চাঁদের আলোয় ক’য়েকজন যুবক ও আমি…

সাবিহা হক

‘নস্টালজিকের’ সঠিক বাংলাটা আমি ঠিক জানিনা। আর্ত অতীত, বেদনাতুর স্মৃতি ,হয়তো আবেগের সর্বচ্চ অনুভবকেই বোঝায়। তেমনি নস্টালজিয়াতে নিমগ্ন হলাম গত ১৯শে মার্চ স্বপনের ঢাকা ইউনিভার্সিটির কিছু স্বপ্নচারী বন্ধুদের আন্তরিক আহবানে, টেকনাফ থেকে মাত্র চার কিলোমিটার আগে ‘লম্বোরি’নামক অচিন্তনীয় সুন্দর একটি স্থানে।

বিকেল ৪ টায় কক্সবাজার থেকে যাত্রা করলাম। মেরিন ড্রাইভের সুন্দর রাস্তা আর সাগর ঘেষে ঝাউবন ,নতুন ব্রিজ পাড় হয়ে এগিয়ে চলছি…. একপাশে সবুজ ,মাঝেমাঝে উঁচুনিচু পাহাড়ের অপরূপ দৃশ্যায়ন … মন চোখকে আরামের পরশ বুলিয়ে যাচ্ছিলো। নির্দিষ্ট জায়গায় চলে এলাম সূর্যাস্তের ঠিক ১৫ -২০ মিনিট আগে। ইকবাল ভাই দাঁড়িয়ে ছিলো রিসিভ করার জন্য। অনেকদিন পর দেখা। বাঁশের তৈরি সাঁকো দিয়ে পার হলাম সদ্য অর্ধ নির্মিত রিসোর্টের দিকে। চারপাশের সবুজ তারি মাঝে রিসোর্টের কাজ চলছে। বুঝে নিলাম কি হতে যাচ্ছে অচির ভবিষ্যতে। সুন্দর মায়াবী প্রকৃতিকে ঘিরে নিস্তব্ধ সাগরের কোল ঘেষে সুন্দর কিছু স্থাপনা। ভুলেই গেলাম অস্তগামী সূর্যাস্তের কথা। মনে পড়তেই দে ছুট স্বপন ,ইকবাল ভাই আর আমি। বালিয়াড়ি তে অপূর্ব বর্নতে সেজেছে লাল, নীল, সবুজ সারিবদ্ধ জেলেনৌকা। যেনো রংতুলিতে কোনো শিল্পীর শৈল্পিক আঁচড়।

নিসর্গের কোনো সবুজ বিস্তৃর্ণ ঘাস মাড়িয়ে বালুতে পা ফেলে ফেলে দেখলাম সূর্যটা তার লাল আভা ছড়িয়ে মিশে যাচ্ছে অতল সাগরের বুকে। কি যেনো এক অসীম ব্যথা বোধ হয় বুকের ভেতরে সাগরের ঢেউয়ের মতোই উথালপাতাল । দিনের শেষ, সন্ধ্যা নেমে আসে নীরব বেলাভূমিতে। আবার ফিরে যাই শহর থেকে আসা ক’জন বন্ধুদের সান্নিধ্যে।

মিজান, বাবু, মনি, রেজা, শ্যামল, কামাল, ইকবাল, আরেক মিজান ভাই সহ অন্যান্য ভাইরা। কেউ কেউ আমাদের জন্য বাজারে যেয়ে মাছ কিনে এনেছে। পোয়া মাছ, রাতাকুড়া। রাতে রান্না হবে। দোল পূর্নিমার চাঁদ তখন আলোর বিচ্ছুরণ করতে শুরু করে দিলো। আহারে তার কি হাহাকার করা রূপ। উঠোনে বসে কিনে নেয়া মিষ্টি ,সন্দেশ কফি খেয়ে আবার যেয়ে বসলাম অর্ধ নির্মিত রিসোর্টের নিচতলার খালি জায়গায়। শুরু হলো স্বপনের গান। সবাই আনন্দে আহ্লাদে গলা মিলালো। সেই চারুকলার পেছনে আরিফের বাজানো মেন্ডালিনের সুরে গান গাওয়া – স্মৃতি জাগানিয়া মুহুর্তগুলো যেনো ফিরে পেলো তারা। চাঁদ ক্রমশ আরো আলোকিত জোছনা ছড়িয়ে দিচ্ছিলো চারপাশ । একের পর এক প্রিয় গানগুলো চলতে থাকলো। মুগ্ধকর পরিবেশে গান ভাসিয়ে নিয়ে গেলো সেই অতীত স্মৃতি রোমন্থনে….যাকে তোমরা বলো নস্টালজিক !!!

কিছুক্ষণ পরে পোয়া মাছ ভাজা নিয়ে এলো বাবু ভাই। সঙ্গে টমেটো সস। অভাবনীয় স্বাদ তার। গানের পর গান চলছে,নাচছে কেউকেউ। মনি ভাই চেয়ারটাকে দিব্বি ঢোল বানিয়ে তাল দিচ্ছে। কেউ কেউ চাঁদের জোছনা গায়ে মাখছে। অবারিত জোছনাকুমারী একটুও কার্পণ্য করছেনা তার আলোর বন্যা ছড়িয়ে দিতে। নিশ্চুপ আলাপনের সুরঙ্গম আবেশে ডুবে যেতে যেতে কখন যে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এলো বুঝতেই পারিনি। আমিও চলে এলাম জোছনায় ডুবতে। মনে হলো…..

” আজ ফিরে না গেলেই কি নয়

সন্ধ্যা নামুক না

জোনাকি জ্বলুক না

নির্জনে কেটে যাক কিছুটা সময়”

কিন্তু সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাত নেমেছে ,জোনাকিও জ্বলেছে

নির্জনতার আবেশ ছাড়িয়ে সবাই তখন গানে হৈচৈ এ বিভোর। শ্যামল ভাই হঠাৎ করে আবৃত্তি করলো, চমকে যাওয়া উদ্দাত্ত্ব উচ্চারণে। পরিবেশটা বদলে গেলো অবাক সুন্দর মুহুর্তে। সঙ্গে চললো আমাদের থেকে যাওয়ার সরল আবদার ।

রাতাকুড়া রান্না হতে বেশ দেরি হবে। গ্যাসের হঠাৎ কমতি। এদিকে ফেরার তাড়া। অত:পর রুটি ডিম ভাজা খেয়ে চলে আসার প্রস্তুতি।

আমার নি:শব্দ গুমোট আবহের মানসপটে একাকার করে দিয়ে গেলো দোল পূর্নিমা আর মানুষগুলোর শিশুর মতো আনন্দ উচ্ছ্বাস।

এভাবেই ছোট ছোট জীবনের উন্মেষ ঘটে স্বপ্নচারী যুবকদের মনে।

তারা বলে উঠে ,শ্বাসঘাত করোনাময় জীবন পেরিয়ে অনেকদিন পর মনের আনন্দে গান আড্ডায় মাতলাম। আবার এসো এবং কথা দাও তখন কিন্ত রাত্রিযাপন করতে হবে।

কথা দিলাম…….

ফিরে এলাম ,রেখে এলাম স্বপ্নালু কিছু মানুষের অবয়ব …..!!!

শুনেছি রিসোর্টের নাম হবে “সাগর জানালা”

সেদিনের প্রতীক্ষায় থাকবো যেদিন অগনিত মানুষ ভীড় করবে এই “সাগর জানালায়”

কাছের নীরব সাগর বেলাভুমি মুখরিত হবে হাজার হাজার মানুষের পদচারণায়………আপাতত বিদায় “লোম্বারি “

সলাজ আবেগে সোনাঝরা সেসব স্মৃতির বেদনা ছেড়াবীণার তারে বাজবে নীরব অহংকারে !!!

দেখা হবে বিশ্বাসে….. আজ জীবন খুঁজে পেতে ছুটে ছুটে আয়” এই আশ্বাসে !!!


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box