চিঠি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

ফারহানা নীলা

কুয়াশাজড়ানো সকাল। লেপের ভেতর গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকার মজাই আলাদা। কেউ যদি এক কাপ ধোঁয়া ওঠা দুধ চা দিতো! আহ্!  ভাবতেই আরাম লাগছে। মফস্বল শহরে শীতের প্রকোপ খুব বেশী। আর পুরোনো আমলের বাসায় চারিদিক খোলামেলা। বাতাস হু হু করে ঢোকে। উত্তুরে হাওয়ার আগ্রাসী থাবা।  জানালার কাঠগুলো ফাঁক হয়ে আছে। শত চেষ্টা করেও ঠিকমত লাগানো যায় না। দরজার নীচেও আধাহাত ফাঁক। পাপোস, পুরোনো কাপড় দিয়েও কাজ হয় না। জানালাগুলোতে বিশাল বিশাল কাঁথা ক্লিপ দিয়ে সেঁটে রাখা।
তিতুন বেশ ক’মাস এই বাসাতেই। এই বাসাটা সব সময় ডাকতো আয় আয়। তিতুন যেখানেই থেকেছে এ যাবৎ কাল…  এই বাসাটিকে কখনো ভুলতে পারেনি।
দরজায় কেউ কড়া নাড়ছে। এত সকালে কে এলো আবার! তিতুন গজগজ করতে করতে লেপের ওম থেকে বের হয়। ওরে বাবা হিহি কাঁপন! বেসরিক কেউ কড়া নেড়েই চলেছে।

ঘড়ির দিকে অবাক তাকিয়ে থাকে তিতুন। সকাল সাড়ে এগারোটা বাজে। শুয়ে থেকে বোঝাই যাচ্ছিলো না যে এত বেলা হয়েছে।

…. চিঠি আছে,চিঠি। ডাকপিয়ন এবার জোরেশোরে বলছে।
তিতুন দরজা খুলে দেয়। তাকে চিঠি লেখার মত কেউ তো আর নেই এখন! বাবা মারা যাবার পর শোকে শোকে মা বিছানা নেয়। তারপর মাও চলে গেলো।  বন্ধু ছিলো কিন্তু তিতুন আর যোগাযোগ রাখেনি তাদের সঙ্গে।  ভাইটা জীবনেও একটা চিঠি লেখেনি। তবে….

শীতে হাতটায় কোনো বোধ নেই মনে হয়। ডাকপিয়ন চিঠিটা বাড়িয়ে ধরে। তারপর কাগজটা এগিয়ে দেয়। তিতুন সই করে চিঠিটা নিয়ে দরজা বন্ধ করে।

বারান্দায় খাবার টেবিল। মাত্র দুটো ঘর বাসায়। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বাতাস আসছে। তিতুন চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে আছে। একটুও শীত লাগছে না আর!

কতটা সময় চলে গেছে  খেয়াল নেই। দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে হেলে পড়ছে। তিতুন চিঠিটা খুলছে।

তিতুন, মানিক আমার,
জানি চিঠিটা পেয়ে তুমি খুব অবাক হবে। আর সেটাই হবার কথা। শুধু নিজেকে বাঁচাতে লিখছি তোমায়। মনঃপীড়া বড় সাংঘাতিক তিতুন। আমি ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাই। জানি ক্ষমা চাওয়ার যোগ্যতাও হারিয়েছি আমি!

আমার কাছে তোমার অনেক কিছু ছিলো,আছে। ওগুলোর ভার আর বইতে পারছি না।  আমাকে মুক্ত করো তিতুন।

ভালবাসি কথাটা এতটাই খেলো মনে হয় আজকাল! ভালবাসি কথাটা বলতেই লজ্জিত হই আমি।

তবে এটা বিশ্বাস করো…. তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই, কেউ ছিলো না কখনো! অলীক কিছু নিয়ে আমরা কেবল সময় নষ্ট করেছি।

তিতুন খুব শীত পরেছে। তুমি গুটলি পাকিয়ে লেপের ভেতর? টের পাও আমিও আছি জড়িয়ে,আছি ছড়িয়ে তোমায় ঘিরে!

…. চিঠিটা আর পড়তে পারে না তিতুন। চোখ জ্বালা করে।সব ঝাপসা হয়ে আসে।
তিতুনের খুব কান্না পায়,খুব। তিতুন কেঁপে কেঁপে কাঁদছে।
চিঠির ভেতর থেকে কয়েকটি শিউলী ফুল, পাখীর পালক, বটের কংকাল মাটিতে পড়ে আছে।

আবীরের সঙ্গে খুব সুন্দর সময় কাটছিলো।  তিতুন আর আবীর সংসারে স্বামী স্ত্রীর চাইতে বন্ধু ছিলো বেশী। আবীরের সঙ্গে খুনসুটি,  বেড়ানো, মুভি দেখা, গল্প করা, শপিং করা,দুজন মিলে রান্না করা….. সব মিলিয়ে বেশ সুখ সুখ জীবন। তিতুন অফিস থেকে ফেরে, আবীরের জন্য অপেক্ষা করে। আবীর এলে একসঙ্গে চা খায়। আর সারাদিনের জমানো গল্পের ডালি খোলে।  বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা চলে ছুটির দিনে।

….. আবীর জানো!
…. কি! বলো। তিতুনের দিকে তাকায় আবীর।
…. আমার একবার বাড়ি যেতে হবে। পুষ্প ডেকেছে।  খুব জরুরী। কথাগুলো বলে তিতুন চুপ করে থাকে।
… বাহ্ বেশ তো! চলো আমিও যাই। বেড়ানোও হবে,কাজও হবে। অফিস থেকে দুইদিন ছুটি নেই চলো। আবীরের কথাগুলো হাওয়ার সঙ্গে ভেসে যায়।
… নাহ্ আবীর। আমি একাই  যাবো। পুষ্প কোনো ঝামেলায় জড়িয়েছে।

পুষ্প তিতুনের ছোটবেলার বন্ধু।  খুব হাসিখুশী মেয়ে। কিন্তু ওর জীবনটা কেমন জানি হয়ে গেলো! বিয়ে করেছিল যাকে সেই ছেলেটা আসলে মানসিক রোগী। প্রতিদিন মারতো পুষ্পকে। প্রতিরাতে রেপ হতো পুষ্প। মার খেতো আর রেপ হতো,রেপ হতো আর মার খেতো। প্রথমটায় মানিয়ে নিতে চেয়েছিল পুষ্প, চেষ্টাও করেছিল।বিবাহিত জীবনে একটা মেয়ে যে কতবার ধর্ষিত হয়, সমাজ যদি জানতো!
একসঙ্গে থাকতে থাকতে পুষ্পও বোধ করি মানসিকভাবে অসুস্থ হতে থাকে।
বাচ্চাটা পেটে আসার পর মানুষটা জোড় করে নষ্ট করালো। একটা মায়ের মৃত্যু হলো সেদিনই।  পুষ্প চলে এলো একেবারে! মানুষটা কোনোদিন পুষ্পর খবরও নেয়নি।

তিতুন খবর পেয়েছে পুষ্প আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলো। তিতুন খুব বুঝতে পারে ডাক্তার দেখানো খুব জরুরী।  পুষ্পর ক্ষত অনেক গভীর!
আবীরকে সব বলে তিতুন। আবীরকে জড়িয়ে খুব কাঁদে।
…. আবীর আমি পুষ্পকে আনতে যাচ্ছি। নিয়ে আসবো ওকে। তারপর ডাক্তার দেখাবো। ওকে তো বাঁচাতে হবে। ছোট বাচ্চার মত কাঁদছে তিতুন। আবীরের ছোঁয়া বলে দেয়… আনো তবে!

কিছুতেই আসবে না পুষ্প। পুষ্পর এত সুন্দর মুখটা মনে হয় পুড়ে গেছে। ভাবলেশহীন তাকিয়ে আছে পুষ্প। অনেক বুঝিয়ে সঙ্গে নিয়ে আসে তিতুন।

প্রতিরাত জেগে থাকে পুষ্প। পায়চারি করে। বিড়বিড় করে কথা বলে। ডাক্তারের ওষুধ খাচ্ছে।  আজকাল একটু থিতু হয়েছে পুষ্প।
পুষ্পকে বেশ সময় দিতে হয়। অফিস থেকে ফিরে  আবীরের সঙ্গে আর আগের মত বসা হয় না, কথা হয় না।

তিতুনের এখন সময়ের বড় অভাব।
অফিস থেকে ফিরে পুষ্পকে দেখে খুব খুশী লাগে তিতুনের আজকাল। পুষ্প আবার একটু সাজগোজ করে, রান্নাঘরে যায়। তিতুন ফেরার আগেই চায়ের পানি চুলোয় দেয়। বেশ স্বাভাবিক সব।
আবীর,তিতুন,পুষ্প ঘন্টার পর ঘন্টা  আড্ডা দেয়। আবীর সারাক্ষণ পুষ্পকে খেপায়! তিতুন মিটমিট হাসে।

অফিসের কাজে তিনদিনের ট্যুর কক্সবাজারে।  তিতুন প্লেনের তিনটা টিকিট কেটে চমকে দেয় আবীরকে। খুব মজা হয় সেবার কক্সবাজারে।

তিতুন ভেবে পায় না আবীর না পুষ্প…. কে কার প্রেমে পরলো! তিতুন পরিবর্তন বুঝতে পারে। কিছু বলতে পারে না। আবীর আর পুষ্প বাগানে গল্প করছে। অফিস ফিরে তিতুন বিছানায় শুয়ে আছে। আবীরের খেয়ালও হলো না তিতুনের শরীর না মন খারাপ! তিতুন নিজেকে ছোট ভাবতে শুরু করে। ছিঃ ভুল ভাবছি না তো!

পুষ্পর মাতৃত্ব আবার জেগে ওঠে। মাংসাশী প্রাণী কখনো মাংসের স্বাদ ভোলে না। আবীরের শরীরও কথা বলতে শুরু করেছে। পুষ্পর তিনমাস মাসিক বন্ধ। তিতুন সব শুনে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। আল্ট্রাসাউন্ড করে দশ সপ্তাহের প্রেগন্যান্সির রিপোর্ট পায়।
তিতুনের বিয়ে হয়েছে প্রায় পাঁচ বছর। মা হওয়া হয়নি। চিকিৎসা চলছে ইনফার্টিলিটির!

তিতুন সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করে না। সব গুছিয়ে চলে আসে। আবীর বা পুষ্প কেউ কোনো কথা বলেনি সেদিন। শুধু তিতুনের নিজের উপর খুব ঘেন্না লেগেছিলো! খুউব ঘেন্না! আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খুঁজেছিল কি নেই তার,যা পুষ্প’র আছে?

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]