চিঠিগুলো ছিলো ভালোবাসার…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দীর্ঘ সময় ধরে তাদের প্রেম ছিলো চিঠির পৃষ্ঠায়, শব্দের কালো বুননে ঘেরা। সেসব প্রেমের চিঠি আলোর মুখও দেখেনি বহু বহু বছরেও। গুটিকয় কাছের মানুষ ছাড়া সেই  প্রেমের অস্তিত্ব অজানা ছিলো সবার কাছে। এত বছর পার হয়ে সেই প্রেমময় অথচ ধারালো চিঠিগুলো প্রকাশিত হলো ইংল্যান্ডের প্রেন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই অবস্থিত ফায়ারস্টোন নামে একটি লাইব্রেরীতে।কড়া নিরাপত্তা ছিলো চিঠির প্রদর্শনীতে। কারণ চিঠিগুলো লিখেছিলেন বিগত শতাব্দীর অসাধারণ ইংরেজ কবি টি. এস এলিয়ট তার বিদূষী বান্ধবী এমিলি হেইলকে।

এমিলি হেইল

দু’জনের দেখা হয়েছিলো ১৯১২ সালে হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। দু’জনেই সেখানকার ছাত্র তখন। দু’জনের ইচ্ছা অনুসারেই ৫০ বছর চিঠিগুলো ছিলো লোকচক্ষুর অন্তরালে।

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কবি আর সেই বিদূষী নারীর ভালোবাসা চিঠিগুলোর ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাদের ভালোবাসা কিন্তু  পরিণতি পায়নি। এলিয়ট বিয়ে করেননি এমিলিকে। অথচ এই নারী এলিয়টের চমৎকার সব কবিতার প্রেরণা হয়ে রয়ে গেছেন। টি. এস এলিয়টের উপর গবেষণা করেন এমন পণ্ডিতজনেরা বলছেন, এই চিঠি কবির জীবন আর আধুনিক চেতনাকে প্রকাশিতও করেছে।

দু’জনের সাক্ষাৎ পর্ব ১৯১২ সালে হলেও চিঠি আদানপ্রদান শুরু হয় ১৯৩০ সালে। বিবাহিত জীবনে অসুখী কবি সে বছরের ৩ অক্টোবর চিঠিতে লিখেছেন, ‘‘আমার কোনো একান্ত বন্ধু নেই। আমি পাতার পর পাতা যে কোমল ভালোবাসার কথাগুলো লিখছি না আসা করি তুমি তা টের পাচ্ছ। আমার ভালোবাসা পৃথিবীর যে কোনো ভালোবাসার চাইতেও উজ্জ্বল।’’

হেইলের লেখা চিঠির উত্তরগুলো প্রদর্শনীতে স্থান না পেলেও ওই সময় থেকেই দু’জনের মাঝে আবেগময় পত্র বিনিময়ের শুরু বলে ধারণা করা হয়। ওই চিঠির শেষে এসে এলিয়ট লিখছেন, ‘‘এটা যদি কোনো প্রেমপত্র হয় তবে ধরে নাও আমি আমার জীবনের শেষ প্রেমপত্র লিখছি এবং আমি এই চিঠিতে আমার স্বাক্ষর দিয়ে রাখছি।’’

ওই বছরের নভেম্বর মাসে হাতে লেখার পরিবর্তে টাইপ করা একটি চিঠিতে এলিয়ট এমিলিকে লিখছেন, ‘‘তুমি আমাকে যথার্থ ভাবে সুখী করেছো। এক জীবনে এতটা সুখ আমি পাইনি। আর বাকীটা জীবনে যতটুকু সুখ আমি জড়ো করতে পারবো বলে মনে হয় তার পুরোটাই এখন আমায় জুড়ে আছে। আর এই সুখের অনুভূতি আমার কাছে গভীর বেদনা আর ক্ষতির মতো।’’

এলিয়টের সঙ্গে এমিলি

এলিয়ট তখন তাঁর আর এমিলির মধ্যেকার সম্পর্কটিকে এক ধরণের ‘আবেগাক্রান্ত জ্বর’ আখ্যা দিয়ে ডিসেম্বর মাসে লেখা চিঠিতে লিখেছেন, ‘‘যন্ত্রণা এখন আরো তীব্র। কিন্তু তীব্র যাতনা এমন যা আমাকে ছাড়া বাঁচবে না।’’

এমিলি অবশ্য ১৯৬৯ সালে তাঁর মৃত্যুর আগে প্রিন্সটনের সেই লাইব্রেরী কর্তপক্ষের কাছে তিন পৃষ্ঠার একটি চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি এলিয়টের সঙ্গে তাঁর সম্পর্করে একটি ব্যাখ্যা দেন। তিনি চিঠিতে দু’জনের সম্পর্ককে ‘চমৎকার বন্ধুত্ব’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘‘আমরা দুজনেই দুজনের জীবন সম্পর্কে জানতাম। জানতাম একে অপরকেও। কিন্তু তার পরেও আমার ভেতরে কবির জন্য ছিলো একনিষ্ঠ বন্ধুত্ব।’’

এলিয়টের অসুখী দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে সবটাই জানতেন এমিলি। ভিভিয়ান হে উডকে এলিয়ট বিয়ে করেছিলেন ১৯১৫ সালে। ভিভিয়ান শারীরিক ভাবে অসুস্থতায় ভোগার পাশাপাশি মানসিক রোগীও ছিলেন বলে এলিয়টসহ অনেকেই দাবি করেন। কেউ আবার বলেন, এলিয়টের অবহেলা, বাজে আচরণই ভিভিয়ানকে একটা সময়ে ঠেলে দিয়েছিলো মানসিক হাসপাতালের চারদেয়ালের অন্তরালে। সেখানেই রোগে ভুগে মারা যান ভিভিয়ান।

এলিয়ট আর এমিলি ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে খুব ঘনিষ্ট হয়ে ওঠেন। ওই সময়ে দুজনেই একসঙ্গে গ্রীষ্মকাল কাটাতে যেতেন ইংল্যান্ডের গ্লুসেসস্টারশাযারের কেম্পডেন নামে একটি জায়গায়। এমিলি ব্যাখ্যায় লিখেছেন , ‘‘ওই সময়ে আমরা দু’জন দু’জনের খুব কাছে চলে এসেছিলাম।আমরা আমাদের প্রয়োজন, রুচি, আনন্দ সব কিছুকেই খুব স্পষ্ট করে উপলব্ধি করতে পারছিলাম। আর তাতে করে আমাদের মাঝে চমৎকার একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো।’’

চিঠির শেষে এসে এমিলি লিখেছেন, এলিয়টের স্ত্রী ১৯৪৭ সালে মানসিক হাসপাতালে মারা যাবার পর তিনি নিজেই তাদের সম্পর্কের একটি পরিণতি টানতে বিয়ে করে ফেলার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু বিধি বাম। তাদের সম্পর্ক বিয়ের আসরে গিয়ে পৌঁছায়নি। এলিয়ট দুম করেই ভ্যালেরী নামে আরেকজন নারীকে বিয়ে করে ফেলেন।

যারা তাদের এই গোপনে প্রবাহমান সম্পর্কের কথা জানতেন তারা বিষ্মিত হয়েছিলেন এলিয়টের সিদ্ধান্তে। অবশ্য এলিয়ট পরে সেই লাইব্রেরী কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘‘আমি এমিলি হেইলের প্রেমে পড়ি ১৯১২ সালেই। আমি জার্মানী ও পরে ইংল্যান্ডে চলে যাবার আগে তাকে জানিয়েছিলাম আমার ভালোবাসার কথা। কিন্তু এমিলি হেইলের সঙ্গে গ্রন্থিত হলে হয়তো আমার ভেতরের কবির মৃত্যু ঘটতো। ভিভিয়ান আমার এক ধরণের মৃত্যুর কারণ ছিলো। যদিও তখন এমিলি আমাকে সেই মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিলো’’

এমিলি তাঁর চিঠিতে গোটা বিষয়টিকে অবশ্য বেদনার বলেই উল্লেখ করে গেছেন। পাশাপাশি এও বলেছেন,‘‘হয়তো আমাদের দুজনের বৈবাহিক সম্পর্ক হলে সেটা হয়তো বেদনাকেই ডেকে আনতো আবার’’।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্র ও ছবিঃ দ্য গার্ডিয়ান, গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]