চারু মজুমদারের সঙ্গে এক দুপুরের স্মৃতি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দিল্লীর বাতাসও যেন পুড়ে যাচ্ছে ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসের দাবহ্ দাহে। সাগর দেব নামে ১৯ বছর বয়সী এক কিশোর অপেক্ষা করছে শহরের প্যাটেল নগরের কাছে একটা ঘিঞ্জি বাসস্ট্যান্ডে। ঘামে তার পরনের শার্টটা ভিজে উঠেছে। ভিজে উঠছে হাতের মুঠোয় ইংরেজিতে একটা বাড়ির ঠিকানা লেখা ছোট্ট কাগজটাও।কিন্তু সেই এপ্রিলের ভয়ংকর গরমে তার কোথাও নড়ার হুকুম নেই। ভারতের বেআইনী ঘোষিত তৎকালীন সিপিআই (এম.এল) পার্টির দিল্লী ইউনিটের একনিষ্ঠ কর্মী সাগরকে বলা হয়েছে, কেউ একজন আসবেন সেখানে। তাকে বাসস্ট্যান্ড থেকে সেই বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে। সাগর দেবের মাথায় বয়ে চলেছে প্রশ্নের ঝড়। কে আসবেন? কাকে অভ্যর্থনা করতে হবে?

এপ্রিলের সেই উত্তপ্ত দুপুরটা আসার কয়েকদিন আগে পার্টির একজন নেতা সাগরকে ডেকে নিয়ে গিয়ে জানিয়েছেন, একজন ব্যক্তি আসবেন দিল্লীতে। তাকে খুব গোপনে একটা বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে। পার্টির নিয়ম অনুযায়ী সাগর সেই ব্যক্তির পরিচয় জানতে পারবেন না। প্রশ্ন করা নিষেধ। সাগর অবশ্য তখনই টের পেয়েছিলেন পার্টির একজন বড় নেতার পদার্পণ ঘটতে যাচ্ছে রাজধানীতে।

আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর রহস্যময় সেই নেতা উপস্থিত হলেন বাসস্ট্যান্ডে। শুকনো আর মলিন চেহারার একজন মানুষ। সাগর দেবের মনে আছে, মানুষটার পরনে ছিলো কোঁচকানো পায়জামা আর খদ্দরের কোর্তা। সাগর দেবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভদ্রলোক ঝকঝকে হাসলেন এবং মৃদু গলায় প্রশ্ন করলেন, সাগর?

সাগর মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেও চিনতে পারেননি সেদিন ওই নেতাকে। রহস্যময় সেই অতিথিকে নিয়ে সাগর হাঁটতে শুরু করেন । বাড়িটা তাকে খুঁজে বের করতে হবে।

পঞ্চাশোর্ধ সেই মানুষটির সঙ্গে সাগরের খুব বেশি কথা হয়নি। হাঁটতে হাঁটতে ছিটকে আসা দু’একটা প্রশ্ন বড়জোর। সাগর উত্তরও দিয়েছিলেন।

কী পড়ছো?

ইঞ্জিনিয়ারিং।

উত্তর শুনে ভদ্রলোক খুশি হয়ে তাকিয়েছিলেন সাগরের দিকে। জানতে চেয়েছিলেন, সাগরের আর কতজন বন্ধু নকশাল আন্দোলনে বিশ্বাস করে?তারা কি বিশ্বাস করে এই আন্দোলন ভারতবর্ষের বুকে শ্রেণী সংগ্রামের সূচনা করতে যাচ্ছে?

সাগর সেদিন নেতাকে জানিয়েছিলেন, অনেকেই এই আন্দোলনের ভাবধারায় বিশ্বাস করে। তারা সবাই মার্কসবাদের আদর্শে বিশ্বাসী। দিল্লীর রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সাগরের সেদিন ইচ্ছা হচ্ছিলো নেতাকে প্রশ্ন করার, পার্টি জনগণকে কীভাবে সংগঠিত করবে, শুধু সন্ত্রাসবাদই কী একমাত্র পথ? কিন্তু প্রশ্নগুলো আর করা হয়নি সাগরের। কোনো প্রশ্ন না-করতে নেতারা নির্দেশ দিয়েছিলেন।

সেদিন বাড়িটা খুঁজে পেতে বেশ কষ্ট হয়েছিলো সাগর দেবের। পথে পথে অনেক মানুষকে প্রশ্ন করে জেনে নিতে হচ্ছিলো পথের ঠিকানা। সেই নেতা সাগরকে বলেছিলেন, তাকে অনেক ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। এক রাত এখানে তো আরেক রাত অন্যখানে কাটাতে হচ্ছে। দিল্লীতে আসার কারণটা না-বললেও তিনি যে কিছুদিন সেখানেই থাকবেন সে তথ্যটা সাগর তাঁর মুখ থেকেই জেনেছিলেন।

কথা বলতে বলতে সাগরের অবশ্য মনে হচ্ছিলো এই সেই নেতা যার সঙ্গে দেখা করাটা সাগরের জন্য তখন স্বপ্ন ছিলো। কিন্তু সাগর দেব সেদিন তাঁর নামও জানতে পারেননি। আরও দু’একটা কথা বিনিময় করতে করতে সাগর দেব তার অতিথিকে নিয়ে পৌঁছে যান নির্দিষ্ট সেই বাড়ির সামনে। দরজায় কয়েকটা মৃদু টোকা দিতেই দরজা খুলে আবির্ভাব ঘটে দুই ব্যক্তির।

আমি সাগর…

এটুকুই উচ্চারণ করতেই তারা ওই মানুষটিকে ভেতরে নিয়ে যায়। সাগর দেবকে বলা হয় চলে যেতে।সাগর দেব দরজা থেকে বিদায় নেয়ার আগে সেই মানুষটাই আবার ফিরে আসেন। করমর্দন করেন সাগরের সঙ্গে। তারপর তিনি আবার বাড়ির ভেতরে ঢুকে যান ক্লান্ত পদক্ষেপে। সেদিনই সাগর শেষবার মানুষটিকে জীবিত দেখেন।

তারপর ১৯৭২ সালের ১৭ জুন সাগর পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারেন কলকাতার এন্টলি এলাকার একটি গোপন বাড়ি থেকে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন নকশাল আন্দোলনের কিংবদন্তীসম নেতা চারু মজুমদার। পত্রিকায় ছাপা হওয়া ছবিটি সাগরকে জানিয়ে দেয় সেদিন তিনি কাকে ওই বাড়িটাতে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

প্রেপ্তার হবার পর ১০ দিন চারু মজুমদার পুলিশের লকআপে বেঁচে ছিলেন। ওই সময়ে আইনজীবী, পরিবারের মানুষ কাউকেই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দেয়া হয়নি। এমনকি তার চিকিৎসকও দেখা করতে চেয়ে ব্যর্থ হন। ১৯৭২ সালের ২৮ জুলাই ভোর ৪টায় চারু মজুমদারের মৃত্যু হয় পুলিশের কাস্টডিতে।

চারু মজুমদার কেন দিল্লী গিয়েছিলেন সে বিষয়ে তার পার্টির হাইকমান্ডও পরবর্তী কালে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। বিষয়টা সম্পর্কে জানতেন না তাঁর ছেলে অভিজিৎ মজুমদারও। তবে সেদিন চারু মজুমদারকে সেই বাড়িটাতে নিয়ে যাবার স্মৃতি মনে রেখেছেন সাগর দেব। ফার্স্টপোস্ট পত্রিকার সাংবাদিকদের সঙ্গে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি ধূলো সরিয়ে তুলে আনেন চারু মজুমদারের জীবনের শেষ সময়ের অজানা তথ্য।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ ফার্স্টপোস্ট
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box