চড়, থাপ্পড়, চপেটাঘাত। ভয় পেলেন?

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

চড়, থাপ্পড়, চপেটাঘাত। ভয় পেলেন? না, কাউকে আঘাত করার কোন বাসনা আমাদের নেই। আমরা শুধু বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে চাইছি। সেদিন এক আড্ডার টেবিলে চড় নিয়ে চলছিলো আলোচনা। ওই আলোচনার সূত্র ধরেই হঠাৎ চড় বিষয়ক প্রচ্ছদ রচনা তৈরী করার বুদ্ধি হানা দিলো মাথায়।
অভিনয় শিল্পীরা এই আঘাতের মুখোমুখি হন প্রায়শই। নাটক অথবা সিনেমায় গল্পের প্রয়োজনে তাদেরকে এই আঘাতটি সহ্য করতে হয় মুখ বুজে। অভিনয় করতে গিয়ে তাই চড় মারার কৌশলটিও তাদের রপ্ত করতে হয়। এমন ভাবে করতে হয় যাতে সাপও মরে কিন্তু লাঠিও না ভাঙ্গে। প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে দেশের নাটকের শিল্পীদের কাছে তাই জানতে চাওয়া হয়েছিল চড় নিয়ে তাদের অভিজ্ঞতার কথা, কোন বিশেষ স্মৃতির কথা। তারা শুনিয়েছেন তাদের মজার সব অভিজ্ঞতার কথা।

শহীদুজ্জামান সেলিমঃ অনেকদিন আগের কথা। প্রয়াত নাট্যকার, পরিচালক ও অভিনেতা আবদুল্লাহ আল মামুনের পরিচালনায় একটি টিভি নাটকে অভিনয় করছি। নাটকটির রচয়িতা ছিলেন আরেক প্রয়াত লেখক প্রণব ভট্ট। সেই নাটকে আমার চরিত্রটি ছিল একজন পুলিশ অফিসারের। দৃশ্যটি ছিল কয়েকজন অপরাধীর আইডেন্টিফিকেশন প্যারেড চলছে। আমি ঘরে ঢুকে সবাইকে পর্যবেক্ষণ করে নিজের চেয়ারে বসবো। প্রথম বার শট হয়ে যাওয়ার পর মামুন ভাই বলেছিলেন দৃশ্যটি জমছে না। ঘরে ঢুকে লাইনবেঁধে দাঁড়ানো সবাইকে আমার চড় মারতে হবে। কী আর করা, শুরু করলাম চড় মারা। কিন্তু ঝামেলাটা হলো সেখানেই। মামুন ভাইয়ের সহকারী বাবলু সেই নাটকেই একটি দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য নিয়ে এসেছিল তারই এক বন্ধুকে। সেই যুবকটি ছিল শখের অভিনেতা। জীবনের প্রথম দিন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে আমার হাতে সেদিন ব্যাপক চড় হজম করতে হয়েছিল। ছেলেটি চড় খেয়ে বোকা হয়ে গিয়েছিল। অভিনয় করতে এসে আমার চড় খাওয়ার অভিজ্ঞতার ভান্ডারটি বেশ সমৃদ্ধ। এক সময়ে মঞ্চে ঢাকা থিয়েটারের নাটক ‘একাত্তরের পালা’ নিয়মিত মঞ্চস্থ হতো। সেখানে অভিনেত্রী শমী কায়সারের হাতে আমাকে নিয়মিত চড় খেতে হতো।শমীর হাত ভীষণ শক্ত। ওই চড়ে ভীষণ ব্যথা লাগতো। কিন্তু ওই নাটকের ৭০ থেকে ৮০টি শোতে আমাকে একটি করে চড় খেতে হয়েছে বহুদিন। শেষদিকে চড় থেকে বাঁচার জন্য আমি নানা ধরণের কৌশল করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু শমীর হাত থেকে রেহাই মিলতো না।
বিশিষ্ট অভিনয় শিল্পী ফেরদৌ্সী মজুমদারের হাতেও আমি নাটকে অনেক চড় খেয়েছি। ওনার কঠিন হাতের চড়ের কথা আজও মনে আছে।

সাবেরী আলমঃ চড় আমি অভিনয় জীবনে অনেক খেয়েছি। তবে একটি ধারাবাহিক নাটকে চড় খেয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলাম। আমাকে সেই সপাটে চড়টি মেরেছিলেন অভিনেতা জিতু আহসান। ওই নাটকে আমার চরিত্রটি ছিল এক উশৃংখল মেয়ের। জিতু আহসান আমার বড় ভাই। আমাকে শাসন করতেই তার ওই চড় মারা। কিন্তু এতো জোড়ে  চড় মেরেছিলো যে আমি আঘাতের ব্যথা এবং বিস্ময় ধারণ করতে না পেরে মাটিতে পড়ে যাই। জিতু নিজেও বুঝতে পেরেছিলো চড়টা অনেক জোরে মেরে বসেছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে ওই মুহূর্তে ঘটনাটা সামলে নিয়ে জিতু দৃশ্যটি শেষ করেছিলো। আর আমিও ব্যথা ভুলে অভিনয় করে গিয়েছিলাম। অবশ্য শট শেষ হওয়ার পর জিতু আমাকে জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চেয়েছিলো। দৃশ্যটাটিও খুব সুন্দর, স্বাভাবিক হয়েছিল। আমার এখনো মনে আছে ওই চড় খাওয়ার পরও আমাকে বেশ দীর্ঘ একটি সংলাপ বলতে হয়েছিল ওই দৃশ্যে।
আমার কাছেও চড় মারার ব্যাপারটা বিশেষ পছন্দের নয়।অন্যকে এভাবে মারতে কেমন অস্বস্তি লাগে। মনে আছে, আমিও একবার অভিনেতা মঈন আহমেদকে এক নাটকের দৃশ্যে সপাটে চড় কষিয়েছিলাম। এতোটাই জোরে মেরেছিলাম যে শব্দটা শুনে সেটের সবাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। পরে অবশ্য মঈনের কাছে আমি মাফ চেয়েছিলাম। আসলে অনেক সময় অভিনয় করতে করতে দৃশ্যটির সঙ্গে একাত্ন হয়ে গেলে এরকম ঘটনা ঘটে যায়। তখন মনের মধ্যে অন্য ধরণের আবেগ কাজ করে।গল্পের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে গেলে এরকম হয়।

সাজু খাদেমঃ চড় অভিনয় করতে এসে অনেক খেতে হয়েছে। একটি নাটকে আমার চড় খাওয়ার ঘটনা কখনোই ভুলতে পারিনি। নাটকের শ্যুটিং চলছে। আমাকে চড় মারবেন ওয়াহিদা মল্লিক জলি।তো ক্যামেরা রেডি। কিন্তু চড় মারতে অস্বস্তি বোধ করছিলেন। কারণ উনি নিজের ছেলেকেও কোনদিন চড় মারেন নি। অোমাদের সঙ্গে ছিলেন আরেক অভিনেতা আবুল কালাম আজাদ পাভেল। ট্রলি করা শুরু হতেই আপা আমাকে আলতো করে চড় মারলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পরিচালকের কাট। ট্রলির গতির সঙ্গে চড় মেলেনি। কাজটা আগে হয়ে গেছে। সুতরাং আবার মারতে হবে। এবার ঝামেলা করলাম আমি। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে উনি চড় মারার আগেই রিঅ্যাশন দিয়ে বসলাম। আবার কাট। পরের শটে ঝামেলা বাঁধালেন পাভেল ভাই। উনি শটের মাঝখানে হঠাৎ হাঁচি দিয়ে বসলেন। ব্যাস, আবারও কাট। বারবার ঝামেলা হওয়ায় এক পর্যায়ে জলি আপাও বেঁকে বসলেন, উনি আর চড় মারতে পারবেন না। পরে অবশ্য পরিচালকের অনুরোধে তিনি রাজি হলেন। শেষ পর্যন্ত চার নম্বর টেকে শট ওকে হলো। কিন্তু আমার ঝামেলা শেষ হলো না। ক্লোজ শটগুলো নেবার সময়ও আমাকে চড় খেয়ে যেতে হলো অবিরাম। মনে আছে ওই নাটকে আমাকে ১৬টি চড় হজম করতে হয়েছিল।
সুবর্ণা মোস্তফার সঙ্গেও আমার চড় খাওয়ার বেশকিছু স্মৃতি আছে। উনি অবশ্য ক্যামেরার সামনে চড় মারেন খুব কৌশলে যাতে অন্য অভিনেতা বা অভিনেত্রী ব্যথা না পান।
অন্যের হাতে অনেকবার ক্যামেরার সামনে চড় খেতে হয়েছে আমাকে।কিন্তু আমি নিজে কাউকে চড় মারতে পছন্দ করি না। কারণ চড় বিষয়টাকে আমার কাছে বেশ অপমানকর বলেই মনে হয়। মনে হয় মিথ্যে করে হলেও অন্যকে ছোট করছি, অপমান করছি।এরকম কোন দৃশ্য চলে এলে আমি সবসময় গুটিয়ে থাকি। মনের মধ্যে অস্বস্তি কাজ করতে থাকে।

রওনক হাসানঃ  অনেক দিন আগের কথা। কাজ করছিলাম প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের লেখা একটি নাটকে। নাটকের নাম, মেঘ বলেছে যাবো যাবো। আমার চরিত্রটি ছিল মাস্তানের। নাটকটি পরিচালনা করেছিলেন তাহের শিপন। আমার এখনো মনে আছে, সহ অভিনেতা ইকবালকে সপাটে এক চড় মেরেছিলাম। নাটকের দৃশ্যটা ছিল এরকম, আমি মাস্তান, আমার সহকারী ইকবালকে কোন এক কারণে চড় মারতে হবে। একটাই দৃশ্য। সেটার আবার কোন ক্লোজ শট ছিলো না।ক্যামেরা ছিল আমাদের মাথার ওপর। লাইট করা হয়েছে বেশ একটু আলো আঁধারী করে।কেন জানি না, সেদিন বেশ মেজাজ খারাপ ছিলো আমার। ভালো লাগছিলো না। পরিচালক অ্যাকশন বলতেই খুব জোরে ইকবালকে চড় মেরে বসেছিলাম। আমি নিজেই সেদিন চড়টা মেরে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। ইকবালের থতমত খেয়ে যায়। ইউনিটে উপস্থিত সবাই বেশ ভড়কে গিয়েছিল।

সানজিদা প্রীতিঃ আমার নিজের কাছে চড় মারতে ভালো লাগে না। কেমন যেন অস্বস্তি হয়। তবে নাটকে চড় খেয়েছি বেশ অনেকবারই। আমার অভিনয় জীবনের প্রথম ধারাবাহিক নাটক ‘স্পর্শের বাইরে’। সেই নাটকে চড় খেয়েছিলাম অভিনয় শিল্পী আফরোজা বানুর হাতে। চড়টার কথা এখনো মনে আছে।ওটাই প্রথম চড় খাওয়া অভিনয় করতে এসে। হুমায়ূন ফরীদির সঙ্গে অনেক নাটকে অভিনয় করেছি। তবে ওনার হাতে চড় খেতে হয় নি আমাকে।
অন-স্ক্রিনে চড় মারতে না চাইলেও নাটকের বাইরে নানা কারণে লোকজনকে চড় মারতে হয়েছে জীবনে। সেটা অবশ্য আমি বেশ এনজয় করেছি। তবে নাটকে চড় মারার কাজটা আমার ভালো লাগে নি কখনোই।

জ্যোতিকা জ্যোতিঃ চড় অভিনয় জীবনে অনেক খেয়েছি ক্যামেরার সামন। দিয়েছিও অনেক। অভিনয়ের জন্য চড় খেতে আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু চড় মারতে গিয়ে এখনো কেমন একটা অস্বস্তির মধ্যে পড়ে যাই। অনেক পরিচালক আছেন শটের মাঝখানে আচমকা চড় মারতে বলেন। সহ অভিনেতা হয়তো বিষযটা আগে থেকে জানে না। ন্যাচারাল প্রতিক্রিয়া পাবার জন্যই হয়তো তারা এরকম বলেন। কিন্তু এরকম কাজ আমার বেশ অপছন্দের। অনেকদিন আগের একটা ঘটনার কথা বলি, আমি কক্সবাজারে একটি ধারাবাহিক নাটকের শ্যুটিং করছি। আমার কো-আর্টিস্ট আচমকা শটের মধ্যে চড় মেরেছিল। প্রচন্ড ব্যথা পেয়েছিলাম। সে অতি অভিনয় করছিল বলেই ওভাবে মেরেছিল। আমি কানে খুব ব্যথা পেয়েছিলাম।

নাবিলাঃ নাটকে সাধারণত নারী চরিত্ররাই পুরুষ চরিত্রকে চড় মারে। আমার বেলায়ও এর ব্যতিক্রম হয় নি। অভিনয় করতে এসে অনেক সহ-অভিনেতাকেই চড় মারতে হয়েছে। অনেক আগে আমার অভিনয় জীবনের প্রথম টেলিফিল্মে অভিনয় করতে এসে প্রথম দৃশ্যেই কো-আর্টিস্টকে চড় মারতে হয়েছিল। আমি বেশ জোরেই চড় মারি তাকে। শটটাও এক টেকে ওকে হয়েছিল।
চড় মারার কাজটা জোরের সঙ্গেই করি। আর তাতে দৃশ্যটাতে ন্যাচারাল অ্যাফেক্ট আসে বলে আমার ধারণা। সম্প্রতি আরটিভির একটা নাটকের শ্যুটিংয়ে চড় মারার একটি দৃশ্য ছিল। সেখানে আঘাত লেগে ক্যামেরার ওপর পড়ে গিয়েছিলাম। বেশ ব্যথাও পেয়েছিলাম।

সাক্ষাৎকার গ্রহন: স্বাগতা জাহ্নবী

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]