চটি বইয়ে গোপনে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

একটা সময় ছিলো যখন স্কুলের লাস্টবেঞ্চ জানতো সেই নিষিদ্ধ গল্পের গোপন উপস্থিতির কথা। জানতো স্কুলব্যাগে দুরুদুরু বক্ষ পাঠ্যবই, জানতো বিছানার তোষকের তলার গোপন আস্তানাও।নীলক্ষেতে পুরনো বইয়ের দোকানঘরের কোথাও কোথাও লেগে থাকতো কি  খবরের কাগজ দিয়ে মোড়ানো গোপন হাত বদলের দাগ? শিউলী বাড়ি, হিমালয় আর কত কী নামে পরিচিত কোন গুপ্ত প্রেসে ছাপা হওয়া লাল নিউজপ্রিন্টে ১৬ পৃষ্ঠার বই স্টেপলারের পিন গাঁথা হয়ে চলে যেত পাঠকের কাছে। সেগুলো চটি বই। কেউ কেউ আদর করে ডাকেন চটি সাহিত্য। আদিরসাত্নক কেচ্ছা আর অদ্ভুত সব সম্পর্কের রসায়ন সেখানে পাতায় পাতায় রগরগে গল্প হয়ে স্থান পেতো।বহু বছর বাঙালি সমাজে বিশেষ ভাবে পুরুষদের অবদমিত কামনা আর যৌন চিন্তার বিশদ বিবরণ বলা যেতে পারে এই চটি বইকে।  চটি বই মানেই কী আদিরসাত্নক কাহিনি? নিম্নবর্গীয় গন্ধ আদিরসে ভিয়েন বসানো  এসব কাহিনির এই গোপন প্রসার ‘চটি বই’ নামে চিহ্নিত হলো সমাজে? আসলে চটি বই মানে তো ছোট বই। একটা সময়ে মাত্র ১৬ টি পৃষ্ঠা অবলম্বনকরে মুদ্রিত হতো এই বই। সাধারণত কোনো চালু কাহিনি, ঘটে-যাওয়া ঘটনা, অলৌকিক বিবৃতি কিংবা কোনো স্ক্যান্ডালকে কেন্দ্র করে এ ধরণের প্রকাশনার প্রসার ঘটতে শুরু করে।  

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো সেই চটি আর আদিরসাত্নক গল্পের যুগ নিয়ে ‘চটি বইয়ে গোপনে’। 

চটি বইয়ের পেছনের গল্পটা বেশ দীর্ঘ। চটি বইয়ের রমরমা সময় শুরু হয় উনবিংশ শতকে। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লবের পর বাংলা ভাষায় প্রকাশিত চটি বইয়ের সংখ্যা ছিলো ৩২২। রেভারেন্ড জেমস লঙ-এর হিসাব অনুযায়ী ওই সময়ে তৎকালীন কলকাতা শহরে এ ধরণের বই ছাপা হয়েছিলো ছয় লক্ষের বেশি। তখনকার ঢাকা এবং রাজশাহী শহরও এ ধরণের বইয়ের প্রকাশনার দিক থেকে পিছিয়ে ছিলো না। প্রাচীন আমলের সেই চটি বইতে কী ছাপা হতো? শিক্ষামূলক গল্প, পূরাণের কথা, আদিরস আর স্যাটায়ারে পূর্ণ থাকতো তখনকার চটির ১৬ পৃষ্ঠা। তখন ভারতচন্দ্র অথবা বঙ্কিমচন্দ্রের বইকে বাজারে রীতিমত লড়াই করতে হয়েছে এ ধরণের চটির সঙ্গে। গবেষক ও ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের বই থেকে জানা যায়, উনবিংশ শতাব্দীতে ঢাকা শহরে চার, আট অথবা ষোল পৃষ্ঠা ডবল ডিমাই সাইজে একেবারে নিম্নমানের কিছু প্রেসে এই চটি বই ছাপা হতো। সিপাহী বিপ্লবের সময়ও এই বই ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রচারের অন্যতম হাতিয়ার ছিলো। কিন্তু তারপরেও চটি বইয়ের নামেই ছলকে ওঠে যৌনতায় মাখামাখি উত্তেজক গল্প।

ঢাকা শহরে চটি বই পর্ণোগ্রাফীক বিবরণ সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে থাকে সম্ভবত ষাটের দশকে। তখনও ‘ব্লু-ফিল্ম’ অথবা নীল ছবি‘র প্রতাপ শুরু হয়নি। ইন্টারনেটের তো কোনো প্রশ্নই নেই। পাশের দেশ ভারতের কলকাতা শহরে চল্লিশের দশকেই নীল ছবি তৈরি হয়েছে বলে পত্রপত্রিকা সাক্ষ্য দেয়। তৎকালীন ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকায় কয়েকটি নির্দিষ্ট বাড়ির পর্দাটানা ঘরের সাদা দেয়ালে প্রজেক্টার থেকে প্রক্ষিপ্ত আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠতো মানব-মানবীর নানান যৌন-কসরৎ।সেই প্রদর্শনীগুলোর গোপনীয়তা ছিলো মারাত্নক মাত্রায়। ব্যাস, ওইটুকুই। তারপর মুখে মুখে নীল ছবি দেখার অভিজ্ঞতার বিবরণ ভেসে বেড়াতো হাওয়ায়। ওই সময়েই ঢাকায় চটি বই শুধু যৌনতাকে পুঁজি করে প্রকাশিত এবং বিক্রি হতে শুরু করে। স্বল্পমূল্য আর ছাপার ক্ষেত্রে সেই লালচে, শস্তা নিউজপ্রিন্ট ছিলো চটির বালিজ্যিক ও শারীরিক অবয়ব। সকল বর্গের মানুষ বিশেষ করে ছাত্র-যুবাদের হাতে হাতে ঘুরতে শুরু করে সেই চটি বই। ষাট ও সত্তরের দশকের গোড়ায় এই চটি বইয়ে কামগন্ধী গল্প ছদ্মনামে লিখতে শুরু করেন কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক। তাদের হয়তো লক্ষ্যই ছিলো চটি বইয়ের আকাশপাতাল, উদ্ভট যৌনতা নির্ভর গল্পের অবয়বকে পাল্টে দেয়া। হয়তো কারো কারো মধ্যে এক ধরণের অ্যাডভেঞ্চারের নেশাও ছিলো। কোলাহল, গরম বালিশ নামে কিছু চটি বইতে তাদের লেখা ছাপা হওয়ার কথা শোনা যায়। তারপর এই ধারাটিও ক্ষীণ হয়ে আসে ধীরে ধীরে। কিন্তু চটি বইয়ের জনপ্রিয়তা তথনও মোটা দাগেই রয়ে যায়। নিম্নবর্গের কাছে চটি বই হয়ে উঠতে থাকে যৌন বিনোদনের মাধ্যম।

প্রাক–খ্রিস্টীয় যুগ থেকে পনেরো-ষোলো শতক পর্যন্ত লেখা হয়েছে বেশ কিছু ভারতীয় টেক্সট, ‘কাম’ই যার প্রধান বিষয়বস্তু। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, দ্বাদশ শতকে লেখা কোক্ককের ‘রতিরহস্য’, যা সাধারণভাবে ‘কোকশাস্ত্র’ নামে প্রচলিত। এই বইটি অনুসরণ করে ষোলো শতকে কল্যাণমল্ল লেখেন, ‘অনঙ্গরঙ্গ’। কোনও কোনও আলোচক জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’–য় রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলায় কোকশাস্ত্রের প্রভাব আবিষ্কার করেছেন। সতেরো শতকে লেখা দৌলত কাজীর ‘লোরচন্দ্রাণী’ (১৬৫৯) কাব্যেও রয়েছে নারী–পুরুষের রতিমিলনের উন্মুক্ত বর্ণনা। সহজযানী বৌদ্ধ ধর্মেও সিদ্ধাচার্যরা দেহকেই সাধনার মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

চটি বইকে আসলে বলা যায় বাঙালি পুরুষ সমাজের যৌন চিন্তার ব্র্যান্ডিং। নানা ধরণের ফ্যান্টাসী, সমাজের উচ্চবিত্ত অংশের প্রতি বিদ্বেষ আর দরিদ্র মানুষের যৌনতা থেকে বিনোদন সংগ্রহের তাড়না থেকেই চটি বইয়ের প্রসার।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরে ‘দূতীবিলাস’ জাতীয় দেশীয় প্রেস থেকে ছাপা অসংখ্য বই ক্রমেই ‘অশ্লীল’ হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করে।বাংলা ভাষায় লেখা এই চটি বইয়ের জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় কারণ ছিলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভাষা ব্যবহার। এই ভাষায় পতিতা পল্লীতে পতিতাদের যৌনাচার বিষয়ে ব্যবহৃত খোলামেলা ভাষা, বিভিন্ন ধরণের টার্ম চটি বইয়ের অশ্লীলতার মাত্রাকে যেমন বাড়িয়ে দিয়েছিলো তেমনি পাঠকের মনে এনে দিয়েছিলো পরোক্ষ যৌন সম্ভগের অনুভূতি। এ ধরণের বই উনিশ শতকে বাঙালির অন্দরমহলে রমণীদের কাছে যে চাহিদা তৈরি করেছিলো পরবর্তী সময়েও সে চাহিদার ধারাবাহিকতা দেখা যায়। উনিশ শতকে বাংলায় প্রথম যে-সেক্স ম্যানুয়ালটি লেখা হয়, সেটি ছিলো অন্নদাচরণ খাস্তগীর নামে এক ভদ্রলোকের লেখা। ম্যানুয়ালটি প্রকাশিত হয় ১৮৭৮ সালে।

যথারীতি নারীরাই ছিলো এই চটি বইয়ের অশ্লীল গল্পের প্রধান শিকার। এক সময়ে সমাজে দুঃখী এবং অসহায় নারীদের অবস্থার সুযোগ নিয়ে ব্যবহার করা হতো। এ ধরণের গল্প চটি গল্পে উঠে আসতো। পরে অবশ্য তরলা সুন্দরীদের গল্পগুলো ছিলো শুধুই যৌনাচারে পরিপূর্ণ। চটি বইয়ে বৌদি এবং ভাবী এই দু’টি চরিত্র ব্যাপক জনপ্রিয়তাও লাভ করে পাঠকদের কাছে।

চটি বইয়ের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে ভিসিআর আর ট্রিপল এক্স ছবির আগ্রাসনে।যে বিষয়টি ছিলো গোপন তা ভিডিও আর ঢাকার বেগম বাজারের রমরমা ভিডিও ব্যবসায় প্রকা্শ্যে হাজির হলো। চটি বইয়ের অশ্লীলতা চাপা পড়লো নতুন এক অধ্যায়ের নিচে। সেখানে দুরু দুরু বক্ষের ওঠাপড়ার আর কোনো অস্তিত্বই রইলো না।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ বাঙালির যৌনচর্চা: বটতলা থেকে হলুদ বই-অর্ণব সাহা, বিদ্যাকূট
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box