চলো, পথটা আবার হেঁটে আসি…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড.সেলিম জাহান

জানি, মাঝে মাঝেই তুমি ভাব, ‘যে পথটা পেরিয়ে এসেছি- কখনো একা, কখনো সবাইকে নিয়ে- ঘুরে দাঁড়িয়ে সে পথটা আবার হেঁটে আসি।’। এটাও জানি, তুমি এমনটি করতে চাও – অন্য কোন কারনে নয়, শুধু এ জন্যে যে সেই পেরিয়ে আসা পথের সবকিছু ভালো করে দেখা হয়নি, বড় দ্রুত হেঁটে এসেছো

ঠিক আছে, ফেলে আসা পথটাতে আবার হাঁটা যাক আক্ষরিক অর্থেই। চলো বরিশালের পথেই হাঁটি। কোথা থেকে শুরু করবে? বরিশাল জিলা স্কুলের সামনে থেকেই শুরু করি, রাজী?

জেলা স্কুল

বাম দিকে যে পেট্রোল পাম্পটি দেখছো, সেটা রফিকদেরই ছিলো। তোমরা ওকে ‘বার্মা শেল রফিক’ বলে ক্ষ্যাপাতে। খুব কচি বয়সে রফিক চলে গিয়েছিলো। ওর মুখটা মনে আছে তোমার? ডানদিকে? হ্যাঁ, এটা বরিশাল সার্কিট হাউসই বটে। সুন্দর না?

আরেকটু এগোও। বাঁদিকের ঐ বেকারীতেই জলখাবারের পয়সা জমিয়ে তুমি জীবনের প্রথম পেস্ট্রি খেয়েছিলে। তার সোয়াদ এখনও মুখে লেগে আছে? ভালো কথা। সামনেই খ্রীস্টানদের কবরখানা – বহু পুরোনো। অনেক দুপুরে ওখানে দাঁডিয়ে তুমি চেয়ে চেয়ে দেখতে। কি দেখতে বলো তো?

বাঁ দিকেই তাকিয়ে আছো তো? ঐ পেল্লাই বাড়ীটিতো তুমি চেনো। ফয়সালদের বাড়ী। পিতামহ তার জমিদার ছিলেন। ঐ বাড়ীতেই তুমি প্রথম কোন জন্মদিনের উৎসবে গিয়েছো। কি বললে? পড়াশোনায় তোমার দশ বছরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো? সে কি আর আমি জানি নে। হ্যাঁ, সামনেই জগদীশ হল – প্রচুর ছবি দেখেছো ওখানে – তবে সোনালী সিনেমা হলের কাছে কিছু না।

এই তো দু’রাস্তার মোড়ে এসে গেলে। কোনদিকে যাবে? আচ্ছা সদর রোড বাদ দাও আজ। বগুড়া রোডের দিকেই ঘোর। পা’ চালাও। দেখছো না আকাশে মেঘ করে আসছে? কি বলছো, বগুড়া রোডে অনেক মোড়? বাহ, রাস্তায় মোড় থাকবে না? কি, আশ্চর্য্য কথা-বার্তা!

ডানেই সদর গার্লস স্কুল। জানি, তোমার বোন পড়েছে ওখানে। বেনুও পড়েছিল ছোট বেলায়? দেখো তো ভুলেই গিয়েছিলাম। না, আজ মল্লিক রোডে ঢুকতে হবে না। মনে আছে, ওখানে তোমার বন্ধু জামানদের বাড়ী পুলিশ ক্লাবের পেছনে।

সামনে এগোও। ডানে শ্রী চৈতন্য স্কুল, বাঁয়ে তোমার সতীর্থ মুস্তাফিজদের বাসা। ঐ তো ইক্ষুদের বাড়ী দেখা যাচ্ছে, তার পাশেই পুকুরের ওপারে তোমাদের নাজিমুদ্দিন স্যার থাকতেন – তোমাকে স্নেহ করতেন খুব। উল্টো দিকের লাল রংয়ের উঁচু বাড়ীটাই অক্সফোর্ড মিশন। ওর পাশ দিয়ে যে ছোট পথটি চলে গেছে সেখানকার ডগলাস বোর্ডিং এ তোমার জন্ম। কই বলোনি তো কোনদিন? কিংবা বলেছো, ভুলে গেছি।

সদর রোড

মোড় ঘুরতে থাক – একটা, দুটো। বাঁ দিকের পথ দিয়ে এগোলেই ‘ধানসিঁড়ি’ – কবি জীবনানন্দ দাশের বাড়ী। সামনের বাঁকেই তো লতায়-পাতায়, গাছ-গাছালিতে ঘেরা ‘কুঞ্জে আয়েশ’ – তোমার প্রিয় শিক্ষক খান মুস্তফীজুর রহমান সাহেবের বাড়ী।

বাঁ দিকেই লালু ডাক্তারের বাড়ী। তার পরেই কলেজ রো – তোমার বন্ধু নূরুলদের বাড়ী। আজ না গেলেই কি নয় ও রাস্তায়? ও কি, শীতলাখোলার দিকে তাকাচ্ছো না কেন? এখনও ভয় পাও বুঝি মা কালীকে দেখে? অবাক করলে।

দাঁড়িয়ে গেলে কেনো? এটাই ‘অধ্যক্ষ ভবন’। বেনু একদিন ছিলো এ বাড়ীতে। তুমি অবশ্য তখন তাকে চিনতে না, দেখোওনি তাকে – যদিও রীনু’পাকে ও টিঙ্কুকে দেখেছিলে। নাম জানতে বেনুর? বেশ, বিশ্বাস করছি তোমার কথা। এ দিক, ও দিক তাকাচ্ছো কেনো? কি দেখছো ফটকের স্তম্ভের দিকে তাকিয়ে? কোন একটি ছোট মেয়ে সেখানে উঠে বসে আছে কিনা? ও তুমি দেখতে পাবে না। তুমি তো শুধু ওটার গল্প শুনেছো।

কি, আর হাঁটবে না? রিক্সা নেবে? ক্লান্ত লাগছে, মন ভালো লাগছে না? ঠিক আছে, চলো রিক্সা নেই, তাড়াতাড়ি যাওয়া যাবে। বর্ষা ও নামবে হয়তো। উঠে পড়ো রিক্সায়। চোখ বন্ধ করে থাকো একটু – ভালো লাগবে।

নতুন বাজারের গন্ধ পাচ্ছো? পেতেই হবে। ওখানেই তো বাজার করতে শিখেছিলে। বাঁ দিকে রামকৃষ্ণ মিশন দেখতে পাচ্ছো? ওই তো ডানদিকে শঙ্কর মঠ, তোমার জীবনের প্রথম স্কুল। এই তো বি.এম. কলেজ এলাকায় চলে এলাম। কে. পি. হলের দিকে তাকিয়ে কি ভাবছো? ওখানেই তো কলেজের প্রথম ক্লাশ করেছো- রসায়নের, অধ্যাপক মোসলেম মিয়ার, তোমার পিতৃবন্ধু ও সহকর্মী, যিনি তোমার জন্ম সংবাদ তোমার বাবাকে দিয়েছিলেন।

বি এম কলেজ

কি দেখছো? ঐ টেনিস মাঠেই বেনুর বাবা টেনিস খেলতেন। মনে আছে, ঐ বড় বড় গাছ দুটো অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মার লাগানো? তুমি তাঁর পায়ে পায়ে ঘুরঘুর করতে রোদের মাঝে। ডানদিকেই জিন্নাহ হল – তোমাদের এক সময়কার বাড়ী। একটু পেরুতেই তোমার বন্ধু বিভার বাড়ী। বিভা মিশ্র – ডা: এস. সি. রায়ের ভাগ্নি । কি সুন্দর গানের গলা ছিলো বিভার। কোথায় আছে বিভা এখন? সে তো তোমার জানার কথা, আমার নয়।

এই তো তোমার, তোমার ভাই-বোনদের, তোমার বাবার কলেজ পেরিয়ে এলাম। হ্যাঁ, এটা বৈদ্য পাড়াই বটে। ডানদিকের সাদা বাড়ীটিতে খুব ছোটবেলায় তুমি ছিলে। পাশের মাঠে কত খেলেছো, মনে আছে? পাশের পুকুরে তোমাকে সাঁতার শিখিয়েছিলেন তোমার বাবা।

পথ আমাদের শেষ হয়ে এলো­­­­­­­­­­­­­­­­­­­। এসে গেছি যেখানে আসতে চেয়েছিলাম। নামো রিক্সা থেকে। ওকি চমকালে কেন? এটাই তোমাদের বাডী – যে বাড়ী তুমি ছেড়ে গিয়েছিলে। মানি, তোমার কথা। বড় জরাজীর্ণ হয়ে গেছে, জঙ্গল গজিয়েছে এ দিকে-সেদিক্, সবকিছু ধূসর এবং ধূলি-ধূসরিত। মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে? মন খারাপ করো না।

যাও, ঢুকে পড়ো। আমি? আমি তো ঢুকতে পারবো না, ভাই। আমি তো এ বাড়ী, এ শহর ছেড়েছি তোমারও আগে। আমি কে? চিনতে পারছো না? এতটা পথ এলাম একসঙ্গে, সব চিনিয়ে চিনিয়ে নিয়ে এলাম, তা’ও চিনলে না আমাকে? ভালো করে তাকাও আমার দিকে। এবার চিনতে পারছো? আমি যে তুমিই গো – তোমার ছোটবেলার তুমি। তোমার চোখে জল কেন? জলভরা চোখে কি গাইছ গুন গুন করে – ‘আপনাকে জানা আমার ফুরাবে না?’

ছবি: গুগল


­

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]