চিয়ার্স …চলো যাই… তিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সংঘমিত্রা রায়চৌধুরী দাসগুপ্ত

নয়াপুল থেকে ঘান্ড্রুক যাওয়ার পথে দেখা হয়েছিল নৃত্যকুশলা কিশোরী মোদিখোলার সঙ্গে। না, ইনি আমাদের অধুনা প্রধানমন্ত্রীর হঠাৎ-আবিষ্কৃত কোনো আত্মীয়া নন, নেপালীতে ‘খোলা’ শব্দের অর্থ নদী। কালিগন্ডকীর অন্যতম এই শাখানদীটিতে র‍্যাফটিং এবং কায়াকিং হয়,এবং একে কেন্দ্র করে ‘মোদিখোলা হাইড্রো-পাওয়ার স্টেশন’ নামে একটি জলবিদ্যুত প্রকল্পও গড়ে উঠেছে।

সাঁকোটা দুলছে

কিছুদূর অবধি হাত ধরাধরি করে মোদিখোলাকে সঙ্গ দিয়েছে গাড়ী-চলা রাস্তা। আর আছে প্রচুর ধানক্ষেত।বেশিরভাগ পাহাড়ী অঞ্চলের মতই ধাপ-চাষ হয় এখানে।পায়ে- হাঁটা রাস্তার ধারে ধারে কিছুক্ষণ পরপর মালকিন-পরিচালিত দোকানঘর, খাদ্যসম্ভার বলতে চা-কফি- ম্যাগী আর রকমারী স্যুপ। মাঝেমাঝেই দাঁড়াচ্ছি চা খেতে,আর দীপক ওর এভারেস্ট বেসক্যাম্প অভিযানে সংগৃহীত সীমিত নেপালী শব্দভান্ডার ব্যবহার করে জিজ্ঞেস করছে,”তপাই কে নাম কে হো?” ( তোমার নাম কি?) বা ” ঘর মা কোই হনু হঞ্চু?” ( বাড়িতে কে কে আছে?) ; আর ওরা যেই সোৎসাহে ঝরঝরে নেপালীতে উত্তর দিতে শুরু করছে, অমনি, ” মুই তপাই কো কুড়া বুঝি না”(আমি তোমার কথা কিছু বুঝতে পারছি না) বলে কোনোরকমে বীরত্বের সাথে পশ্চাদপসরণ করছে।

নয়াপুল থেকে ঘান্ড্রুক প্রায় ৮.৫ কিলোমিটার রাস্তা, ঘন্টাচারেক লাগার কথা পৌঁছুতে।রাস্তাও এখন অবধি বেশ সহজ, সুগম।ঝকঝকে নীল আকাশ, রকমারী ফুল-পাখি-প্রজাপতি, মচ্ছপুছারের সঙ্গে ক্কচিৎ শুভদৃষ্টি আর কলস্বরা মোদিখোলার আবহসঙ্গীত, সব মিলিয়ে গাঢ়তর হতে শুরু করলো রাস্তার সঙ্গে রিস্তা।এর মধ্যেই নুড়ি-পাথর-গাছের গুঁড়ি দিয়ে বানানো একটা সাঁকোয় চড়ে একবার নদী পার হলাম। রাস্তায় স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে দেখা হলেই একগাল হেসে ‘নমস্তে’ বিনিময়, সব মিলিয়ে মেজাজ ফুরফুরে হয়ে আছে।তখনো বুঝিনি এটা শুধু ওয়ার্মিং আপ হচ্ছে, আসল পিকচার আভি ভি বহোৎ বাকি হ্যায়, যার বেশ কিছুটা, অন্তত আমার কাছে ছিলো, র‍্যামসে ব্রাদার্স-মার্কা ছবির চেয়েও রোমহর্ষক।

দুপুরে ধূমায়িত ম্যাগী দিয়ে লাঞ্চ সারলাম। এরপর আস্তে আস্তে চড়াই শুরু হলো।১০৭০ মিটার( নয়াপুল) থেকে ১৯৪০মিটার( ঘান্ড্রুক)-এ পৌঁছুতে হবে আমাদের। কিন্তু এই অঞ্চলে চড়াই মানে যে যতদূর চোখ যায় অসীম অন্তহীন সিঁড়ি শুধু,তা কি ছাই জানতাম!প্রথমে কিছুটা বেশ ফুর্তিতেই যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু গড়ে ফুটদেড়েক উঁচু উঁচু এবড়োখেবড়ো পাথরের ওই সিঁড়িপথ আস্তে আস্তে আমার সমস্ত উৎসাহ ব্লটিং পেপারের মত শুষে নিতে লাগলো। এই প্রথম আমার নিজের উচ্চতা সম্পর্কে অনুশোচনা আর হীনমণ্যতা তৈরি হতে শুরু করলো। দীপককে দাঁত খিঁচোতে খিঁচোতে অবশ্য কিছু অতিরিক্ত ক্যালোরিও খরচ করে ফেলেছিলাম ইতিমধ্যেই।বাঁকের পর বাঁক পেরোই, একেকটা বাঁকের মুখে আশা জাগে এই বোধহয় শেষ, ঘুরেই বুঝি গন্তব্য, কিন্তু হায়!!! আবার সিঁড়ির সারি।

মৌমাছি-চাষ

সব দুঃখেরই শেষ আছে, আমিও ৪ ঘন্টার পথ ৬ ঘন্টায় পেরিয়ে অবশেষে ঘান্ড্রুক পৌঁছুলাম।বাকিরা (আমাকে সঙ্গ দেওয়ার ফলে দীপক বাদে) বেশ কিছুক্ষণ আগেই পৌঁছে গেছে, খাবারের অর্ডার দিয়ে ডাইনিং হলে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।পেটের মধ্যে যেন সমুদ্র-মন্থনের অনুভূতি সক্কলের।এরকম খিদেও যে কারো পেতে পারে এই প্রথম উপলব্ধি করলাম।স্যুপ,নুডলস, রুটি, মাংস, চা… সব মিলিয়ে সেদিনের ওই খাওয়াটা নিছক খাওয়া ছিল না,ওকে বলে গান্ডেপিন্ডে গেলা।বাইরে আকাশ মেঘলা,পীক দেখতে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই,ঠান্ডা হাওয়া হাড় অবধি ছুঁয়ে যাচ্ছে, তার ওপর ক্লান্তিতে সারা শরীর ভেঙে আসছে সবার,ডিনারের অর্ডারটুকু কোনোমতে দিয়ে, টলতে টলতে ঘরে ঢুকে বিছানায় ছুঁড়ে ফেললাম নিজেদের।

ঘুম ভাঙলো যখন, নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে নিজেদের নিঃশ্বাসের শব্দটুকু শুধু পাওয়া যাচ্ছে, টর্চের আলোয় দেখলাম রাত্তির সাড়ে দশটা।খুব একটা খিদে ছিল না কিন্তু ডিনারের অর্ডার দেওয়া আছে, হয়তো বা আমাদের অপেক্ষায় জেগে বসে আছে ডাইনিং হলের কর্মচারীরা, এইসব সাত-পাঁচ ভেবে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে দেখি…ও হরি! খাবার ঘরে তালা পড়ে গেছে। স্বাভাবিক, পাহাড়ের মানুষ ” আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ” নীতিতে চলেন, তাছাড়া বিকেলে অমন রাক্ষুসে খাওয়া খেয়ে আবার যে কেউ ডিনার করতে পারে ওরা বোধহয় কল্পনাও করতে পারেননি।দীপক, মৈনাক, দোলন,রুনি আর মৌমিতা একগ্লাস করে ছাতুর সরবত খেয়ে, টুক করে একবার বাইরে বেড়িয়ে রূপোর থালার মত চতুর্দশী চাঁদটিকে দেখে নিয়ে,আবার ব্যাক টু বেড।

ঘর মা কোই হনু হঞ্চু

পরদিন, ট্রেকের দ্বিতীয় দিন, গোটা ট্রেকের সবচেয়ে ঘাম-রক্ত নিংড়োনো দিনও বটে।হাঁটার উপযোগী জামাকাপড় পরে, যে যার ন্যাপস্যাক গুছিয়ে( রুকস্যাকগুলো সব গণেশদাজুদের হেপাজতে)এক্কেবারে প্রস্তুত হয়ে ব্রেকফাস্ট করতে এলাম। এই হোটেলটার সামনে একটা মস্ত উঠোন। উঠোনে দাঁড়ানো মাত্র একগাল হেসে সুপ্রভাত জানালো অন্নপূর্ণা, পুচ্ছটি নাচিয়ে নড্ করলো মচ্ছপুছাড়ে। ব্রেকফাস্টের সময় আলাপ হল এক প্রবীণ অস্ট্রেলিয়ান ভদ্রমহিলার সঙ্গে, তাঁর একমাত্র কন্যা অন্নপূর্ণার পদপ্রান্তে এক অভিযানে এসে মারা যান, মেয়েকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসে মা-ও ভালোবেসে ফেলেন অন্নপূর্ণাকে,এই ঘান্ড্রুক গ্রামটিকে, এখানকার মানুষকে।এখানেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়ার অভিপ্রায় নিয়ে মেয়ের স্মৃতিতে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলেন এখানকার দরিদ্র মানুষগুলোর জন্য।সেও অনেকবছরের কথা, এখন উনি এদেরই একজন হয়ে গেছেন।

আজকের দিনটি নিয়ে যত কম বলা যায় ততোই ভালো। আজ যাবো চোমরং( ২১৭০মিটার), এখান থেকে মাত্র কিলোমিটার পাঁচেক কিন্তু পুরোটাই খাড়া চড়াই। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুধু সিঁড়ি আর সিঁড়ি, একেকসময় মনে হচ্ছিলো বেসক্যাম্প নয়, মহাপ্রস্থানের পথে রওনা হয়েছি বুঝি। সবারই কষ্ট হচ্ছিল কমবেশি, তুপলের তো একটু একটু জ্বর এসে গিয়েছিল,রাস্তায় একটা দোকানে টম্যাটো স্যুপ খেয়ে সেরে যায় পলকে,কিন্তু আমার কাছে এইদিনটা ছিল এক ঘোরতর দুঃস্বপ্ন। দম আটকে আসছিল মাঝেমাঝে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে, হাঁটু খুলে প্রায় হাতে চলে আসার দশা।মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘাঁ-র মতো, ঘাম হচ্ছে না যেহেতু আর ক্লান্তিতে জল খাচ্ছি ঘনঘন,দু-পা অন্তর অন্তর পেট ফেটে যাওয়ার অবস্থা হচ্ছে সক্কলেরই। ছেলেদের তো চোখ বুজলে দুনিয়াজোড়া

গেরস্থালি

বাথরুম সবাই জানে, কিন্তু এই প্রথম বুঝলাম কাকে বলে ঠেলার নাম বাবাজী।কখনো নরম গলায় কখনো ধমক দিয়ে, ‘যস্মিন দেশে যদাচার’ শীর্ষক লেকচার দিতে দিতে চলছে দীপক আর আমি,লজ্জায় কেঁদে ফেলতে ফেলতেও, খুঁজে বেড়াচ্ছি টিলার আড়াল।ঘান্ড্রুক থেকে চোমরং -এর রাস্তার ধারের প্রতিটি টিলা, ঘাস আর প্রজাপতির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলাম সেদিন মনে মনে।সব্বাই পৌঁছে গেছে তখন চোমরং-এ, আমি আর আমাকে ফেলে যেতে পারছে না বলে দীপক বাদে।সন্ধ্যে নেমে এসেছে, জনমানবশূন্য রাস্তা, রাস্তা কই, শুধুই সিঁড়ি, তার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছি শরীরটাকে টানতে টানতে।শ্রান্তি ছিল অপরিসীম তবে ভয় করেনি কিন্তু একটুও, বোধহয় পূর্ণিমার চাঁদ পথ দেখাচ্ছিলো বলে আর তুপলের কাছে পৌঁছুতেই হবে যত শিগগির সম্ভব মনে করে।অবশেষে পৌঁছুলাম যখন, পরে রুনিরা বলেছে, মুখ নাকি কাগজের মত সাদা, ঠোঁট কাঁপছে থরথর করে, আমাকে দেখে মনে হচ্ছিল অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাব তক্ষুণি।ধপ করে সামনের বেঞ্চিতে বসে পড়েই কোনোরকমে ঘোষণা করলাম আমার ট্রেক এখানেই শেষ, আমি এখন ক’দিন এই হোটেলেই কাটাবো,যদ্দিন না বাকি টীম বেসক্যাম্প হয়ে ফিরে আসে এখানে।বাস্তবে সেটা হলে যে এই লেখাটা লিখে ওঠা হোতো না সে তো বুঝতেই পারছেন।তবে কেন, কার জন্য এই প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করেছিলাম সে গপ্পো পরের দিন হবে’খন।

আমার কাছে গোটা ট্রেকের সবচেয়ে কষ্টকর দিন ছিল ঘান্ড্রুক থেকে চোমরঙের এই পথটুকু।তবে পরে বুঝতে পেরেছি এই ক্লান্তিটুকুও এক অমূল্য সঞ্চয়। জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা। যাতায়াতের বাকি রাস্তাটা আর কখনোই যে তেমন অগম-অপার মনে হয়নি,সে তো এই রাস্তাটা পেরিয়ে এসেছিলাম বলেই। আর মনের এক কোণায়, হয়তো বা নিজের অগোচরেই, যেটুকু অহঙ্কার জমেছিল সেই সান্দাকফুর ফলশ্রুতিতে, সেটাও মাটিতে লুটিয়েছিল নিমেষে; নিজের ক্ষুদ্রতা, অক্ষমতা,অপারগতাটুকু সম্বল করে এভাবেই বোধহয় মাথা নত করে দাঁড়াতে হয় প্রকৃতির বিশালতার পদপ্রান্তে।(চলবে)

ছবি: সৌম্যায়া সেনগুপ্ত

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]