চৈত্রের শেষ চিঠি…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অনেকদিন কোনো চিঠি পাই না তোমার।এদিকে ডাকবাক্সদের ধর্মঘট চলছে কিনা জানি না। অপেক্ষারও তো অভিমান থাকতে পারে। আজকাল তো ডাকবাক্সগুলো উপেক্ষা নিয়েই বেঁচে থাকে লোকালয়ে। তবুও নতুন সময়ের আশায় লিখতে বসলাম চিঠি।

চৈত্র শেষ হয়ে এলো। ঝরা পাতার মঞ্চে এখন নাটকের শেষ দৃশ্যের মঞ্চায়ন।মনে হচ্ছে ঝড় এবার তার সংসার পাততে এলো বেশ আগেই।কখনো বিকেলে মেঘ করে আসছে, কখনো সারাদিনই আকাশের মেজাজ খারাপ। কখনো আবার বৃষ্টির গভীরতা দেখে মনে হয় বর্ষা ফিরলো নাকি!

ঝড়ের কবলে অপু-দূর্গা

ঝড় আগন্তুক নয়। চৈত্র ফুরিয়ে গেলে ঝড় আসে। জর্জ বিশ্বাসের কন্ঠে যখন শুনি রবীন্দ্রনাথের গান ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার’ তখন মনে হয় ঝড় তো জীবনের চিরসখা।কোথায় নেই ঝড়? ঝড়কে বলা যায় প্রকৃতির তারুণ্য। তার দাপটে উড়তে থাকে জীবনের যতো পুরনো পৃষ্ঠা। শুধুই কি জীবনের পুরাতন পৃষ্ঠা ওড়ে? তাতো নয়। মানুষের জীবনও তো সংহার করে ঝড়। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, বাংলা সাহিত্যে, বাংলা গানে, বাংলা সিনেমাতে ঝড় এসেছে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে। সেখানে ঝড়কে আবাহনও জানানো হয়েছে।

ঝড়ের কথা লিখতে লিখতে বাইরে আকাশ আবার অন্ধকার করে এলো। মেঘ ছড়াচ্ছে আকাশে। একটু আগেই লিখলাম ঝড় আমাদের কাছে আগন্তুক নয়। ঈশান কোণে মেঘ জমে, অকাশ ছেয়ে যায় অসময়ে অন্ধকারে। উড়ে আসে ঝড়, সঙ্গে দমকা বৃষ্টি। শেক্সপিয়ার তাঁর টেমপেস্ট, কিং লিয়ার অথবা ম্যাকবেথ নাটকে ঝড়ের কথা লিখেছেন। ঝড় হয়ে উঠেছে চরিত্র। বাংলা সাহিত্যেও ‘কপালকু্ন্ডলা’ উপন্যাসের শুরুর আগে ভূমিকাতে বঙ্কিমচন্দ্র শেক্সপিয়ারের কাছে ফিরে গিয়েছেন৷ তা না-হলে কি গঙ্গাসাগরে নবকুমার পথ হারাতে পারতো? বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় তাঁর ‘স্মতিররেখায় লিখেছেন, ‘তখনও এই রকম কালবৈশাখী নামবে, এই রকম মেঘান্ধকার আকাশ নিয়ে, ভিজে মাটির গন্ধ নিয়ে, ঝড় নিয়ে, বৃষ্টির শীকরসিক্ত ঠাণ্ডা জোলো হাওয়া নিয়ে, তীক্ষ্মী বিদ্যুৎ চমক নিয়ে-তিন হাজার বছর পরের বৈশাখ-অপরাহ্নের উপর । তখন কি কেউ ভাববে তিন হাজার বৎসর পূর্বের প্রাচীন যুগের এক বিস্মৃতি কালবৈশাখীর সন্ধ্যায় এক বিস্মৃত গ্ৰাম্য বালকের ক্ষুদ্র জগৎটি এই রকম বৃষ্টির গন্ধে, ঝোড়ো হাওয়ায় কি অপূৰ্ব আনন্দে দুলে উঠতো ?’ এমন আশ্চর্য সুন্দর কথাগুলো লেখার আগেই বিভূতিভূষণ লিখে ফেলেছিলেন ‘পথের পাঁচালী’-এর সেই ঝড়ের দৃশ্য, যেখানে ঝড়ের মধ্যে অপু আর দূর্গা দুজনে গুটিসুটি হয়ে বড় গাছের তলায় আশ্রয় নিয়ে ঝড় দেখছে। তখনও কি অপু জানতো এমনি আর এক ঝড়ের রাত্রি দিদি দূর্গাকে তার জীবন থেকে সরিয়ে দেবে?

চায়ের কাপে ঝড়

বিভূতিভূষণ কলমের ডগায় বলেছেন মানুষের ঝড়ের জীবনের গল্প। কিন্তু সত্যজিৎ রায় সেই গল্পকেই সেলুলয়েডে তুলে অমরত্ব দিয়েছেন। বাঙালির জীবনে চিরচেনা ঝড়কে তিনি চিরকালের করে দিলেন তাঁর পথের পাঁচালী সিনেমায়।

কিন্তু বাংলা সাহিত্যের অন্য মহারথী লেখকদের কলমও কিন্তু ঝড়ের ছবি আঁকতে গিয়ে থমকে থাকেনি। শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্কর, বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্টিতে ঝড়ের ছবিটাও একেবারে অন্য ধরণের। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’-তে তাই নদীর বুকে ঝড়ের অন্য বর্ণনা৷ সেই ঝড়ের সঙ্গে কপালকুণ্ডলার নবকুমারের পথ হারানো ঝড়ের কোনো মিল নেই।মানিকবাবু লিখছেন, ‘একদিন প্রবল ঝড় হইয়া গেল৷ কালবৈশাখী কোথায় লাগে৷ সারাদিন টিপিটিপি বৃষ্টি হইল৷ সন্ধ্যায় আকাশ ভরিয়া আসিল নিবিড় কালো মেঘে, মাঝরাতে শুরু হইল ঝড়৷’

বাঙালি ঝড় নিয়ে চিরকাল-ই রোমান্টিক। কথাসাহিত্য, কবিতা সর্বত্রই ঝড় এসেছে অনুষঙ্গ হয়ে।ঝোড়ো হাওয়ার হাত ধরে এসেছে ভালোবাসা। আবার ঝড় উড়িয়ে নিয়ে যায় ভালোবাসা, সংসার। শহীদুল্লা কায়সারের অমর উপন্যাস ‘সারেং বউ’। প্রয়াত পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন ছবি করেছিলেন উপন্যাসটি নিয়ে। শেষদৃশ্য কিন্তু সেই ঝড়। সারেং আর নবীতুনের ভালোবাসা,সংসার সব উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তারপর এক সময় ঝড় থামে। কিন্তু তাদের জীবনের ঝড় কি থেমেছিলো? উত্তরটা অনেকেরই জানা, হয়তো তোমারও।

চিঠি লেখা বন্ধ করে জানলায় দাঁড়ালাম। আকাশে মেঘের সময়। ঝড়ের গন্ধ কি হাওয়ায় ভেসে থাকে? হয়তো থাকে। পৃথিবীতে শুধু বাঙালি-ই কি টের পায় সেই ঘ্রাণ?

প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর কবিতায় লিখেছেন-

‘ঝড় যেমন করে জানে অরণ্যকে

তেমনি করে তোমায় আমি জানি৷’

কবিরা ঝড়কে অনুষঙ্গ করে এমনি বহুবার চমকে দিয়েছেন পাঠককে, চমকে উঠেছে আমাদের ভালোবাসার অনুভুতিও। এ পর্যন্ত চিঠি পড়ে হয়তো ভাবছো সাহিত্যের ঝড় নিয়ে পড়লাম কি না? আসলে বাঙালির জীবনে ঝড় তো শুধু কালবৈশাখী নয়। তাদের চায়ের কাপেও ঝড় ওঠে। পৃথিবীতে সুপ্রাচীন কাল থেকে বয়ে যাওয়া টাইফুন অথবা হারিকেনের চেয়েও শক্তিশালী সে ঝড়। আড্ডাপ্রিয় বাঙালির চা আর চানাচুর হলেই চলে। আর সেখানেই চায়ের কাপে ওঠে ঝড়। এখন আড্ডা চলে গেছে ডিজিটাল পদ্ধতির দখলে। চ্যাটিং, গ্রুপ চ্যাটিং, মেসেজ কত কী নামে আমাদের নিখাদ আড্ডাগুলো প্রায় বিধ্বস্ত। কিন্তু যখন ঝড়ের কথা উঠলো তখন মনে হলো চায়ের কাপে সেই অনাদিকালের ঝড়ের কথা। কত কী যে বাঙালি চায়ের কাপে ঝড় তুলে কুপকাৎ করে ফেলে তার ইয়ত্তা নেই। রাজনীতি, ফুটবল খেলা, প্রেম, অধুনা মি টু আন্দোলন সবই আমাদের চায়ের কাপে ঝড় তুলে যায়। আলোচনা, সমালোচনায় নরক গুলজার না করলে বাঙালির পাকস্থলীতে ভাতও শান্তি পায় না বোধ হয়।

ঝড় বাঙালির রক্তে মিশে আছে যেন।ক্ষয়ক্ষতির খাতায় ঝড়ে মৃত্যুর নাম লেখা থাকে জেনেও বাঙালির জীবনে ঝড় এক অন্য সুর বাজায়। ঝরে পড়া আমের মুকুলের ঝাঁঝালো ঘ্রাণ, শূন্যে অনির্দিষ্ট উড়তে থাকা ঠোঙ্গা, ফেলে দেয়া চিরকুট, দোকানের ফেলে দেয়া হিসেবের খাতার পৃষ্ঠা, স্মৃতি সবকিছুই উড়িয়ে দেয় ঝড়। সে ঝড় ঘন্টায় কত কিলোমিটার বেগে বয় তার হিসাব কে রাখে?

১৯৬৮ সালে উত্তাল প্যারিস

চৈত্রমাস ফুরাচ্ছে। জানি না নতুন বছরে কোন ঝড়ের ডাকে আবার দেখা হবে? হলিউডের পরিচালক সিডনি পোলাক পরিচালিত ‘হাভানা’ ছবির অন্তিমে নায়ক রবার্ট রেডফোর্ট ভালোবাসার মানুষটিকে রেখে এসেছিলো হাভানায়। হাওয়াইয়ের সমুদ্র সৈকতে একা হাঁটতে হাঁটতে চরিত্রটি বলেছিলো ঝড়ের কথাই। বলেছিলো সে রাত জেগে বসে থাকে। যদি কেউ ফিরে আসে কোনোদিন? বলা তো যায় না, দেশটাই তো ঝড়ের দেশ।

এই ঝড়ের দেশে মানুষও তো ঝড় তুলেছে। শুধু আকাশে নয়, শুধু মনে নয়। সে ঝড় তোলপাড় করে দিয়েছে মানচিত্র, ভেঙ্গে দিয়েছে শাসনযন্ত্রের সব স্বস্তি, লোপাট করেছে ঘুম। কারা জাগিয়েছিলো এমন ঝড়? চলো, চৈত্রের পুড়িয়ে ফেলা দিনে বসে সেই ঝড়ের কথাই শুনি।

পালাচ্ছে প্রতাপশালী মার্কিন বাহিনী

তখন সময়টা ভীষণ মারাত্নক। বিদ্রোহ জয়ী হচ্ছে চারদিকে। মধ্য ষাট থেকে সত্তরের দশক। সরবোর্ণ থেকে হাভার্ড হয়ে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, বলিভিয়া, চিলি, অ্যাঙ্গোলা-কোথায় ওঠেনি ঝড়? প্যারিসের রাস্তায় দ্য গলের ফৌজের ট্যাংকের নলে ঠোঁট ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েছিলো ছাত্ররা। ‘শুট দেম’ নির্দেশ পাঠাচ্ছেন জেনারেল। আদেশ অমান্য করছেন সেনাবাহিনীর তরুণ অফিসার। ‘স্যার, হাও কুড আই শুট আ কিস?’ সারা পৃথিবীকে শোসন মুক্ত করার স্বপ্ন দু’চোখে নিয়ে বলিভিয়ার জঙ্গলে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছেন আর্নেস্তো চে গুয়েভারা, ভিয়েতনামে গেরিলাদের হাতে মার খেয়ে পালাচ্ছে প্রতাপশালী মার্কিন বাহিনী, জন লেনন গেয়ে উঠছেন, ‘গিভ পিস আ চান্স।’ আর ঠিক তখনই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তরাই অঞ্চলে উঠে দাঁড়াচ্ছেন শীর্ণকায় এক মানুষ, চারু মজুমদার। হাঁফানির রুগি, চোখে ভারী চশমা, হাতে অক্সিজেন সিলিন্ডার। আর বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য হাজার হাজার যোদ্ধা অতিক্রম করছে নদী, পাহাড়। তাদের রক্তে পবিত্র হচ্ছে দেশের মাটি। এ-ও তো ঝড়। মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে মানুষের তোলা ঝড় অপূর্ব সুন্দর করে দিয়েছিলো পৃথিবীকে। এমন ঝড়ের কথা চৈত্রের এই শেষ চিঠিতে তোমাকেও জানিয়ে রাখলাম্।

আবার ফিরছি সাহিত্যের কথায়। উপন্যাসের নাম মনে পড়ছে না। শরৎচন্দ্রের একটা লেখা থেকে পেলাম ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে।…‘তবে রাক্ষসী সাতশ’ নয়, শতকোটি; উন্মত্ত কোলাহলে এদিকেই ছুটিয়া আসিতেছে৷ আসিয়াও পড়িল৷ রাক্ষসী নয় — ঝড়৷ তবে এর চেয়ে বোধ করি তাদের আসাই ঢের ভালো ছিল৷’ ঝড়ের সৌন্দর্য দেখেছিলেন শরৎবাবু। চৈত্র ফুরিয়ে নতুন বছর।হয়তো নতুন ঝড়ের প্রেক্ষাপট রচিত হবে আকাশে বাতাসে। সে পর্যন্ত ভালো থেকো।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ডয়েচে ভেলে, একমুঠো সাহিত্য
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]