চিয়ার্স …চলো যাই… দুই

সংঘমিত্রা রায়চৌধুরী দাসগুপ্ত

আমাদের ড্রাইভার ভদ্রলোকটির নাম ছিলো জাহির( নাকি জাকির?) খান।গাড়ি চালানোর হাতটি মাখনের মত,গতি ঈশপ-কথিত কচ্ছপটির মতো, পরিণতি প্রতিযোগী খরগোশটির মতো।২৫৭ কিলোমিটার রাস্তা, গলা-ভেজানো, পেট ভরানোর জন্য ইতিউতি থামলেও কোনোমতেই ঘন্টা সাতেকের বেশি লাগার কথা নয়, কিন্তু জাহিরবাবুর কৃপায় বীরগঞ্জ থেকে বেলা সাড়ে দশটা নাগাদ রওনা দিয়ে পোখরা পৌঁছুলাম তখন রাত প্রায় আট-টা। মাঝে একটি ধাবা-জাতীয় দোকানে থেমে লাঞ্চ সারলাম, যেমন রগরগে তার স্বাদ, মেনুকার্ডের মূল্যসারণী দেখে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শরীরজুড়ে বড় বড় ফোস্কা।সাড়ে আট ঘন্টার এই জার্নিতে গাড়ির সাউন্ড সিস্টেমে পর্যায়ক্রমে বেজে চললো দুটিমাত্র গান, বলিউডি ” টিঙ্কু জিয়া” এবং জনপ্রিয় নেপালী পপসঙ্গীত ” হে মোরি কালিনাগোরি, বাতো বাতো কপালো পুড়ি”। কপাল পুড়ে পুড়ে ঝামা, কান ঝালাপালা,অথচ গান বন্ধ করার অনুরোধ করলেই জাহিরদাদার মুখ বাংলার পাঁচ। নিজেদের মধ্যে উনার নাম দিয়ে ফেলা হল ‘টিঙ্কু জিয়া’, ভদ্রলোকের মেজাজটা খানিক খানিক নবাব খাঞ্জা খাঁ টাইপের,প্রশ্ন-টশ্ন,এমনকি নিজেদের মধ্যে বেশি হাসাহাসি করলেও ভুরু-টুরু কুঁচকে ফেলছেন। তুপল ফ্রণ্টসীটে বসে বেশি নড়াচড়া করলে বিরক্তিসূচক আওয়াজ করছেন, আমাদের এদিকে একটানা বসে থেকে সীট-সোর( seat sore) হয়ে যাওয়ার দশা, সেই নিয়ে নিজেরা খিল্লি করছিলাম, বাঁকা চাউনি দিয়ে বললেন, ” আপ মুঝে চকমা দে রাহে হো ক্যা ?”

যাই হোক, সব দু:সহ জিনিসের মত এই যাত্রাটিও একসময় শেষ হল, পোখরায় পৌঁছুলাম আমরা, সব্বার চোখ তখন ক্লান্তিতে বুজে আসছে। লোটাকম্বল নিয়ে বডি ফেলে দিলাম খিমিল দাজুর আস্তানায়।

দীপকের পাহাড়তুতো বন্ধু অরিন্দমদা পোখরায় আমাদের মাথা-গোঁজার আস্তানাটি ঠিক করে দিয়েছিলেন কোলকাতা থেকেই।ফেওয়া লেকের পুবপাড়ে, খিমিল সিনহা-র হোম-স্টে। রাত সওয়া আটটা নাগাদ যখন পৌঁছুলাম সেখানে, উনি তখন মোটামুটি তুরীয় অবস্থায় বিরাজমান, আমরা যে আদৌ আসবো, সে আশাও বোধহয় ছেড়ে দিয়েছেন। তবে, ওই অবস্থাতেও অত্যন্ত উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন, দোতলায় দু’টো সামনে টানা বারান্দাওয়ালা বিশাল বিশাল দুটো ঘর খুলে দিলেন, গরম জলের ব্যবস্থা করলেন না চাইতেই, আর আমরা স্নান-টান করে বেরুতে না বেরুতেই ধোঁয়া-ওঠা কফি আর পকোড়া নিয়ে হাজির ঘরে ঘরে। সেসব সেবা করে, একটু বিশ্রাম নিয়ে সাড়ে ন’টায় বেরোলাম ডিনার সারতে; সেটা তৈরি করে দেওয়ার মত অবস্থাতেও আর ছিলেন না টলটলায়মান বিপত্নীক গৃহকর্তা।স্যুপ, চাওমিন ইত্যাদি গলাঃধকরণ করে ফিরে এসে কোনোমতে নিজেদের ছুঁড়ে দিলাম বিছানায়।

পরদিন সক্কালবেলা ঘুম ভেঙে জানলা দিয়ে বাইরে চোখ যেতেই,আহা, কী হেরিলাম হৃদয় মেলে!ঝকঝকে রোদ্দুরে দূরে রাজেন্দ্রানীর মত অন্নপুর্ণা রেঞ্জ। বিছানায় বসে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলাম কিছুক্ষণ। কাল থেকে হাঁটা শুরু, আজ শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, প্রচুর কাজ। সময় নষ্ট না করে ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম পাশের ‘ফ্যামিলি রেস্টুরেন্ট’-এ,তারপর দীপক আর দোলন গেল খিমিল দাজু( নেপালী দাদা)-র সঙ্গে ওনার পরিচিত ট্যুর অপারেটরের অফিসে, অন্নপূর্ণা কনসার্ভেশন এরিয়ায় ঢুকবো, তার পার্মিট জোগাড় করতে হবে, গাইড এবং পোর্টার লাগবে ট্রেকের দিনগুলোতে, সব দায়িত্ব নিয়ে নিলেন খিমিলবাবু। ওরা তিনজন বেড়িয়ে গেলে আমরা রেস্টুরেন্টের টেরেসে বসে রোদ পোহাতে পোহাতে প্যারাগ্লাইডিং দেখতে লাগলাম।নীল আকাশে ইতস্তত সাদা মেঘের ভেলা আর লাল- হলুদ-সবুজ নানারঙের গ্লাইডারের মেলা।

ওরা কাজকম্ম সেরে ফিরুক, ততোক্ষণ পোখরা শহরটির সম্বন্ধে দু-চার কথা বলে নিই আপনাদের। কাঠমান্ডুর পর, নেপালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই শহরটি গড়ে উঠেছে সুন্দরী ফেওয়া লেককে ঘিরে। ঝকঝকে আকাশ আর ঘষামাজা কপাল থাকলে অন্নপূর্ণা,ধওলাগিরি বা মানাসলু অকস্মাৎ দূর থেকে ওয়েভ করে যেতে পারে আপনাকে।একটা ইন্টারন্যাশনাল মাউন্টেনিয়ারিং মিউজিয়াম আছে এই শহরে যেটি আমরা ট্রেক সেরে ফিরে এসে দেখতে গিয়েছিলাম। আর আছে বিন্ধ্যবাসিনী দেবীর মন্দির,সেটাও ফিরতি পথে দেখেছিলাম। এখানে একটা কথা বলার ছিলো। আমার যদিও ‘নেপাল’ নামটা শুনলে অনিবার্যভাবে কপিলাবস্তু-লুম্বিনী- গৌতম বুদ্ধ মনে পড়ে প্রথমেই,কিন্তু এই সেদিন অবধি, দীর্ঘকাল ধরে,যেহেতু হিন্দুত্ব( রাষ্ট্রীয় ধর্ম) এবং রাজতন্ত্র কায়েম ছিল এ দেশে,এবং রাজার ধর্ম সব যুগে সব দেশেই তোল্লাই পেয়ে থাকে বেশি বেশি, নেপালেও স্বাভাবিকভাবেই হিন্দু ধর্মস্থানের রমরমা। যদিও বছর পাঁচেক আগেই,২০০৭-এ, ব্যাপক গণ-আন্দোলনের ফলস্বরূপ রাজতন্ত্র উৎখাত হয়ে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নেপালের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

শুষ্ক তথ্যের কচকচি ছেড়ে আবার গপ্পে ঢুকি। পার্মিট করিয়ে, গাইড-পোর্টারদের সঙ্গে পাকা কথাবার্তা সেরে ফিরতে ফিরতে দুপুর হয়ে গেল দীপক-দোলনের। তড়িঘড়ি লাঞ্চ সেরে, কালকের স্যাক গুছিয়ে, সোজা ফেওয়া লেক। লেকের চারপাশে একটি চক্কর মেরে, লাইফ জ্যাকেট ভাড়া করে, বোটিং-এর জন্য লাইন দিলাম। বিকেলবেলা, তাই বেশ ভীড়, যাত্রীবোঝাই অনেকগুলো বোট বিচরণ করছিলো লেকের জলে, ফলে পরিষ্কার টলটলে জলে ঢেউ খেলে যাচ্ছিলো টলমল টলমল, টালমাটাল হচ্ছিল নৌকো। ডিঙা ভাসাও-এর পাট চুকিয়ে এবার আমরা রওনা দিলাম মার্কেটের দিকে।পোখরা যেহেতু অন্নপূর্ণা সার্কিটের প্রবেশদ্বার, তাই ট্রেকিং এবং মাউন্টেনিয়ারিং এর মরসুমে কিছু ভারতীয় এবং প্রচুর বিদেশী পাহাড়িয়া মানুষজনের ভীড় লেগেই থাকে এখানে।লেকের পূর্বপাড়টি দোকানপাটে জমজমাট। দোকানে দোকানে নর্থফেস, ম্যামটের ছড়াছড়ি দেখে আমাদের আদেখলাপণা আর দেখে কে!! একটি দোকানে ঢুকে দরদাম করছি, নেপালী দম্পতির দোকান, স্ত্রীর নাম জবা, সে তার স্বামীকে ডাকছিল বাবা বলে, বাবা সেহগালের পর এই আরেকজন বাবা নামধারীকে খুঁজে পেয়ে আমরা তো বেজায় উল্লসিত হয়ে পড়লাম।এই বাবা-দা খুব ভালোমানুষ,সামান্য অনুরোধেই দাম কমিয়ে দিচ্ছিল,কিন্তু জবাবৌদি ভারি কড়া, সে একদম রাজি নয় দরাদরিতে। বেশ কিছু টুপি, মোজা, গ্লাভস, ফেদার জ্যাকেট খরিদ করে তবে আমাদের আশ মিটলো। এতক্ষণ তো সময়ের হুঁশই ছিল না, এবার ঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই দেখি রাত প্রায় দশটা।ছুটতে ছুটতে ‘ফ্যামিলি রেস্টুরেন্টে’ পৌঁছে দেখি দোকান ধোয়ামোছা চলছে, খাবার-দাবার সব শেষ। অনেক কাকুতিমিনতি করে অবশেষে ব্রেড-ওমলেটের ব্যবস্থা করা গেল।

আগামীকাল থেকে ট্রেক শুরু, সক্কাল সক্কাল রওনা হতে হবে,এই আটদিনের ট্রেকে যতটুকু জিনিসপত্র লাগবে,ততোটুকুই নিয়ে যাব সঙ্গে। বাকি ঝোলাপত্তর থাকবে খিমিলখুড়োর ডেরায়। চাপা উত্তেজনা নিয়ে ঘুমোতে গেলে যা হয়, প্রায় জেগেই কাটালাম সারা রাত্তির। সব্বারই এক দশা, পাঁচটার মধ্যেউঠে পড়লাম একে একে সবাই, ইতিমধ্যে এসে হাজির হয়েছে আমাদের তিন সহযোগী, গণেশ দাজু, ওনার ছেলে রাজু এবং দাদু( এনার নাম মনে নেই, বয়সের কারণে দাদু বলে ডাকতাম সবাই, এখানেও দাদু নামেই অভিহিত করবো)। এনারা আমাদের সঙ্গ দেবেন আগামী আটদিন, গাইড এবং পোর্টার হিসেবে।গাড়ি বলাই ছিল, আমাদের পৌঁছে দিলো পোখরা বাসস্ট্যান্ডে। সেখান থেকে চড়ে বসলাম নয়াপুলের বাসে। দেড়ঘন্টার রাস্তা, এই নয়াপুল থেকেই অন্নপূর্ণা স্যাঙ্কচুয়ারির অধিকাংশ ট্রেক শুরু হয়, আমাদেরও হাঁটা শুরু হল এখান থেকেই।(চলবে)

ছবি: শামীম জাহিদ