চুরি যাওয়া বইয়ের খোঁজে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এক রাতে উধাও হলো ১৬৬২ সালে প্রকাশিত ‘অ্যাসট্রোনমার সঙ্গে জোহানেস কেপলারের ‘দ্য কজমিক মিস্ট্রি’ স্যার আইজ্যাক নিউটনের ‘ম্যাথামেটিক্যাল প্রিন্সিপালস অফ ন্যাচারাল ফিলোজফির ১৭৭৭ সালের সংস্করণ, দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’-এর ১৫৬৯ সালের সংস্করণ-সব মিলিয়ে ২৪০টি মহা মূল্যবান বই। চুরির ঘটনাটা ঘটলো খোদ লন্ডন শহরের হিথ্রো বিমান বন্দরেরে কাছে ফ্রন্টিয়ার ফরোয়ার্ডিং ওয়্যার হাউজের ভেতর থেকে। বইগুলোর মূল্য প্রায় ৩ থেকে ৪ মিলিয়ন ডলার। চুরি যাওয়া বইয়ের মধ্যে ছিলো ১৫৬৯ সালে কোপার্নিকাসের লেখা ‘অন দ্য রেভলিউশন অফ হেভেনলি স্ফিয়ার্স’ গ্রন্থটিও। বইটির গায়ে দাম হিসেবে ঝুলছিলো ২৯৩.০০০ মিলিয়ন ডলারের ট্যাগ।বেশি সময় আগের কথা নয়। ২০১৭ সালের ২৯ জানুয়ারী রাতে বই চোরের দল হানা দেয় সেই ওয়্যারহাউজে। পরদিন টনক নড়ে ইংল্যান্ডের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দাদের। কারা চুরি করলো? কেমন করেই এক রাতে উধাও হলো এসব অমূল্য গ্রন্থ? শুরু হলো অনুসন্ধান।
এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো সেই বই চুরি এবং উদ্ধার নিয়ে ‘চুরি যাওয়া বইয়ের খোঁজে…’।

গোয়েন্দাদের প্রথমেই নজর পড়লো চোরেদের প্রবেশ এবং প্রস্থানের পথের দিকে। লন্ডন শহরে সেবার বেশ জোরালো শীত পড়েছিলো। গোয়েন্দাদের মনে হলো, জানুয়ারীর সেই শীত রাতে কারা গুদামখানার চালে উঠে তা কেটে ফেললো এবং প্রায় ৫০ ফুট ওপরে ফাইবার গ্লাসের স্কাইলাইট ফুটো করে ভেতরে ঢুকে বই চুরি করে আবার ওই পথে উধাও হয়ে গেলো? তারা আর যাই হোক সাধারণ চোর নয়! সেই ওয়্যার হাউজে সাধারণ ভাবে কাস্টমস অনুমোদনের জন্য মালামাল জমা হয়। সেখানে চোরের দল ঢুকে অন্যসব দামী মালামালের মধ্যে থেকে সেই বইয়ের ট্রাংক খুঁজে বের করে বেছে বেছে মূল্যবান বইগুলো হাতিয়ে নিলো, বিষয়টা চিন্তার উদ্রেক ঘটায় বৈকি। গোয়েন্দাদের আন্দাজ, এই চুরি কাণ্ডে দক্ষ চোরদের সময় লেগেছিলো প্রায় ৫ ঘন্টা।
বইগুলোর মালিক ছিলেন ইতালীর দু’জন এবং জার্মানীর একজন দুষ্প্রাপ্য বই ব্যবসায়ী। তারা এই বইগুলো ক্যালিফোর্নিয়ার একটি দুষ্প্রাপ্য বইয়ের মেলায় প্রদর্শনীর জন্য পাঠাচ্ছিলেন। পথে বইগুলো লন্ডনে নেমেছিলো। আর সেখানেই ঘটে বিপত্তি। ইতালীর ব্যবসায়ী তার বই উধাও হওয়ার খবর শুনেই লন্ডনের উদ্দেশ্যে বিমানে চড়ে বসেন। বাকি দুজনও তড়িঘড়ি লন্ডনে এসে পৌঁছান। তাদের কারুরই বিশ্বাস হচ্ছিলো না এই বইগুলো কেউ চুরি করতে পারে।
লন্ডনের মেট্রোপলিটান পুলিশের তদন্তকারী অফিসার ডেভিড ওয়ার্ড ভাবছিলেন, চোরদের মোটিভ নিয়ে। ওয়্যার হাউজে তো আরও অনেক মূল্যবান সামগ্রী ছিলো। কিন্তু চোররা কেন শুধু মহা মূল্যবান বইগুলোকেই বেছে নিলো! তাহলে বোঝাই যাচ্ছে তাদের লক্ষ্যই ছিলো বই? সন্দেহ আর চিন্তা ঝড় তৈরি করে ওয়ার্ডের মাথায়। তার মানে, এই চুরির পেছনে আরও কোনো মাথা কাজ করছে। তদন্তের সঙ্গে যুক্ত হলেন সংঘবদ্ধ অপরাধ বিশেষজ্ঞ অ্যান্ডি ডুরহ্যাম।
গোয়েন্দারা খুঁজে চলেছেন সূত্র। কোথায় পাওয়া যাবে সামান্য কোনো ইঙ্গিত যা তাদের আঁধার ছিন্ন করে অপরাধী ধরতে সাহায্য করবে।
তাদের মনে পড়ে গেলো, ২০১২ সালে ইতালীর নেপলস শহরের একটি লাইব্রেরী থেকে অ্যারিস্টটল, ম্যাকিয়াভেলী, গ্যালেলিওর লেখা বই উধাও করে দিয়েছিলো সেই লাইব্রেরীর এক কর্তা। মিলিয়ন ডলার মূল্যের সেই বই অবশ্য সরানো হয়েছিলো অনেকদিন ধরে, একটু একটু করে। কিন্তু এক রাতে এত দুষ্প্রাপ্য বই উধাও হওয়ার ঘটনা এই প্রথম।কিন্তু কোনো সূত্রই তারা পেলেন না। বই আর চোরের দল যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
সেই তদন্তকে প্রথম আলো দেখালো একটা টেলিফোন কল। ঘটনা ঘটার তিন সপ্তাহ পরে রুমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্টে কর্মরত সংঘবদ্ধ অপরাধ বিভাগের গোয়েন্দা অ্যালিনা আলবু একটা ফোন পেলেন। অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি ফোনে তাকে জানালো,চোরাই পথে দুষ্প্রাপ্য বইয়ের একটা বড় চালান রুমানিয়ায় এসেছে। ফোনটা কিন্তু তারপরেও কেটে গেলো না। সেই অজ্ঞাত ব্যক্তি তিজনের নাম জানালো-‘তিজু’, ‘ব্লন্ডি’ আর ‘ক্রিস্টি হিদ্যুমা’।সেই আড়ালে থাকা ব্যক্তির দাবি ছিলো ওই তিনজন চুরির সঙ্গে জড়িত। অ্যালিনা‘র কানে ক্রিস্টি নামটা ঘন্টা বাজিয়ে দিলো। এই নামে একজন বছর পনেরো আগে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধের মামলায় জড়িত ছিলো। অ্যানা তদন্তের সঙ্গে জড়িয়ে নিলেন সেখানকার জাতীয় পুলিশ বাহিনীর আরেক গোয়েন্দা টিবারিয়াস মেনিয়াকে।
এদিকে লন্ডনের গোয়েন্দা ওয়ার্ড সেদিন রাতে রাস্তায় বসানো সিসি টিভির ফুটেজ ঘেঁটে বের করে ফেললেন। সেদিন রাতে একটা সন্দেহজনক রেনল্ট গাড়ি ওই ওয়্যারর হাউজের সামনে বসেছিলো।সেই ফুটেজে দুই ছায়ামূর্তিরও সাক্ষাৎ মিললো। বোঝা গেলো এরাই ছিলো সেদিনের বই চোর। কিন্তু তাদের মাথাটা কে?
ওয়ার্ডের সঙ্গে অ্যালিনা আর মেনিয়ার সদলবলে দেখা হলো কয়েকবার। ২০১৯ সালের মার্চে ইউরোপ ইন্টারপোলের সদর দফতরে কয়েকদফা বৈঠকও করলেন তারা। নিজেদের আলাদা আলাদা তদন্ত দল নিয়ে একটা সমন্বিত বাহিনীও তৈরি বরা হলো৤ শুরু হলো বই চোরদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান।
খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি গোয়েন্দাদের। ইউরোপ জুড়ে ফেলা তদন্তের জালে উঠে আসে রুমানিয়ার অন্ধকার জগতের দুই অপরাধীর নাম-পিনিকুই ও ক্রিস্টিয়ান আনগুরুনু। ধরাও পড়ে যায় এই দু’জন। আর তাদের সূত্র ধরে আটক হয় সেই রাতের আরও কয়েকজন বই চোর।রুমানিয়ার এই সংঘবদ্ধ অপরাধী দলের নেতাদের নির্দেশে এরাই লন্ডন থেকে বই উধাও করে দিয়েছিলো এক রাতে। আড়াই বছর ধরে চলা তদন্তের শেষ দৃশ্যে পর্দা নামলো। কিন্তু আরেকটা বড় প্রশ্ন সামনে এলো-বইগুলো গেলো কোথায়? আলবু আর তার দল কিন্তু আনগুরুনুর পেছন ছাড়েনি।কোভিট-১৯ রোগের সংক্রমণের সময় তাদের তদন্ত থেমে থাকেনি। আলবু রুমানিয়ার গ্রামের দিকে একটি বিশাল বাড়িতে অভিযান চালান। বাড়িটা ছিলো আনগুরুনুর নামে কেনা। গোয়েন্দাদের সবসময়ই সন্দেহ ছিলো আনগুরুনু কোথাও বইগুলো লুকিয়ে রেখেছে। তাদের সন্দেহ সত্য হলো। সেই বাড়ির মেঝে খুঁড়ে পাওয়া গেলো বইয়ের প্যাকেট। গোয়েন্দারা খুব সাবধানে সেই গোপন কোটর থেকে বের করে বইগুলো। কিছু বই উধাও হয়ে গেলেও মূল্যবান সব বই অক্ষত পাওয়া গেলো। এবার বইয়ের ফেরার পালা জাতীয় জাদুঘরে।
বই উদ্ধার অভিযান শেষে গোয়েন্দাদের পুরো দল এবং সেই বই ব্যবসায়ীরা মিলিত হয়েছিলো এক জমকালো পার্টিতে। সে রাতে সেখানে তাদের জন্য ছিলো মহা উৎসবের আয়োজন। চুরি যাওয়া বইয়ের খোঁজে মাঝখানে কেটে গেছে তিনটি বছর।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ ভ্যানিটি ফেয়ার
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box