চলো বাঁচি…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরিয়ান বিন জায়ান

আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, প্রতিটা মানুষ বাঁচতে চায় … যে মানুষটা সুইসাইড করে মারা গেছে, মরে যাওয়ার ঠিক আগ মূহুর্তেও সে ছটফট করে বাঁচতে চেয়েছিল … কিন্তু সে বাঁচার কোন উপায় পায় নি … অথচ আপনিই তার জন্য একটা ‘উপায়’ হতে পারতেন … হ্যাঁ, আপনিই !!

চারপাশে যে কোন কারণে হতাশ, ডিপ্রেসড, কষ্টে থাকা মানুষগুলোর আত্মহত্যা করার প্রবণতার অন্যতম কারণ হলো, তারা প্রচণ্ড একা বোধ করে … আপনি উদাহরণ টেনে বলতে পারেন, অনেক জনপ্রিয় ব্যক্তিও আত্মহত্যা করেছে, তাদের লাখ লাখ ফ্যান … এমন কেউ কেউ আত্মহত্যা করেছে, যাদের বন্ধু বান্ধবের অভাব নেই … কই তারা একা কিভাবে ?

আপনার চারপাশে অনেক মানুষ, সারাদিন অনেকের সঙ্গে আপনার কথাবার্তা ও দেখা হয় – তার মানে এই না যে আপনি একা না … অনেক ভীড়ের মাঝেও মানুষ একা হয়ে যেতে পারে … ‘অনলাইনে’ অনেক বন্ধু থাকে, কিন্তু ‘মন খুলে কথা বলার মত’ বন্ধু কতজন ?

কখনো নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, আপনি আপনার কাছের মানুষটাকে, বন্ধুটাকে কতটুকু চেনেন ? … সে যখন কোন এক বিকালে বিষণ্ণতা লুকিয়ে আপনার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলে, আপনি কি সেটা ধরতে পারেন ?

আপনি কি নিশ্চিত যে আপনার বন্ধুর বা ভালোবাসার মানুষের বা পরিবারের একজন সদস্যের জীবনে কোন ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেলে সেই ঘটনা সে কোন দ্বিধা ছাড়া আপনাকে বলবে ?

উপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে আপনার বন্ধুটার একা বোধ করার পেছনে আপনিও দায়ী … আপনি শুধু নামে তার বন্ধু হয়েছেন … কিন্তু তার সঙ্গে আত্মার সম্পর্কটা আপনার নেই !!

যে মানুষটার সঙ্গে কারো আত্মার সম্পর্ক থাকে না, তার আত্মাটা ধীরে ধীরে মরে যায় … যার আত্মা মরে যায়, তার বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাও মরে যায় … সে নিজের অজান্তেই আত্মহত্যার দিকে চলে যায় !!

কেউ আত্মহত্যা করলে তাকে নিয়ে দুঃখ করাটা আপনার দায়িত্ব না … আপনার দায়িত্ব আপনার চারপাশের বেঁচে থাকা মানুষগুলার খোঁজ নেয়া … আপনার কাছের যে বন্ধুটা, যে পরিবারের সদস্য, যে জুনিয়র বা সিনিয়র প্রচণ্ড ডিপ্রেশনে ভুগছে, তার কাছে যান … তার মাথায় হাত রাখেন … এই মূহুর্তেই !!

আপনার কাছে ব্যাপারটা বিব্রতকর কিংবা অস্বস্তিকর লাগতে পারে … কিন্তু আপনি নিজেও জানেন না, আপনার দুইটা কথাতে, একটু ভরসাতে, একটু মোটিভেশনে একটা মানুষ অনেকখানি মানসিক স্বস্তি পেতে পারে !!

‘আত্মহত্যা কোন সমাধান না’ – এই নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখি করলে মৃত মানুষটা ফেরত আসবে না … বরং আত্মহত্যা যে কোন অপশনই না – এই ব্যাপারটা আপনার চারপাশের বেঁচে থাকা মানুষগুলোর মাথায় ঢুকান … প্লিজ !!

পরীক্ষার রেজাল্ট, প্রেমে ব্যর্থ, মা-বাবার সঙ্গে অভিমান এমনি অনেক কারণে ছেলে-মেয়ে আত্মহত্যা করে … এই ছেলেমেয়েগুলো কেন মরে গেছে, জানেন ?? … একটুখানি ভরসা আর মোটিভেশনের অভাবে !!

পৃথিবীর সব মানুষের সমান মেধা নেই। সবাই একরকম হতে পারেনা… কিন্তু আমরা এটা ভুলে যাই … ৯০% পাসের ভীড়ে ওই ফেল করা মেয়েটা নিজেকে ব্যর্থ মনে করে … না, আমরা তাকে ‘ব্যর্থ’ মনে করতে বাধ্য করি !!

সে বন্ধুদের সামনে যেতে পারে না লজ্জায়, সে আত্মীয়ের সামনে যেতে পারে না অপমানে, সে সমাজের সামনে যেতে পারে না হীনমন্যতায় … তার শেষ আশ্রয় বাবা-মা ও তাকে বলে,‘কী করলি জীবনে ? আমাদের সম্মান এভাবে নষ্ট করলি ?’

অথচ একজন ডিপ্রেসড মানুষের সঙ্গে আমাদের আচরণ কি এমন হওয়া উচিত ? … আমাদের এরকম আচরণই কি তাকে আত্মহত্যার ডিসিশন নিতে অনেক বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে না ?

আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন অনেকগুলা হতাশ মানুষকে চিনি, যাদের মাথায় হাত রেখে একটু বোঝানোর পর তারা জিদ করে পড়তে বসে ভালো রেজাল্ট করে আমাকে জানিয়েছে … যাদেরকে ৫ মিনিট সময় খরচ করে একটু বোঝানোর পর তারা জানিয়েছে, তারা হাল ছাড়বে না … কক্ষনো না !!

এগুলো মোটিভেশনাল স্পিচ কিংবা বানানো কোন কথা না … এটাই সত্যি … এই ব্যাপারগুলো অন্যদের জীবনে ঘটলে তোমার জীবনে কেন ঘটবে না ?

তোমার অন্যদের মোটিভেশনাল গল্প শুনার দরকার নেই … তুমি নিজেই একটা মোটিভেশনাল গল্পের জন্ম দেও … তুমিই সেই গল্পের মূল চরিত্র হবে !!

‘অমুক মানুষ এইটা করেছে’ ,’তমুক মানুষ ঐটা করেছে’ – এসব বলার কি দরকার … নিজেকে এমন জায়গায় নিয়ে যাও যেন ভবিষ্যতে বলতে পারো,‘জানেন, আমি এইটা করেছি … যে কারণে আর দশটা মানুষ আত্মহত্যা করতো, সেই একই কারণে বরং আমি বেঁচে ছিলাম … আজকে আমি ভীষণ সুখী … সেদিন মরে গেলে আজকের এই দিনটা আসতো না।’

হয়তো গোটা সমাজ তোমাকে বুঝবে না … পুরো পৃথিবী তোমাকে বুঝবে না … দরকার নেই বোঝার … তুমি না হয় নিজেকে নিজে একটু বোঝো … তুমি না হয় নিজেকে বোঝাও, একটা রেজাল্ট কিংবা একটা দুর্ঘটনাই সব না … একটু কটু কথা শুনো, সহ্য করো … একটু কাঁদো … তারপর জিদ করে আবার মাঠে নেমে পড়ো … একদিন ক্যারিয়ারে চমৎকার একটা জায়গায় গিয়ে দেখিয়ে দাও সবাইকে !!

একটু না হয় নির্লজ্জ হও … লজ্জায় আত্মহত্যা করো না … বরং নির্লজ্জ হয়ে একটু বেঁচে থাকো … একদিন উঁচু জায়গাটায় পৌছানোর জন্যই বেঁচে থাকো … একদিন অনেক বেশি ভালো থাকার জন্য হলেও বেঁচে থাকো !!

একদিন এই নির্লজ্জ তুমি ঐসব কটু কথা বলা মানুষদের আর ভুলের মধ্যে বেঁচে থাকা পুরা সমাজকে লজ্জায় ফেলে দিবে … সেদিন তুমি বুক ভরে নিশ্বাস নিতে নিতে টের পাবে, জীবনটা একটু বেশিই সুন্দর … এই সুন্দর জীবনের জন্য বেঁচে থাকাটা তাই সার্থক !!

ছবি: সজল ও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]