চিয়ার্স …চলো যাই… এক

সংঘমিত্রা রায়চৌধুরী দাসগুপ্ত

এই দু-চার আনার ছাপোষা জীবনও মাঝেমাঝে হা-হা করে হেসে উঠে ‘চিয়ার্স’ বলে পিঠ চাপড়ে দেয়। সমস্ত না-পারাকে হঠাৎ-আলোর-ঝলকানির মত তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে সেই মুহূর্ত-প্রহর-দিনগুলো এক আলোকবৃত্ত তৈরি করে চারপাশে। দিনগুলো পেরিয়ে এলে বাইরের আলোটা আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে আসে বটে, তবু নিজের ভিতরে কোথাও না কোথাও একটা নিবাত নিষ্কম্প শিখা থেকেই যায়।হতাশা, ব্যর্থতা, লাঞ্ছনার নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে সে পথ দেখায়, কানে কানে বলে ” তুমি পেরেছিলে, তুমি পারবে”। নিয়মের নিগড়ে বাঁধা একরৈখিক জীবনে দু-দন্ড থমকে দাঁড়িয়ে, একটু শ্বাস নিয়ে মনে মনে আরেকবার যাপন করে নিই সেই দিনগুলোকে।

এত পর্যন্ত পড়ে যারা ভাবছেন বুঝি কোনো মহৎ কম্ম করে ফেলেছিলাম কোনোদিন, যার ঢক্কানিনাদে আপনাদের কর্ণপটাহ বিদীর্ণ করে লাইক- কমেন্টসদৃশ কিছু ডিভিডেন্ড আদায় করাই আমার একমাত্র উদ্দেশ্য, তারা মোটেও ঠিক ভাবছেন না; অবশ্য ভুলও ভাবছেন না পুরোপুরি। আর ঠিক নয় এইজন্য যে এমন কোনো মহৎ কাজ এখনো করে উঠতে পারিনি যার জন্য একটি মানুষও আমাকে মনে রাখবে। এ আমার ব্যক্তিগত অর্জন।

নেপালের অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প(১৩,৫৫০ ফিট/৪১৩০মিটার) আরোহণ যেকোনো মাঝারিমানের পর্বতপ্রেমী আরোহীর কাছে হয়তো বা ‘বাঁয়ে হাত কা খেল’, কিন্তু ইশকুলের পি.টি.ক্লাসের বাইরে কস্মিনকালেও সেভাবে খেলাধুলো শরীরচর্চার ধার না মাড়ানো একটি ব্যক্তি,হাই অলটিচিউড ট্রেকিং ব্যাপারটা যার কাছে কয়েকবছর আগেও প্রায় বাঙ্গি জাম্পিং বা ডিপ সী ডাইভিং অথবা বুলফাইটিং-এর সমতুল ছিল, মধ্যতিরিশ পার করে এরকম একটি ট্রেক-এ যেতে রাজি হলো কেন সেটা আগে একটু বলে নিই।

২০০০ সালের নভেম্বর মাস থেকে যে ভদ্রলোকের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে বসবাস করতে শুরু করি তিনি আবার যৌবনের শুরুতেই ‘তুঁহু মম মনপ্রাণ হে’ বলে সমস্ত সমর্পণ করে বসে আছেন পাহাড়ের পায়ে। বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ একদিন নিজের বাড়িতেও না জানিয়ে লাদাখ পাড়ি দেন দেড়মাসের জন্য, ফলে তাঁর হবু শ্বশুরমশাই তখন থেকেই একমাত্র কন্যার ভবিষ্যৎ দুর্গতি সম্বন্ধে নিঃসংশয় হয়ে যান। বেড়াতে যাওয়ার কথা উঠলে সমুদ্রপৃষ্ঠের অন্তত হাজার দুয়েক উর্ধ্বে অবস্থান না হলে সেই জায়গার কোনো অস্তিত্বই নেই এনার ব্যক্তিগত মানচিত্রে। আমি পুরী বললে উনি পিন্ডারি-র কথা বলেন, মহাবলীপূরম যাওয়ার আবদার করলে ওনার ভোট মানালী-র দিকে, বর্ষশেষের গোয়ার চেয়ে দুর্গম গো-চালা ওনাকে বেশি টানে।এইসব টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে বছর দশেক পার করে দিয়ে অবশেষে উনি আমাকে একটা ছোট্ট ট্রেকে যেতে রাজি করালেন। বাঙালী ছেলেপিলে সারাজীবনে একটিবার ট্রেক করলেও যেখানে যায়, সেই সান্দাকফু।২০১০- র ২৫ মে, মদন তামাং-এর শেষকৃত্যের দিন, আত্মীয়, বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী সব্বার সাবধানবাণী অগ্রাহ্য করে, পৌঁছুলাম মানেভঞ্জন।তারপর ৬ দিনের ট্রেকে ভারতীয় টীম বলতে শুধু আমরা ৬জন। সে গপ্পো পরে কখনো হবে।

ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলে-ফেলা কাঞ্চনজঙ্ঘা, অকৃপণ প্রকৃতি, রকমারি পাখপাখালি, থমথমে পরিবেশ, সর্বোপরি উদ্ধত শাখার শিখরে রডোডেন্ড্রনের গুচ্ছ… সব মিলিয়ে সান্দাকফু আমার কাছে একটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা ; হেঁটেও ছিলাম স্বল্প আয়াসে, মনের আনন্দে। কিন্তু মুশকিলটা হলো, এর পরে আমার কেমন একটা প্রত্যয় জন্মালো যে ট্রেকিং ব্যাপারটা যদি অ্যাত্তোই সহজ, আগে করিনি কেন? আর ভবিষ্যতে করতেই বা আটকাচ্ছে কে? ফলে এর বছরদুয়েক পরে যখন অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প যাওয়ার কথা ঘোষিত হলো যখন নিছক কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম ভেবে নয়, মনের আনন্দেই মেনে নিয়েছিলাম। উপরন্তু, এই ট্রেকটিও নাকি প্রায় সান্দাকফুরই সমতুল এবং আমি ‘নাচতে নাচতে’ এই পথ পেরিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখি প্রভৃতি তৈলসিক্ত বাক্যচয়নে আমাকে যে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত পথে চালিত করা হয়েছিলো,বক্তার মতে তা নাকি আমাকে ‘সাহস দেওয়ার জন্য’ যদিও এই ‘ভোকাল টনিক’ পরে বহুগুণিত হয়ে ‘ভোকাল অ্যারো’ রূপে যে ফেরত গিয়েছিল বক্তার কাছে, সে প্রসঙ্গ এখানে অবান্তর।

ছ’বছর আগের কথা,কোনোদিন লিখবো বলে ভাবিওনি,এবং স্বীয় স্বভাবানুযায়ী, ডাইরীও মেইন্টেন করিনি; আমাকে যারা জানে, তারা জানে ছ’মাস তো দূরের কথা, এমনকি ছ’দিন আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার খুঁটিনাটিও অবলীলায় ভুলে যাওয়ার বিরল ক্ষমতা রাখি আমি। তাই আদর করে যে আমাকে ‘লেডি গজনী’ নাম দিয়েছে, সেই পাপড়ি চৌধুরী আমার এই লেখার অনুপ্রেরণা। কেন, কিভাবে সেই গোপন কথাটি আমাদের দুজনের মধ্যেই থাক,আপনাদের জেনে কাজ নেই। আর যে খুঁটিনাটি তথ্যাদির জোগান না দিলে, লেখাটা তৈরীই হতো না, সে আমার আদরের ভাগ্নী রুনি( অরুনিমা), উক্ত ট্রেকে আমার অন্যতম সহযাত্রী । সেধে দাঁত-খিচুনি খাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই আমার, ফলে এদের দুজনকেই আনুষ্ঠানিক ধন্যবাদ জানানো থেকে বিরত থাকলাম।

২০১২- র দুগ্গাপুজোর একাদশীর দিন এই গপ্পের শুরু। সেবছর পুজোর প্রতিটি দিন আমাদের ‘শ্রী’-র অনুষ্ঠান ছিলো সল্টলেক-নিউটাউনের বিভিন্ন মন্ডপে। ‘শ্রী’ আমাদের আবৃত্তির দল শুধু না, আমাদের ( স্বপ্না দি, দীপান্বিতাদি, শ্রাবন্তী এবং এই অধমের) যৌথ স্বপ্নও, মাইক্রোফোনের পেছনে হোক বা স্টেজ থেকে বহু দূরে, স্বপ্নটা আমরা দেখে চলি অবিরাম। আর অনুষ্ঠান মানে তো শুধু সাজুগুজু করে মঞ্চে উঠে দাঁড়িয়ে পড়া নয়, দীর্ঘদিনের ভাবনাচিন্তা, তর্কবিতর্ক, মহড়া, যন্ত্রানুষঙ্গীদের সঙ্গে আলোচনা… এই সবকিছুই থাকে একেকটি অনুষ্ঠানের পেছনে।পুজোর আগে টানা দু-আড়াইমাস অবিরত এই ধ্বনিময় সমুদ্র-সফেনে সাঁতার কেটে কেটে ট্র‍্যাকস্যুট- উইন্ডচিটার- পাওয়ার জগার ইত্যাদি আবশ্যিক জিনিসপত্র সওদা করা ছাড়া অন্য কোনোরকম প্রস্তুতি নিতে পারিনি, বলাই বাহুল্য। সকাল-সন্ধে দু-চক্কর হাঁটাটুকুও নয়, কারণ আমার তো তখন স্থির প্রত্যয় যে সান্দাকফু যেতে পেরেছি যখন অত স্বল্প-আয়াসে, অন্নপূর্ণা আর এমন কি ব্যাপার? ‘নাচতে নাচতে’ পৌঁছে যাব।রীতিমত স্ফীতকায় আত্মবিশ্বাস যাকে বলে আর কি!

বিজয়া দশমীর পরদিন,বড়ো ঘড়ির নীচে জড়ো হলাম সব্বাই;সল্টলেক থেকে আমরা তিনমূর্তি, কোন্নগর থেকে রুনি( ভাগ্নী)-দোলন(ভাগ্নে)-মৌমিতা(ভাগ্নে-বৌ) আর মধ্যমগ্রাম থেকে মৈনাক( ভাসুরপো)। দিন– আষ্টেকের ট্রেক সহ মোট প্রায় পনেরো দিনের ট্রিপ, সুতরাং, রুকস্যাক- ন্যাপস্যাক- সুটকেসে ছয়লাপ আমাদের চারপাশ। বিকেল ৩:৪৫ এ মিথিলা এক্সপ্রেস ছাড়লো, এবং সাত জার্মান একত্রিত হলে যা হয়,ডানহাত এবং মুখ একসঙ্গে বিশ্রাম পেলো না একটিবারের জন্যও। হয় হা-হা-হি-হি-হো-হো অথবা কচমচ- কুড়মুড়-কটকট-সুড়ুৎসুড়ুৎ। বকবকিয়ে ক্লান্ত হয়ে গেলে খেতে খেতে বিশ্রাম,খেয়ে এনার্জি সঞ্চয় করে আবার নতুন উদ্যমে খিল্লি।

পরদিন সকাল ন’টার আশেপাশে পৌঁছুলাম রক্সৌল। বিহারের চম্পারণ জেলায় অবস্থিত রক্সৌল নেপাল সীমান্তের ছোট কিন্তু খুব ব্যস্ত একটি শহর। স্টেশন থেকে বেরিয়ে নোংরা, ছিরিছাঁদহীন চারপাশটি দেখেই মনটা তিতকুটে হয়ে গেল। কালবিলম্ব না করে টাঙ্গা ভাড়া করা হলো দুখানা,লটবহর-সহ নিজেরা চেপে বসে রওনা দিলাম নেপালের সীমান্তশহর বীরগঞ্জের দিকে।ছেলেবেলায় আমার প্রথম কোলকাতার বাইরে বেড়াতে যাওয়া মধুপুর…. হ্যাঁ, সেই পাহাড়িয়া মধুপুর মেঠো ধূলিপথ।সেখানে গিয়ে প্রথম টাঙ্গায় চড়া, ছেলেবেলার গন্ধ-মাখা ভারি পছন্দের যান এটি আমার। আধ-ঘন্টাটাক লাগলো বিশাল এক তোরণের ভেতর দিয়ে বীরগঞ্জে পৌঁছুতে।

এলেম নূতন দেশে! নেপাল- গৌতম বুদ্ধের দেশ, এভারেস্ট-সহ আট-আটখানা আটহাজারী শৃঙ্গের দেশ, অল্প ক’দিন আগে পর্যন্ত রাজারাজরাদের দেশ, সরল সাহসী অনুগত গোর্খাদের দেশ! কিন্তু ও হরি! রাস্তাঘাট, মানুষজন, চারপাশের দৃশ্য, কিছুই তো পাল্টালো না অ্যাত্তোটুকুও,সবটাই প্রায় প্রকাশ ঝা-র ফিলিম থেকে উঠে আসা টিপিক্যাল একটি বিহারী জনপদের মতই। তফাৎ বলতে ভারতীয় সিমকার্ড থাকার কারণে কারোরই মোবাইলে টাওয়ার পাওয়া যাচ্ছিলো না,পৌঁছ-সংবাদ দেওয়ার জন্য ফোন-বুথ থেকে বাড়িতে করা কলটা আই.এস.ডি. হয়ে গেলো এবং ভারতীয় টাকাকে ১.৬০ দিয়ে গুণ করে তার নেপালী কাউন্টারপার্টের মূল্যমান ধার্য করতে হচ্ছিলো। একটুখানি এগিয়ে রাস্তার ডানপাশে একটাই গুমটি-ঘর, সামনে একটা লড়ঝড়ে সাইনবোর্ড,এখান থেকেই পোখরা যাওয়ার গাড়ি ভাড়া করবো আমরা। মনোপলি যেহেতু, উল্টোপাল্টা দাম হাঁকতে লাগলেন কাউন্টারের ভদ্রলোক; প্রায় গড়িয়াহাটের ফুটপাথের মত দর কষাকষি করে অবশেষে ৭০০০ নেপালী টাকায় রফা হল, গাড়িতে উঠে রওনা দিলাম পোখরার উদ্দেশ্যে।( চলবে)

ছবি: লেখক ও গুগল