ছাতার মাথা …

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ তাঁর ‘নো ওয়ান রাইটস টু দ্য কর্নেল ’ উপন্যাসে লিখেছিলেন,  বুড়ো কর্নেলের নজরে পড়ে ট্রাঙ্কের নিচে রাখা ভাঙাচোরা, পুরনো কালো ছাতা। মনে পড়লো, বহুবছর আগে ছেলেকে নিয়ে ওই ছাতার নিচে বসে একটা শো দেখতে গিয়েছিলো কর্নেল। কয়েক বছর আগে খুন হয়ে গিয়েছে সেই পুত্র। ওদের দলের আর এক বন্ধু গত রাতে খুন হয়েছে, মরদেহ দেখতে বৃষ্টির মধ্যে ছাতা ছাড়াই রওয়ানা হয় কর্নেল। রাস্তায় এ ডাকে, সে ডাকে। কর্নেল কারও ছাতার নিচে যায় না। শেষে  ছেলের এক বন্ধুর ডাকে সাড়া দেয় সে। ততক্ষণে খবর আসে, পুলিশ ব্যারাকের সামনে দিয়ে শোকমিছিল যাওয়ার অনুমতি মিলবে না। ছাতায় অঝোরে বৃষ্টি পড়ে, কর্নেল বিড়বিড় করে সেই ছেলেটিকে বলে, ‘আমরা যে একনায়কতন্ত্রে বাস করি, মাঝে মাঝেই খেয়াল থাকে না।’

মার্কেজের লেখায় ছাতা আছে, আছে রাজনীতি। কিন্তু ছাতা বা ছত্র নিয়ে আমাদের ভাবনাটা একটু অন্যরকম। ছাতার কথা মনে হলেই ভেসে ও্ঠে বর্ষাকাল আর অনন্ত বৃষ্টির ছবি। ভিজতে ভিজতে ছাতা মাথায় মানুষ চলেছে পথে, মাথার ওপর গভীর বর্ষণ নিয়ে।কেউ বাস থেকে নামছে ছাতা মাথায় শাড়ি, ব্যাগ সামলে বৃষ্টির মতোই রিমঝিমিয়ে। আবার কেউ বাজারে রোদ থেকে মাথা বাঁচাতে ছাতা মাথায় মেজাজ সপ্তমে তুলে ঘুরে মরছে। ছাতার বর্ষা অথবা শীত বলে কিছু নেই এ দেশে। এই বস্তুটি বগল থেকে যাত্রা শুরু করে মাথা হয়ে লেডিজ ব্যাগের অন্তরাল-কত পথেই তো অবাধ যোগাযোগ গড়ে তুললো ।ফেলে যাওয়ার সূত্র ধরে হলো প্রেমের রাজসাক্ষী। জনারণ্যে হারিয়ে গিয়ে তৈরী করলো পারিবারিক অশান্তি। ছাতা তবুও আমাদের খুব কাছের একটি চরিত্র। বাঙালি আদর করে ডাকে ছাতি।এই ছাতাকে নিয়ে এবার প্রাণের বাংলায় রইলো প্রচ্ছদ আয়োজন, ‘ ছাতার মাথা ’।

ছাতা বস্তুটি রহস্যময়। একদা রাজনীতিতে বলা হতো এই শহরে বৃষ্টি হলে মস্কোতে ছাতা ধরা দল। নিঃসন্দেহে কমিউনিস্ট পার্টিকেই ইঙ্গিত করা হতো তাদের রাজনীতির দেউলিয়াপনা বোঝাতে। আবার কেউ মুখ চলতি কথায় বলেন ছাতার মাথা। কথাটার পুরো অর্থ আজো পরিস্কার নয়। কারণ ছাতা বলতে বাংলায় ময়লাও বোঝায়। কখনো এর ওর মাথায় ছাতা ধরার ব্যাপারটার সঙ্গে তৈল মর্দনের বিষয়টাও জড়িয়ে থাকে। তাই ছাতা শব্দের ব্যবহার খানিকটা তো রহস্যময় বটে। কিন্তু রোদ অথবা বৃষ্টিতে ছাতা না হলে আমরা অচল।

ছাতা বস্তুটির উৎসস্থল চীনদেশে। এখন থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে চীন দেশে ছাতা আবিষ্কার হয়েছিলো রোদ থেকে মাথা বাঁচানোর জন্য। আমব্রেলা শব্দটির উৎপত্তি কিন্তু ল্যাটিন দেশে। ল্যাটিন ভাষায় ‘আমব্রা’ শব্দটির অর্থ হলো ছায়া। সেই ছায়া জোগাড় করতেই মানুষ ছাতা বানাতে শুরু করেছিলো।

‘ছাতার তলায় চুমুর আড়াল’, কবে একটা গানে এরকম লাইন লেখা হয়েছিলো। চুমু না-হোক ছাতা প্রেমের আড়াল তো বটেই। বৃষ্টিভেজা প্রেম বাঙালির এক ভীষণ সেন্টিমেন্ট। তার সঙ্গে ছাতা জুড়ে গেলে তো কোনো কথাই নেই। সিনেমার পর্দায় রাজকাপুর সাহেব অভিনেত্রী নার্গিসের সঙ্গে এক ছাতার তলায় দাঁড়িয়ে গান গেয়েছিলেন ‘এক পেয়ার হুয়া’…কবেকার সেই গান মনে এখনো ছাতা-প্রেমের আইকন হয়ে রয়ে গেলো্।

রোদ অথবা বৃষ্টিতে ছাতা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার একটি সংলাপ প্রায় সবাই শুনেছেন-ছাতা যেন না হারায়। আর ছাতাও এমন এক মনভোলা, বেআক্কেলে বস্তু সে হারাবেই।ছাতা কথা বলতে পারলে বলতো, আমার কী দোষ! হারাও কেনো আমাকে?

ছেঁড়া ছাতার কথা অনেক শোনা যায়। বাট ভাঙ্গা, শিক বাঁকা এসবই ছাতার ক্ষেত্রে বড় বিশেষণ। কিন্তু এসবের বাইরে রাজছত্র বলেও একটা বস্তু আছে। সেটা কী? প্রাচীনকালে রাজা বাদশাদের মাথার উপর ভৃত্যরা উঁচু করে ধরে রাখতো একটি ঘেরাটোপ। সেই ঘেরাটোপই ছিলো মর্যাদা ও ক্ষমতার প্রতীক।
সে কালে রাজা বাদশাদের পথচলার সময় একটি দৃশ্য খুব স্বাভাবিক ছিল… রাজা আগে আগে চলছেন, আর ছত্রধর ভৃত্য ছাতা মেলে চলছে তাঁর পিছুপিছু। সেই রাজছত্র কি আমাদের সাধারণ ছাতার মতো দেখতে ছিলো? মোটেই না। বাহারি নকশা-শোভিত ছিলো সেই সব রাজকীয় ছাতা। কী সুনিপুণ কারুকাজ থাকতো তাতে! আকারেও হতো বেশ বড় ও ভারী। শোভাযাত্রা, যুদ্ধ কিংবা শিকারে এই রাজছত্র নিয়ে পথ চলতেন, তখন তা তাকে কেবল ছায়াই দিতো না, ছাতা তখন তার ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে শোভাবর্ধনও করতো। হাজার হাজার বছর ধরে রাজছত্রের এই ব্যবহার চালু ছিলো। মধ্যপ্রাচ্য, মিশর, আফ্রিকা, পারস্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সকল ধর্মের শাসকরাই রাজছত্রের মাধ্যমে তাদের আভিজাত্যের জানান দিতেন। শুধু তাই না, রাজারা তাদের অধীন উচ্চপদস্থ কর্মচারী ও সেনাপতিদের পুরস্কার হিসেবেও ছাতা উপহার দিতেন।

ছাতা আবিষ্কারের পর চীন দেশের বাইরে কোরিয়ায় প্রথম ছাতার ব্যবহার শুরু হয়। সেখান থেকে ছাতা চলে আসে এশিয়া, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। তারপর ছাতা পাড়ি জমায় ইউরোপে। শোনা যায় ইউরোপে নবজাগরণের সময় ছাতা বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো।

ছাতা আবিষ্কারের পর মেয়েদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো এর ব্যবহার। এদিক থেকে অভিজ্ঞতা বলে পুরুষের ছাতা জন্ম-অপরাধী। পানি ঝরলে বা বেকায়দায় শিকটা কাউকে খোঁচালেই বেধে যায় মহাকাণ্ড। অথচ মেয়েরা ? ভিজে শাড়ি বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে, ভেজা ছাতা ভাঁজ করে ব্যাগে ঢোকাতে গিয়ে পানি ছিটকে পড়ছে অন্যদের শরীরে, কিন্তু কারো ভ্রুক্ষেপ নেই। সবাই স্ট্যাচু। ‘শেষের কবিতা’ মনে করে দেখি। ঘুম থেকে উঠে অমিত দেখে, ‘ডান হাতে ছাতা দোলাতে দোলাতে উপরের রাস্তা দিয়ে আসছে লাবণ্য।’ এই একটা উপন্যাসই বুঝিয়ে দেয়, প্রৌঢ়ত্বেও মেয়েদের অ্যাকসেসরিজের দিকে কী তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন রবীন্দ্রনাথ! লাবণ্যের হাতে যে ছাতা চলবে, আধুনিকা সিসি-লিসির হাতে তা মানাবে না। অতএব অমিত যখন শিলং-য়ে, ‘বাঁ হাতে হাল কায়দার বেঁটে ছাতা, ডান হাতে টেনিস ব্যাট’ নিয়ে সিসি-লিসিরা গেল দার্জিলিঙে। ছোটবেলায় অঘোর মাস্টারমশাইয়ের কালো ছাতার অত্যাচার সইতে হতো বলেই কি প্রৌঢ়ত্বেও রবীন্দ্রনাথ মেয়েদের স্টাইলিস্ট ছাতার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন? সবই ছাতার রহস্য।

একটা সময়ে পুরুষেরা খুব একটা ছাতা ব্যবহার করতো না। তবে সব মহিলারাই আবার ছাতা ব্যবহারের জন্য যোগ্য ছিলো না। শুধুমাত্র সমাজে সম্ভ্রান্ত এবং অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী পরিবারের মেয়েরাই ছাতা ব্যবহার করতো। সেই প্রাচীন সমাজে ছাতা হয়ে উঠেছিলো প্রতিপত্তির প্রতীক। তবে এখন ছাতা তৈরীর ক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়ানের মর্যাদা দখল করে রেখেছে চীনারাই। চীনের সংজি শহরে সবচাইতে বেশী ছাতা তৈরীর কারখানা আছে। ছাতা তৈরীতে বিশেষ দক্ষতার কারণে এই শহরের নাম হয়ে গেছে ‘পৃথিবীর ছাতা’। এই শহরে ছাতার কারখানার কর্মীরা ঘন্টায় ৪০টি করে ছাতা তৈরী করে।

ছাতা কাণ্ডে পুরুষদের পথপ্রদর্শক ছিলেন ইংরেজ পুরুষ জোনাস হানওয়ে। তিনিই প্রথম প্রকাশ্যে ছাতা ব্যবহার করতে শুরু করেন। পর্যটক ও লেখক হ্যানওয়ে ছাতাকে জনপ্রিয় করতে একটানা ৩০ বছর ইংল্যান্ডের রাস্তায় ছাতাকে সঙ্গী করে পথ চলতেন। শোনা যায়, একবার তিনি ভারতে এসেছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীতে চাকরিরত এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। ভারতের তীব্র গরমে তার সঙ্গী ছিলো ছাতা। তিনি ছাতাকে এতোটাই জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন যে বৃটিশদের কাছে ছাতার অপর নাম ‘হ্যানওয়ে’।

‘পথের পাঁচালী’ সিনেমায় অপুর বড় হয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা এখানে স্মরণ করা যেতে পারে। দুর্গা মারা গিয়েছে, অপু পাঠশালায় যাবে। আকাশে মেঘ। বেরোতে গিয়ে অপু ফের ঘরে ঢুকে আসে, হরিহরের ঢাউস কালো ছাতাটা নিয়ে রওনা হয়। যে বালকের পিছনে এত দিন মাকে ঘুরে বেড়াতে হতো, দিদির মৃত্যু তাকে বড় করে দিয়েছে।সেই শোকাবহ দৃশ্যকে আরো সুতীব্র করে তুলতে ছাতার ব্যবহার ছিলো প্রতীকী।

ইতিহাস বলে, ছাতা একসময় অস্ত্র রাখার মাধ্যমও হয়ে ওঠে। রাস্তায় চলার সময় সমাজের অভিজাত ব্যক্তিরা ছাতার ভেতরে ধারালো অস্ত্র লুকিয়ে হাঁটতেন শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে। মারপিটের সঙ্গে ছাতার একটা মৃদু যোগাযোগ এখনো আছে গ্রামে।

ছাতার গল্প অনেক পুরনো হলেও অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত ছাতার আকৃতি ছিলো বিশাল। ছিলো ওজনদারও। তখন ছাতার ভেতরের রডগুলো ছিলো কাঠ অথবা তিমি মাছের কাঁটা দিয়ে তৈরী। ছাতার বাটের দৈর্ঘ্য ছিলো প্রায় দেড় মিটার লম্বা। সব মিলিয়ে ছাতার ওজনও হতো ৪-৫ কেজি। বিশ্বে প্রথম ছাতার দোকান বসে লন্ডন শহরের অক্সফোর্ড স্ট্রিটে। নাম ছিলো, ‘জেমস স্মিথ অ্যান্ড সন্স’। ১৯২০ সালে জার্মানীর বার্লিন শহরের হ্যান্স হ্যাপট নামে এক ব্যক্তি সহজে বহনযোগ্য ছোট ছাতা তৈরী করে গোটা পৃথিবীতে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন।

রোদ অথবা বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য আদিম মানুষ কবে গাছের বড় পাতা ছিড়ে তা মাথায় দিয়েছে অথবা মাথায় ঘাসের তৈরী ক্যানোপি টুপি পরিধান করেছে সে কথা আজকে সঠিক বলাও সম্ভব নয়। প্রাচীন মিশরে ছাতার প্রচলন তো দৃশ্যমান। রেখাচিত্রে দেখা যায় তাদের দেবতা অসিরিসের ছাতা ছিলো। গ্রীক ও রোমানদেরও ছাতা ব্যবহার করতে দেখা গেছে। গ্রীক নারীদের কাছে ছাতা ছিলো প্রিয় বস্তু। তখন মেয়েদের কাছে ছাতা হয়ে ওঠে অপরিহার্য। ছাতার এই ব্যবহার নারীদের ফ্যাশনের সঙ্গেও জুড়ে যায় একদা। ইংল্যান্ডে মেয়েদের পোশাক এবং ভ্যানিটি ব্যাগের সঙ্গে মিলিয়ে ছাতার ব্যবহার ছিলো চোখে পড়ার মতো।

ছেঁড়া ছাতা বলি আর রাজছত্রই বলি ছাতা আবিষ্কারের পর থেকে তার আবেদন ধরে রেখেছে। ধরে রেখেছে প্রয়োজনীয়তা আর রহস্য।

ইরাজ আহমেদ

তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box