেলো ঘাসফুল আর ঘোড়াদের সেই অলৌকিক দৃশ্য।
এরকমই আরেকটি দৃশ্যপট মুছে গেছে আমার চোখের সামনে থেকে। সেটি হচ্ছে ‘ফ্ল্যামিঙ্গ’ রেস্তোরাঁ। এখনকার শহরের বিজয়নগর নামে এলাকায় বড় রাস্তার ধারে ছিল ফ্ল্যামিঙ্গো। নীল পর্দা ঢাকা ছোট্ট্ রেস্তোরাঁ। অবশ্য এমন আরও অনেক কিছুই এ শহর থেকে মুছে গেছে।সত্তর দশকের শেষ ভাগেও রেস্তোরাঁটি অদৃশ্য হয় নি ওই জায়গা থেকে।
ফ্ল্যামিঙ্গোর খাবারের মধ্যে খ্যাতিমান হয়ে উঠেছিল ফুচকা। এমন কোন অসামান্য ঝকমকে রেস্তোরাঁ ছিলো না ফ্ল্যামিঙ্গো।পাশেই একটু নিচুতে জলা মতো জায়গা। তারপাশে সেগুন বাগানের(এখনকার সেগুন বাগিচা) পুরনো বইয়ের কয়েকটা খ্যাতিমান দোকান। ফ্ল্যামিঙ্গোর দরজা ঠেলে ঢুকলে লম্বা আকৃতির অনেকটা জায়গা। দুই সারিতে পাতা টেবিল চেয়ার। মনে আছে, বড় কাচের জানালার পাশে বসতে পারলে রাস্তা দেখা যেত।দেখা যেত ভেসে যাওয়া রিকশা, দ্রুত কয়েকটা গাড়ি। তখন এ ধরণের রেস্তোরাঁয় সবসময় যাওয়ার মতো অর্থ পকেটে থাকতো না। ঈদের সময় কিছু অর্থের আগমন ঘটলে সিদ্ধেশ্বরী থেকে কখনো রিকশায়, কখনো হেঁটেই বন্ধুরা চলে যেতাম সেখানে ফুচকা খেতে। তখন অবশ্য ফুচকার আকৃতি এরকম ছিল না। বেশ গোল আর বড় ফুচকার ভেতরে তেতুল-পানি দিয়ে খেতে হতো। ফ্ল্যামিঙ্গোতে তখন ফুচকার সঙ্গে কিছু স্ন্যাকস জাতীয় খাবার মিলতো। লোকে এখন এসব খাবারকে ফাস্ট ফুড বলে।
ফ্ল্যামিঙ্গোকে ঠিক কবে হারিয়ে ফেলেছি এখন আর মনে পড়ে না। ভুলে গেছি সেই আশ্চর্য ঘোড়াদের কথা। তবুও ঘোড়াদের পা ঠোকার শব্দ, দ্রুতবেগে ছুটে চলা দৃশ্য আর ফ্ল্যামিঙ্গোর ভেতরের সেই ঘ্রাণ আজও ভেসে থাকে মনের হাওয়ায়, স্মৃতির পর্দায়।

ছবিঃ গুগল   

পড়ুন
সাকুরা, বলছি তোমাকে…
ম্যারিয়েটা ম্যারিয়েটা
আমরা সবাই আজও এক পাড়াতেই থাকি…