চিয়ার্স…চলো যাই…চার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

সংঘমিত্রা রায়চৌধুরী দাসগুপ্ত

মধু-মাখানো টিবেট্যান-ব্রেড যে অ্যাত্তো উপাদেয় চোমরং-এ না গেলে জানতেই পারতাম না। জানতে পারতাম না, পরিস্থিতি বিশেষে প্রভূত খাতিরযত্ন পেলে পৃথিবীর সবচেয়ে ঠ্যাঁটা মহিলাও কেমন ভিজেবেড়ালটি হয়ে যেতে পারে। ডাইনিং হল-এ পায়ের ওপর পা তুলে রুম-হীটারের ওম নিতে নিতে কফি-টফি খাচ্ছি, তুপল গা-ঘেঁষে কাঁদো কাঁদো মুখে বসে আছে (পোলাপান যদ্দিন শুঁয়োপোকা থাকে, বাপমায়ের কপালে এইসব ছিটেফোঁটা সুখ জোটে বৈকি!), রুনি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, বাকিরা উদ্বিগ্ন মুখে ঘিরে বসে আছে…. এমন এক মাহেন্দ্রক্ষণে আমি ঘোষণা করলাম, আমার অ্যাডভেঞ্চারের এখানেই ইতি,সামনের দিন চার-পাঁচেক আমি চোমরং-এর এই ট্রেকার্স হাটেই থাকবো, বাকিরা বেসক্যাম্প থেকে ফিরতি পথে এখান থেকে আমাকে তুলে নেবে। সব্বাই ঘাড় কাত করে একবাক্যে রাজি হয়ে গেল দেখেই আমার সন্দিহান হওয়া উচিৎ ছিলো বটে কিন্তু ওই যে, শরীর জুতের না থাকলে বুদ্ধিও জবাব দেয়, সেটা পরে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম।

চোমরং-এ আমরা আলাদা আলাদা ঘর পাইনি, একটা ডর্মিটরিতে ঠাঁই হয়েছিল পুরো টীমের।এ প্রসঙ্গে একটা স্বীকারোক্তি না করলেই নয়।এই রুটে প্রায় ৮০%-ই বিদেশী অভিযাত্রী,প্রধানত ইউরোপীয়, তবে আর্জেন্টিনা এবং জাপানের দুটো টীমের সঙ্গে দেখা হয়েছিলো পথে মনে আছে।এঁরা খুব ভোরে উঠে হাঁটা শুরু করতেন,নিজেদের মোট অনেকটাই নিজেরা বইতেন, হাঁটার মাঝেমাঝে বিশ্রামও কমই নিতে দেখেছি তাঁদের,উপরন্তু ওঁদের কাছে হনহনিয়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছুনোটাই আসল, পথের মায়ায় ওঁরা বিশেষ জড়াতেন না, ফলে প্রতিদিনই দুপুর বা বিকেলের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছে ট্রেকার্স হাটে সবচেয়ে ভালো ঘরগুলো বুক করে ফেলতেন স্বাভাবিক ভাবেই। অন্যদিকে আমরা, একে মস্ত টীম, তায় অধিকাংশই অনভিজ্ঞ, ফার্স্ট টাইম ট্রেকার, তার ওপর একটি অষ্টমবর্ষীয় বালক ( হাঁটায় যদিও আমাদের অনেককেই টেক্কা দিয়েছিলো, কিন্তু সকালে উঠিয়ে প্রস্তুত করাতেই কালঘাম ছুটে যেতো) এবং তার ট্যালারাম জননীটি, সবমিলিয়ে এক্কেবারে মণিকাঞ্চন যোগ যাকে বলে! ভোররাত্তিরে উঠে সূর্যোদয় দেখে চক্ষু-টক্ষু সার্থক করে আমরা আবার ঘুমিয়ে পড়তাম, ফলে সকালে উঠতে এবং প্রস্তুত হয়ে বেরোতে দেরী, ওই অগণ্য, অফুরান স্বর্গের সিঁড়ি ভেঙে উঠতে দেরী, বিশ্রাম নিতে, পেট ভরাতে, গলা ভেজাতে গিয়ে দেরী, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে দেরী,ছবি তুলতে গিয়ে দেরী, সর্বোপরি হঠাৎ একটা পাখির ডাক বা নদীর বাঁক, প্রজাপতির লাস্য বা পাহাড়চূড়ার লুকোচুরি খেলার মধ্য দিয়ে কোন্ অচেনার পরশ পেয়ে যেতাম, হাঁটার গতি যেত কমে.. ফলে আমরা গন্তব্যে পৌঁছুতাম সবার শেষে, তখন আমাদের কপালে সবচেয়ে খারাপ ঘরটা বা ডর্মিটরি ছাড়া কিছু জোটার কথাও নয়, জোটেও নি একদিনও।

পরদিন ঘুম ভেঙেছে সকালে, আমি তো আর হাঁটবো না সিদ্ধান্ত হয়েই গেছে, ফলে শুয়ে আছি লেপের তলায়, এমন সময় তুপল দুচোখে টলটলে জল নিয়ে নাটকীয়ভাবে ঘোষণা করলো,‘ যদিও বেস ক্যাম্প অবধি যেতে না পারলে আমার খুব দুঃখ হবে, তবু মাম্মাম না গেলে আমিও আর যাব না।’ সেই শুনে ওর বাবা বললো,‘ আমিও কি বৌ-বাচ্চা ছেড়ে শান্ত মনে যেতে পারবো?অথচ বাকিরা নেহাতই অনভিজ্ঞ, আমার ভরসায় অ্যাদ্দূর এসেছে… কী যে করি!!’ বুঝলাম যে ষড়যন্ত্র গভীর,এক্কেবারে দুর্বলতম জায়গাটাতেই ঘাঁ দিয়েছে, তবু নানাভাবে বোঝাতে চেষ্টা করলাম তুপলকে, আমার জন্য পুরো দলের ভোগান্তি হওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয় ইত্যাদি ইত্যাদি, কিন্তু ভবী ভুলবে না বলে নিজেই ঠিক করে রেখেছিল, নাকি ভবীকে সেভাবেই শিখিয়ে পড়িয়ে তৈরী করা হয়েছিলো, সেটা এত বছর বাদেও আমার কাছে রহস্যই রয়ে গেছে।

অতএব, চরৈবতি। আছি ২১৭০ মি উচ্চতায়,৮.৬ কিলোমিটার হেঁটে আজকের গন্তব্য দোভান গ্রাম (২৬০০মি)। তুপলের জেদের কাছে হার মেনে অনেকটা অনিচ্ছা নিয়েই আজ হাঁটা শুরু করেছিলাম, তবে অচিরেই অনুভব করলাম নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলে খুব ভুল হতো। শরীর আজ অনেক ঝরঝরে, সিঁড়িসঙ্কুল পথ আজ আর অত অনতিক্রম্য মনে হচ্ছিল না। গত দু’দিনের ট্রেক উলটে পালটে নিঙড়ে আছড়ে রগড়ে পথের যোগ্য করে তুলেছে আমাকে, নাকি দলনেতার নির্দেশমত আজ থেকে অলটিচিউড সিকনেসের জন্য ডায়ামক্স ২৫০ খেতে শুরু করেছি বলে, তা জানি না, তবে আকাশ আজ আরো গাঢ় ফিরোজা, মুখোমুখি হওয়ামাত্র স্থানীয় নেপালী গ্রামবাসীদের ‘নমস্তে’ সম্ভাষণ আরো উষ্ণতাময়, পাহাড়চূড়ায় বরাভয়মুদ্রা, নদীস্রোতে মধুর নিক্কণ, ঘাস-ফুল- পাখি-প্রজাপতি সবাই ফুর্তিতে মশগুল।এ পথে বড় বড় ঘাস,ওক, বাঁশগাছ আর কিছু ঝোপঝাড় ছাড়া ভেজিটেশনের তেমন বৈচিত্র‍্য নেই, তবে রকমারি পাখি আর পতঙ্গ, বিশেষত প্রজাপতি, সেই অভাব ভুলিয়ে দেয়। আর কিছুদূর অন্তর ছোট্ট ছোট্ট ছবির মত গ্রাম, মেয়েরা রাস্তার ধারে কাপড় কাচছে, মেলছে, কেউ বা চা- স্যুপ বানিয়ে বিক্রি করছে অন্নপূর্ণা- যাত্রীদের।

রাস্তায় সিনুয়া নামে ছোট্ট গ্রাম,স্থানীয় দেবীর একটি মন্দির আছে এখানে,এবং সে কারণেই এখান থেকে শুরু করে বেসক্যাম্প অবধি বাকি ক’দিন পাঁঠা-মুরগী-গরু-শুয়োর-মোষ-ছাগল ইত্যাদি খাদ্যসম্ভার এক্কেবারে বর্জনীয়,রাস্তার ধারের শ্যাকই বলুন বা ট্রেকার্স হাট কোত্থাও মিলবে না এইসব ‘তামসিক’ আহার্য বস্তু, ভোজন/ অর্ধভোজন কোনোটারই সুযোগ নেই। বাকিগুলো মেনে নিলেও চিকেনের বিরহে কাতর হয়ে তুপলের হাঁটার উৎসাহ এবং গতি দু’টোই একধাক্কায় প্রায় তলানীতে আসার জোগাড়।

আজকের হাঁটায় চড়াই-উৎরাই প্রায় সমান-সমান।দুপুর নাগাদ আমরা বুঝতে পারলাম যে দোভান পৌঁছুতে সন্ধ্যে হয়ে যাবে, ঘর পেতে সমস্যা হবে, ফলে আরেকটু আগে(৭.৫ কিলোমিটার)ব্যাম্বু (২৫০০মিটার)গ্রামে আজকের মত রাত্রিবাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। মোদিখোলার কোলঘেঁষে অবস্থিত এই গ্রামটির নামকরণের কারণ এই অঞ্চলে বাঁশঝাড়ের ঘন উপস্থিতি।

ব্যাম্বুতে যখন পৌঁছুলাম, তখনো বিকেলের আলো নেভেনি। নদীর বুকে বেশ ছায়াসুনিবিড় গ্রাম ব্যাম্বু,ট্রেকার্স হাটের পেল্লাই উঠোনে বসে এক স্থানীয় যুবককে মোবাইল-কানে অনেকক্ষণ ধরে গপ্পো করতে দেখে হঠাৎ খুব মনখারাপ করতে লাগলো বাড়ির জন্য। ওই যুবকের কাছে ফোনবুথের খোঁজ করতে নিজের মোবাইলটাই এগিয়ে দিল,আমার আপত্তি একটুও কানে না নিয়ে বাধ্য করলো সেখান থেকেই বাড়িতে ফোন করতে। কিন্তু অভাগা আমি,বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর লাইনটা লাগার সঙ্গে সঙ্গে উদগ্রীব উৎসুক উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে ভেসে এলো,’ কী রে, তুপল কেমন আছে?’; মেয়ে না, জামাই তো নয়ই, শুধু নাতির খবর পেয়েই নিশ্চিন্ত!!

আবহাওয়া কিঞ্চিৎ স্যাঁতস্যাঁতে ,তাই সন্ধ্যে হতেই স্লিপিং ব্যাগ টানছিলো অমোঘ আকর্ষণে।ফলে ডিনার সেরে নিলাম বেশ তাড়াতাড়ি। খাচ্ছি প্রধানত নিয়মরক্ষার খাতিরে, কোনোরকমে পেটটুকু ভরানোর জন্য। উচ্চতা যত বাড়ছে, খাবারের দাম যে পাল্লা দিয়ে বাড়বে, সে তো জানাই ছিল,রান্নার গ্যাস থেকে শুরু করে সমস্ত কাঁচামালই নীচে থেকে বহন করে আনতে হলে সেটা অস্বাভাবিকও কিছু নয়, তাছাড়া এ পথে আমাদের মত পোড়া তৃতীয় বিশ্বের যাত্রীর সংখ্যা বেশী নয়, অধিকাংশই ইউরোপ-আমেরিকা থেকে আগত অভিযাত্রী। তবে উচ্চতার সঙ্গে খাবার-দাবারের বৈচিত্র‍্য আর স্বাদের যে এমন ব্যাস্তানুপাতিক সম্পর্ক হতে পারে, সেটি মোটেও জানা ছিল না। একে আমিষের ছিটেফোঁটা নেই, তায় মোটা মোটা রুটি, আলুনী মিক্সড ডাল আর স্কোয়াশ/সয়াবীনের বিস্বাদ তরকারী ছাড়া অন্য কোনো পদ মেলা ভার। ভারী ব্রেকফাস্ট করে বেরোতাম, সারাদিন ধরে চা-স্যুপ আর সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া কাজু-কিশমিশ- খেজুর-আমসত্ত্ব- টফি, আর সন্ধ্যেয় ফিরে ওই রুটি-ঘ্যাঁট।

পরদিন যাব হিমালয় হোটেল (২৯২০মিটার)। উচ্চতাজনিত অসুস্থতা-প্রবণ এলাকায় ঢুকছি আস্তে আস্তে, ফলে আরো বেশি করে অ্যাক্লেমাটাইজ করতে হচ্ছে নিজেকে, আবহাওয়ার সঙ্গে; খানিক চড়াই ভেঙে ওঠা, সেই উচ্চতায় একটু ঘোরাফেরা করে আবার নীচে নেমে এসে সেখানেই রাত্রিযাপন, এই প্রক্রিয়ার অন্যতম থাম্বরুল।

ব্যাম্বু থেকে হিমালয়… এই পথে আলাদা করে বলার মতো কিছু নেই, সেই সিঁড়ি,সেই মোদিখোলা, সেই ঝকঝকে আকাশ, আর সেখান থেকে উঁকি দেওয়া সকল ক্লান্তি-হরা তুষারাবৃত সেই অন্নপূর্ণা- মচ্ছপুছারে- ধওলাগিরি- হিমচুলি।তফাৎ বলতে গাছপালা কমে আসছে, ঘাসের আধিক্য শুরু হচ্ছে।

হিমালয় হোটেলে পৌঁছে সব্বাই খুব উত্তেজিত, প্রায় চলে এসেছি গন্তব্যে। আগামীকাল দীর্ঘ পথ হাঁটা, মচ্ছপুছারে বেস-ক্যাম্প (৩,৭০০মিটার) হয়ে অন্নপূর্ণার পদপ্রান্তে( ৪,১৩০মিটার), মোট ১,২১০মিটার বর্ধিত উচ্চতায়।

বিকেলের আলো থাকতে পৌঁছুতে হবে, তাই বেশ সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে পড়লাম আজ। হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে ঠান্ডা হাওয়া, সোয়েটার-উইন্ডচীটার চড়িয়ে কিছুদূর হাঁটতে না হাঁটতেই ঘাম ঝরতে লাগলো। একটা ভাঙাচোরা সাঁকোর ওপর দিয়ে খরস্রোতা নদী পার হলাম।রাস্তায় একটা গুহা পড়লো,আমি আর দীপক ঢুকে বেশ খানিকদূর অবধি দেখে এলাম। এই পথে গাছপালা নেই মোটে, শুধু লম্বা লম্বা বাদামী ঘাস, যেন আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে কেউ। স্বস্তির কথা, আজ আর সিঁড়ির পর সিঁড়ি নেই রাস্তা জুড়ে,গত কয়েকদিন ধরে স্বপনে-শয়নেও শুধু সিঁড়ি দেখতে পাচ্ছিলাম আর আতঙ্কে চমকে চমকে উঠছিলাম, অবশেষে আজ মুক্তি।দুপুরের আগেই পৌঁছে গেলাম মচ্ছপুছারে বেস-ক্যাম্প। মাছের ল্যাজের আকৃতির শৃঙ্গ, ইংরেজি নাম মাউন্ট ফিশ টেইল। প্রায় সাতহাজারী( ৬,৯৯৩মিটার) এক শৃঙ্গের বেসক্যাম্পে বসে চা খাচ্ছি, ভাবতেই শিহরণ জাগছিল মনে। তখন কি ছাই বুঝেছি,শিহরণের আরো বহু বাকি আছে…।

একটু জিরিয়ে আবার হাঁটা শুরু করেছি, এবার একটু একটু ক্লান্ত লাগছে,ফলে গতিও কিঞ্চিৎ কমে গেছে, বাকিরা ছাড়িয়ে চলে গেছে, দীপক শুধু আমাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য রয়ে গেছে। সামনে পিছনে দৃষ্টিসীমার মধ্যে জনপ্রাণী নেই, এমনকি একটা পাখি বা প্রজাপতিও চোখে পড়ছে না, হঠাৎ কান-ফাটানো একটা আওয়াজ,তাৎক্ষণিকভাবে মনে হলো কোনো শৃঙ্গ বুঝি ভেঙে পড়লো মাথার ওপর। দূরে তাকিয়ে দেখি অন্নপূর্ণা পর্বতমালার কোনো একটি শৃঙ্গ থেকে সাদা মেঘের মত কি যেন নেমে আসছে নীচে, চারদিক যেন ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে। আমার গলা থেকে স্বর বেরোচ্ছে না,স্থানু হয়ে আছি, দীপক কোনোক্রমে বললো,’ অ্যাভালাঞ্চ্!’

(চলবে)

ছবি: সুম্যায়া সেনগুপ্ত

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]