চাকুওয়ালা পাগল আমায় পাগল করেছে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

আটানব্বই সালের গল্প বলছি।খুবই ব্যাস্ততম সময় কাটে আমার সংসার গান নতুন নতুন রান্না আর মেহমানদারী নিয়ে। বাচ্চাদের পড়ার প্রধান দায়িত্ব আমার না।তবুও সেগুলোও দেখি।বাসায় ল্যান্ডফোন। আমি কখনও সরাসরি ফোন ধরিনা।কোন পত্রিকায় যেন আমার ফোন নম্বর ছাপা হয়েছে। সেই থেকে শুধু ফোন আসে।আমার সঙ্গে কথা বলবে।দু’এক জনের সঙ্গে কথা বলেছি কিন্তু কথা বলেই পড়েছি বিপদে।কেউ খুশিতে আত্মহারা কেউ কেঁদেকেটে একাকার! কেউ বাসায় আসতে চায়, কেউ চাল ডাল থেকে গয়নাগাটি পর্যন্ত দিতে চায়। তখনই আমার হাজব্যান্ড বলে দিলেন তুমি একদম ফোন ধরবেনা। আমি খুবই বাধ্য টাইপ মানুষ। ভুলেও ফোন ধরিনা।ফোনে ভক্ত সাংবাদিকদের ইন্টারভিউ নিয়ে তারপর উনি আমাকে ফোন দেন।আমি মেপে মেপে কথা বলি। আমার তাতে কোন অসুবিধা নাই।এভাবে দিন যাচ্ছিলো। কিন্তু একটা ফোন আমার জীবন বিপন্ন করে দিলো।মধ্যরাতে ফোন করে কথা বলেনা।বা আজব আজব শব্দ করে। আমার হাজব্যান্ড হ্যান্ডেল করেন। সেই ফোন আসার হিসাব বাড়তেই থাকলো। দিন নাই রাত নাই।উনি যন্ত্রনায় আমাকে দিলেন ফোনে কথা বলতে।আমার সঙ্গেও কথা বলেনা।খালি কাঁদে।পুরুষ কণ্ঠ কাঁদে সে কান্নায় আকুতি নাকি আক্রোশ কিছুই বুঝিনা। শ্রুতি স্টুডিওতে মাঝেমধ্যেই অচেনা এক মানুষ অনেকের ভিড়ে আসে।একে ওকে জিজ্ঞেস করে আমার হাজব্যান্ড জানতে চায় কে এই লোকটা? কেউই তাকে চেনেনা,আবার কেউ বলে আমি তো ভেবেছি তোমাদের লোক! কিছু একটা টের পেয়ে সে ওখানে আসা বন্ধ করে। একদিন ফোনে সেই লোকটা কথা বলে ওঠে।সে আমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চায়।কেন? তার জীবনের একটাই ইচ্ছা, শেষ ইচ্ছাও বটে।এটা কেমন কথা? বলে উনাকে দেখেই আমি মারা যাবো। এ অবস্থায় কি তাকে দেখা করার সুযোগ দেয়া যায়? কি না কি করে বসে, আমরা যতটুকু এড়িয়ে চলা যায় চলছি।কিন্তু সেই যন্ত্রনা থেকে বেরুতেই পারছিলাম না। একদিন সেই লোকটা বললো আমাকে কিছু গিফট পাঠাবে।কোনভাবেই আমরা ঠিকানা দেইনা।সেও পিছু ছাড়েনা।এভাবে প্রায় ছয় মাস! হঠাৎ একদিন একটা কুরিয়ার সার্ভিস থেকে খাকি রঙের বিস্কুট এর বাক্সে পার্সেল এলো। প্রেরকের নাম ঠিকানা বিহীন। আমার স্বামী সেই কুরিয়ার সার্ভিস এর অফিসে গিয়ে শোনেন সেন্ডার পার্সেল দিয়েই চলে গেছে। তারা তো নিয়মমতো এটা রাখতে পারেনা। এজন্য অনেক ঝগড়াঝাটি করেও কি মনে করে গিফট বক্স বাসায় আনলেন। এনে খুলে দেখি হাবিজাবি অনেক কিছু। কোনোটার সঙ্গে কোনটার মিল নেই,সেগুলো আমার ব্যাবহার যোগ্য গিফট ও না এবং কয়েকটি জিনিস পুরনো কিন্তু সেখানে ঝকঝকে একটি চাকু! সবাই একসঙ্গে চমকে উঠলাম এবং কেমন যেন ঝিম ধরে গেলাম।কি অর্থ হতে পারে এই চাকুর! আমি তো সাধারণ একজন শিল্পী, যার সঙ্গে এই চাকু কোনভাবে মানায়না! এই পৃথিবীতে আমার জানামতে আমার কোন শত্রু নাই,কারো সঙ্গে  আমি কখনও খারাপ ব্যাবহার, অহংকার কিছুই করিনা। নতমুখে চুপচাপ গান গাই এই পর্যন্তই সেখানে কি এমন হতে পারে যে গিফট এর কথা বলে আমাকে চাকু পাঠিয়ে ভয় দেখায়! এমনিতেই আমি বন্দী জীবন যাপন করি,কেউ কেউ আমাকে বাক্সবন্দি রাজকন্যা বলে কটাক্ষ করে সেখানে এই কান্ডের পরে আমার জীবন একদম কনডেম সেলের মতো হয়ে গেলো। কোথাও বেড়ানো একদম বন্ধ।সাংবাদিকদের ফোন ও ধরিনা।কোনমতে গাড়িতে চড়ে স্টুডিওতে যাই আসি।কোথাও একগ্লাস পানি, চা কিছু খাইনা। কিন্তু আমি দুঃখ অথবা কোন রকম বিপর্যয় কে শক্তিতে রূপান্তর করতে পারি। আমি বন্দী জীবনে আরও গানের সাধনায় মেতে উঠলাম। লম্বা সময় ইবাদতে মন দিলাম। এবং মনে সাহস আনার চেষ্টা করতে থাকলাম।আমার কেউ ক্ষতি করতে পারে এ কথা আমি একবারের জন্যও বিশ্বাস করিনি শুধু অবাক হয়েছি ভক্তই যদি হবে তো তার আচরণ এমন কেন!

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]