চলো হাওরে যাই…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বিজন রায়

২২ আগষ্ট ২০২০। ২ রাত ৩ দিনের জন্য অষ্টগ্রাম, মিঠামইন, ইটনা উপজেলার হাওরাঞ্চলে হেরিটেজ ট্যুরে বের হয়ে পড়ি। মূলত আমার ভগ্নিপতির একান্ত ইচ্ছে ও ব্যবস্থাপনায় এই ট্যুরটি করা হয়। হবিগঞ্জ থেকে কিশোরগঞ্জ একেবারেই পাশ্ববর্তী জেলা। বর্ষায় যাতায়াতও একদম সহজ ছিলো। সকালে রওয়ানা হয়ে লাখাই উপজেলার বুল্লা বাজারে পৌছাই। সেখান থেকে অষ্টগ্রাম উপজেলার আদমপুর গ্রামে নৌকায় যেতে হয়। নৌকা সকাল ৯.০০ টায় ছাড়বে। ঠিক সময়ের আগেই আমরাও উপস্থিত ছিলাম নৌকা ঘাটে। সময়ের মধ্যেই নৌকা ছাড়লো। ১

গুরুদয়াল সরকারের বাড়ি

ঘন্টার মধ্যেই আদমপুর বাজারে পৌছে গেলাম। এবার রওয়ানা হয়ে গেলাম প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কৈরাইলের আখড়া দেখতে বিশালাকার এই মন্দিরটি পরিত্যক্ত অবস্থায় মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে। তবে মন্দিরের চারিপাশের আরও অনেক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় আছে দেখতে পেলাম। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এর নির্মাণ সন সম্পর্কে ধারনা লাভ করা গেলো না। এই মন্দির আনুমানিক ৫০০ বৎসরের পুরনো বলেই সবাই ধারণা দিচ্ছিলেন। অনুমান করা হয় যে, জগম্মোহনী সম্প্রদায়ের রামকৃষ্ণ গোসাই প্রতিষ্ঠিত ৩৬০টি আখড়ার একটি হতে পারে এই কৈরাইলের আখড়া। আদমপুরের স্থানীয় বাসিন্দাদের নিকট হতে বিদায় নিয়ে আমরা আবার নৌকা নিয়ে অষ্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করি। সেখানে পৌঁছে আমরা মোগল আমলে প্রতিষ্ঠিত কুতুব শাহী মসজিদ ও ইমামবাড়া দেখতে যাই।তারপর স্বল্প সময়ের মধ্যেই আমরা সড়ক পথে মিঠামইনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। পথিমধ্যে আমরা অষ্টগ্রাম, মিঠামইন, ইটনার নতুন আকর্ষনীয় রাস্তা এবং হাওরের পানির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করি। যা প্রত্যক্ষ করার জন্য ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অগুনিত মানুষ ছুটে আসছেন এত দিনের অবহেলিত অষ্টগ্রাম, মিঠামইন, ইটনাতে। মানুষের এই স্বতস্ফূর্ত ছুটে চলা দেখে আবারও আমার মনে হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা একটি দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত। এতে বহু মানুষের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়। সেখানে বিভিন্ন যন্ত্রযান চলছে, হোটেল মোটেলের রমরমা ব্যবসা হচ্ছে। এসব দেখে খুব ভালো লাগছিলো। এরপর দুপুরের আহার সেরে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পর আসলেন মিঠামইন উপজেলার স্থানীয় কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক শ্রদ্ধেয় সত্যজিৎ মণ্ডল স্যার। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে জানলাম উনি মাগুরা জেলার বাসিন্দা চাকুরী সূত্রে এখানে আছেন। উনি আমাদের সন্ধ্যায় উনার কলেজে আমন্ত্রণ জানালেন এবং আমরাও রাজী হয়ে উনার অনুগামী হয়ে কলেজে গেলাম। সেখানে আরও গুনীজনদের সঙ্গে পরিচয় হয়। সত্যজিৎ স্যার কলেজে আগে থেকেই গানের চর্চা করে আসছিলেন এবং একটি সুসজ্জিত কক্ষে পূর্ব হতেই যন্ত্রপাতি রাখা ছিলো। যন্ত্র শিল্পীরাও যথা সময়ে চলে আসলেন। নজরুল গীতি দিয়ে গানের আসর শুরু হলো। এক এক করে বাংলা আধুনিক, শাহ আব্দুল করিমের গান পরিবেশন করলেন। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তন্ময় হয়ে শুনছিলাম স্যারের দরদী গলার গান। এক পর্যায়ে আমরা বিদায় নিলাম। পরদিন আবারও মিঠামইনের প্রত্যন্ত জনপদে ঘুরতে বেড়িয়ে পড়লাম। এ পর্যায়ে মালিকের দরগা, গোদর গোস্বামীর আখড়া, কর মহাশয়ের বাড়ী ঘুরে আবার মিঠামইন হয়ে ইটনাতে পৌঁছে যাই। সকল জায়গাতেই বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের ভালোবাসায় অভিষিক্ত হই। ভ্রমণের একটি দিক হচ্ছে ঐতিহ্যের দেখা পাওয়া কিন্তু এই ট্যুরের বাড়তি পাওনা ছিলো বিভিন্ন সুধী মহলের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ। তৎমধ্যে সত্যজিৎ স্যার, মশিউর রহমান ফরহাদ ভাই, পাপ্পু দাদা সহ অনেক গুনীজন ছিলেন। ইটনাতে পৌছে জেলাপরিষদের ডাক বাংলোতে প্রবেশ করি। বাংলোর সামনেই সচ্ছ জলধারার ধেনু নদী। ইটনাতে নদী দর্শনে আমাদের মন ভরে যায়। আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়লাম অবগাহনের জন্য। আর বহু বছর হয় এমন টলমল নদীর পানিতে অবগাহন করা হয় নাই। কাজেই সময়ের অপচয় না করে আমরা নদীর ঘাটে পৌছে গেলাম। নদীর পানিতে স্রোত বইছিলো সঙ্গত কারণেই একটু দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম যে, নদীর পানির স্রোতের টান আমি সামলে উঠতে

মিঠামইন উপজেলায় জমিদারের কাচারি বাড়ী।

পারবো কিনা? বাঁধানো ঘাটে সতর্কতার সঙ্গে নামলাম। কিন্তু ঝাপিয়ে সাঁতার কাটার সাহস করলাম না। কারণ আমরা নিতান্ত সাধারণ সাঁতারু। যাইহোক ধেনু নদীর স্বচ্ছ জলে অবগাহন করতে পেরে খুবই উৎফুল্ল ছিলাম। এই নদীর ঘাট হতে বিভিন্ন গন্তব্যে নৌকা, স্পীডবোট ছুটে চলছিলো। আমরা অবগাহন সেরে আমাদের বাংলোয় প্রবেশ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই বিছমিল্লা হোটেলে খাওয়া দাওয়া সেরে নেই।এবার নৌকা নিয়ে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজের প্রতিষ্ঠাতার বাড়ী কাঠৈর গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। নিতান্ত পল্লীতে বসবাস করেও শ্রদ্ধেয় গুরুদয়াল সরকার কিশোরগঞ্জ তথা দেশের শিক্ষা বিস্তারের কথা ভেবেছেন। গুরুদয়াল সরকারের প্রাসাদ্যোপম বাড়িতে বর্তমানে উনার ৭৬ উর্ধ্ব দৌহিত্র পরিবার সমেত বসবাস করছেন। এবার কাঠৈর গ্রাম থেকে বেড়িয়ে আমরা ইটনার বিভিন্ন পল্লী ঘুরে ইটনার ঐত্যিহ্য সমৃদ্ধ দেওয়ান বাড়ী দেখতে গেলাম। দেওয়ান বাড়ীর ইতিহাস ঐতিহ্য আরেক বিস্ময়। যার ধারা বর্ণনা এই স্বল্প পরিসরে স্ববিস্তারে তুলে ধরা সম্ভবপর নয়। দেওয়ান বাড়ীর পাশেই মোগল আমলের এক প্রাচীন মসজিদ স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী একে তারা গায়েবী মসজিদ বলে আসছেন। মসজিদের অতি নিকটেই আবার সাত বিবির মাজার। এর পূর্বাপর ইতিহাস আমরা জানতে পারি নাই। তবে দেওয়ান বাড়ী ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল দেখে এটি একটি অতি প্রাচীন জনপদ বলে মনে হয়েছে। এসব দেখতে দেখতে সন্ধ্যার অন্ধকারও ঘনিয়ে আসছিলো। আমরা ডাক বাংলায় ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। কিছুক্ষণ পর আবার বেড়িয়ে পরলাম এদিক সেদিক ঘুরে দেখতে। তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে আমাদের মন পড়ে রইলো ইটনার ধেনু নদীর দিকে। নদীর স্বচ্ছ জলধারা আর এর ঝিরিঝিরি বাতাস কিছুতেই আমাদের মনকে ঘরে আটকে রাখতে পারছিলো না। এসব খুব উপভোগ করছিলাম। রাত গভীর হলে আমরা নদীর তীর ঘেসে গড়ে উঠা বিছমিল্লাহ্ হোটেলে খেতে যাই। এখানে একটু উল্লেখ না করলে হয় না সাধারণত দেশের হোটেল বিশেষতঃ গ্রাম এলাকায় খাবার দাবার মানসম্মত হয় খুব একটা হয়না। কিন্তু ইটনার বিছমিল্লাহ্ হোটেল সেরকম নয়। সব কিছু একেবারে ঘরোয়া পরিবেশে পরিবেশন করা হয়েছে। মাছও অত্র এলাকায় খুবই সুপ্রসিদ্ধ। যাইহোক পরদিন যথারীতি ফেরার পালা আমাদের নৌকা পূর্ব নির্ধারিত ছিলো। সে যাত্রায় আমরা ইটনার জয়সিদ্ধি গ্রামে আনন্দ মোহন বসুর বাড়ী দেখতে গেলাম। যিনি ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। ঐ বাড়ীতে বর্তমানে তাদের বংশধরেরা কেউ বসবাস করছেন না। তবে বাড়ীর বর্তমান বাসিন্দাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে তিনিও কিশোরগঞ্জ জেলা সদরে বসবাস করছেন। জয়সিদ্ধি গ্রাম হতে বিদায় নিয়ে আমরা ইটনার শেষ সীমান্ত আমিরগঞ্জ বাজার পৌছাই। এখানেই কিশোরগঞ্জের সঙ্গে হবিগঞ্জ জেলার শেষ সীমানা। নদী পার হতেই আজমিরীগঞ্জ। আজমিরীগঞ্জে দুপুরের আহার পর্ব সেরে আজমিরীগঞ্জের একটি প্রাচীন জনপদ বিরাট গ্রামে যাই। সেখানে এক সময়ে বহু অর্থ বিত্ত সম্পদশালী মানুষের বসবাস ছিলো যা বিরাট গ্রামের বাড়ী ঘরের নির্মাণ শৈলী দেখে অনুমান করা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বীর চরণ রায়ের বাড়ী যিনি শিক্ষা বিস্তারে গ্রামেই গড়ে তুলেছেন সারদা সুন্দরী প্রাইমারী স্কুল, ও ১৯৩০ সালে আজমিরীগঞ্জ এমালগামেটেড বীরচরণ(এ.বি.সি.) সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। এই গ্রামেই বৃন্দাবন রায়ের প্রাসাদ্যোপম বাড়ী সহ আরও অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে। এসব দেখে অনুমান করা যায় এক সময়ে মানুষ গ্রামেই সুখী নির্ঝাঞ্জট জীবন পার করতেন। কিন্তু বর্তমানে এর চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। মানুষের মাঝে ভোগবাদী প্রবনতা বেশী লক্ষ্য করা যায়। একের ধন নিয়ে অন্যের কাড়াকাড়ি। যে কারণে  এখন আর সারদা সুন্দরী প্রাইমারী স্কুল ও এবিসি স্কুল আর গড়ে উঠছে না। এ যাত্রায় এখানেই মোটামুটি ৩ দিন ২ রাতের ভ্রমণ সম্পন্ন করি এবং আমরা বানিয়াচং হয়ে হবিগঞ্জ চলে আসি। আমি কোন লেখক নই কাজেই আমার লেখা কারো সুখপাঠ্য হওয়ারও কথা নয়। ভ্রমণের বিষয়বস্তু একটু তুলে ধরামাত্র আর কৃতজ্ঞতা ভরে অত্র এলাকার মানুষের যে আন্তরিকতা সেটাকে স্মরণে নেয়া। অষ্টগ্রাম, মিঠামইন, ইটনার এই সফর ছাড়াও আমরা যেখানেই হেরিটেজ ট্যুরে এসব স্থাপনা দেখতে গেছি তখনই লক্ষ্য করেছি এর উদ্দেশ্য নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে একটা কৌতুহল কাজ করে এবং অনেক ক্ষেত্রে ট্যুরের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়া হয়। আমি তাঁদের এই কৌতুলকে সম্মান জানিয়ে উত্তর দিতে চেষ্টা করি আর ভাবি হেরিটেজ ট্যুর নিয়ে নিজের ভাবনা।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক ও গুগল থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]