ছাত্র ইউনিয়নের দিনগুলি

নীনা হোসেল

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

আমি তখন বকশীবাজার সরকারী ইনটারমিডইয়েট কলেজে পড়ি । সে সময় আয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে বেশ জোরালো গন আন্দোলন শুরু হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানে। খবর পড়ে, রেডিও শুনে এই নিয়ে উত্তেজিত আলোচনা হতো বড়দের মধ্যে। আমি মন দিয়ে শুনতাম এই পর্যন্তই । আমি ও যে কিছু করতে পারি তা কখন মনে আসেনি। তখন আমি নিতান্তই এক কিশোরী। তাছাড়া আমার বাবার কড়া নির্দেশ ছিলো সোজা কলেজ এবং বাড়ি কোন রকম এদিক সেদিক নয় । আমি তখন পর্যন্ত সুবোধ বালিকা ছিলাম । ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক ছিলো না, কৌতূহল ছিলো। কত দল ছিলো যেমন, ছাত্রলীগ, এনএসএফ, ইসলামী দল এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। সবাই ভাল যার যার নিজের দলকেই সব চাইতে আদর্শবাদী একনিষ্ট বলে দাবী করতো। দলে টানবার চেষ্টা করতো। কিন্তু তাদের কোন মিটিং কিংবা মিছিলে যাইনি কখন । যদিও আমার মনে অপরিসীম কৌতূহল ছিলো।আমার বাবার কঠোর নির্দেশ আমাকে নিবৃত্ত করেছে।
একদিন আন্দোলনের ডাক এসে গেলো ওই কলেজের নিস্তরঙ্গ জীবনে। আন্দোলনের ডাক এসে গেলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এক ঠেলা দিতেই গেট খুলে গেলো। ‘বোনেরা বেরিয়ে আসুন, ছাত্র আন্দোলনকে জোরদার করতে যোগ দিন, । আমরা কতিপয় অতি দুঃসাহসী মেয়ে বেড়িয়ে পড়লাম মিছিলে। কোন অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা না করে আমিও যোগ দিয়েছিলাম। ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে থেকেছি অতি সাবধানে।সম্মিলিত কন্ঠে শ্লোগানে গর্জে উঠেছিল ‘আয়ুবশাহী ধ্বংস হোক’, ‘ছাত্র বেতন কমাতে হবে’, ‘বিনা সর্তে সব ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তি দিতে হবে’, ‘বাক স্বাধীনতা দিতে হবে’, ‘১৪৪ ধারার বন্ধ কর’, ‘সর্ব স্তরে বাংলা ভাষা চালু কর’-লাঠি চার্জ হয়েছিলো সে মিছিলে, অ্যারেস্টও হয়েছিলো অনেকে। ফেস্টুন, ব্যানার নিয়ে উৎসাহে টগবগ করতে করতে মিছিল পরিক্রমণ করলো উল্লেখযোগ্য রাজপথ শেষে থামল এসে পুরানো ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের আমতলায়। জ্বালাময়ী ভাষায় ছাত্র ইউনিয়ন আর ছাত্র লীগের নেতারা বক্তৃতা দিলেন। ফেরদৌস কোরেশী হয়তো তখন ডাকসুর সভাপতি ছিলেন। ফেরদৌস কোরেশী, সাইফুদ্দিন মানিক, পঙ্কজ ভট্টাচার্য, মতিয়া চৌধুরী এদের সবাইকে দেখলাম। কৃষক নেতা জিতেন ঘোষকেও দেখলাম। প্রশ্ন এলো মনে জিতেন ঘোষ তো ছাত্র নন তিনি কি করছেন! অনেক উত্তেজনা, অনেক ভয়, আনন্দ । আমরা সবাই একরকম ম্যানিক স্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম বললে অত্যুক্তি হবেনা । আমাদের একজনও এর আগে মিছিলে যাইনি। মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশে উত্তোলিত করে সমস্বরে, ঐকতানে শ্লোগান দেইনি। মানসিক অবস্থা অকল্পনীয় । এই এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা , সেদিন বুঝিনি এই অভিজ্ঞতা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে । একধরনের এপিফেনি বলা যায়। আমরা সবাই নিজেদের মধ্যে বলা বলি করেছি বাড়ীতে গিয়ে কি বলবো এবং কলেজে কি হবে পরদিন ইত্যাদি। ভয় আর আতঙ্কত ছিলোই।
আমরা সবাই ঠিক করলাম মধুর ক্যানটিনে গিয়ে বিখ্যাত মধুদা কে একটু দেখে যাব। উত্তেজনার শেষ নেই সেই মধুদার ক্যান্টিন। এই ক্যান্টিনের ভূমিকা ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা সবাই মধুর ক্যান্টিনে গিয়ে বললাম আমরা মধু’দা কে দেখতে এসেছি। একজন গিয়ে ডেকে নিয়ে এল মধু’দাকে। তিনি মুখভরা হাসি নিয়ে একদল ছটফটে কিশোরীদের স্বাগত জনালেন। আমাদের সবার জন্য এলো আলুর সিঙ্গারা, সন্দেশ আর চা । ছোট সাদা কাপ থেকে চা উপচে পড়েছে পিরিচে। আমরা সবাই অনভ্যস্ত কুণ্ঠিত হয়ে একটা টেবিল ঘিরে বসে চা খেলাম। মধু’দাকে দেখে সেদিন খুব ভালো লেগেছিল।কি যে মায়াভরা একটি মানুষ ছিলেন তিনি। আজ এত বছর বছর পরেও সেই দিনের দেখা মধু’দাকে একই রকমভাবে মনে আছে আমার। আমার বিশ্বাস মধু’দার ও খুব ভাল লাগতো এইসব স্বাপ্নিক তরুণ ছাত্র ছাত্রীদের । তিনি নিঃসন্দেহে সবার ভালবাসা ও সম্মান পেয়েছিলেন।
সে সময় যত আন্দোলন হয়েছে সেই সব আন্দোলনে মধু’দার এই ক্যান্টিনের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। মধু’দা ও মধুর ক্যান্টিনের ভুমিকা ঐতিহাসিক। ছাত্রসমাজ সব সময়েই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরন করবে তাকে। মধু’দা আমাদের হিরো হয়েই আমাদের মনে বেঁচে থাকবেন।
একদিনে আমার অনেক অভিজ্ঞতা হলো। পরদিন প্রিন্সিপ্যালের অফিসে আমাদের ডাক পড়লো। অনেক বকুনি খেলাম। ওয়ার্নিং দেয়া হলো এমন কিছু আবার করলে এক্সপেল কড়া হবে। শুনতে খুব খারাপ লেগেছে ভয়ও পেয়েছি। 
আমি আরও বেশ কটা মিটিঙে গিয়েছি এর পরে । ক্রমশ আমি ছাত্র ইউনিয়নের দিকেই ঝুঁকলাম। প্রথমত ছাত্র ইউনিয়নেরআদর্শ দ্বিতীয়ত এর সদস্যদের মেয়েদের প্রতি সম্মান ও সৌজন্যমূলক আচরণ; এবং বুদ্ধির দিক থেকে এর সদস্যরা মেয়েদের সমান মনে করতো। বলাই বাহুল্য মতিয়া চৌধুরী ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী ।মনে হল এটাই আমার দল। ছাত্র ইউনিয়নের গঠনতন্ত্রে ছিল ঐক্য, শিক্ষা শান্তি ও প্রগতি। কথায় ও কাজে তাদের মিল ছিল। বিশেষ করে এরা মেয়েদের নিরাপত্তার দিকে প্রখর দৃষ্টি রেখেছে সবসময়। আমরা খুবই নিরাপদ ছিলাম সেই দিনগুলিতে।
অনেক সময় সর্বদলীয় সমাবেশে ভিন্ন সংগঠনের ছাত্ররা অনেক সময় অসমীচীন আচরণ করেছে। এবং সে সময় ছাত্র ইউনিয়নের ভাইরা ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা করেনি এইসব অসভ্য জানোয়ারদের উপর।
একবার আমরা একসঙ্গে চাঁদা তুলেছি বন্যা দুর্গতদের জন্য সর্বদলীয় উদ্যোগে । রাজপথে সাদা চাদরের চারকোনায় চারজন ধরেছিলেন। সবাই একসঙ্গে গান গেয়েছি, ‘ভিক্ষা দাওগো ভিক্ষা দাওগো পুরবাসী’। সবাই দান করেছে যে যেমন পেরেছে। আমার বেশ মনে আছে ভিন্ন ছাত্র সংগঠনের কেউ কেউ পয়সা নিয়ে পকেটে পুরছিলেন । কত কথা মনে পড়ছে, বলে শেষ করতে পারবো না।
আমার ছাত্র ইউনিয়নের দিনগুলি খুব মনে পড়েছে বিশ্ব বিদ্যালয়ের বর্ষবরন অনুষ্ঠানের ঘটনা থেকে। যা ঘটেছে তা বিশ্ব বিদ্যালয়ের পবিত্র অঙ্গনকে কলুষিত করেছে । এইসব নারী লাঞ্ছনাকারী লম্পটদের উপর ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা ঝাঁপিয়ে না পড়লে কি হতো সেটা অনুমেয়। ছেলেগুলি নিজেদের জীবনের ঝুকি নিতে দ্বিধা করেনি। নিষ্ক্রিয় এবং নির্লিপ্ত পুলিশ কাছেই ছিলো । যাদের দায়িত্ব ছিলো নারীদেরকে রক্ষা করা তারা কি করে দাড়িয়ে নারীদের শ্লীলতাহানির দৃশ্য তামাশা দেখেছে তাদের সারভেলান্সে এটা বুঝতে খুব কষ্ট হয় রাগ হয়। দেশটাকে এরা কোথায় নিয়ে এসেছে। সাধারণ শালীনতাবধ টুকু ও আর নেই। আমাদের গরীব মেহনতি মানুষের ট্যাক্সের পয়সা দিয়ে এই পুলিশ বাহিনীকে পালন করা হয়। এবং এরা কখনই সাধারণ মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসে না । পুরো সিস্টেমই দুর্নীতি পরায়ণ । এটা খুবই দুর্বোধ্য কেন পুলিশ সেদিন এগিয়ে আসেনি। ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা বদমাশগুলোর কয়েকটাকে পুলিশের হাতে তুলে দেবার পর পুলিশ তাদের ছেড়ে দিয়েছে। এরকম একটার পর একটা অনিয়ম চলছেই বিশেষ করে নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে ইচ্ছাকৃত ভাবে সবার নীচে রাখা হয়েছে। 
আমি ছাত্র ইউনিয়নের এই সাহসী ছেলেদের জন্য গর্বিত। এরা সিংহের মত রুখে দাঁড়িয়েছে নারী নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে। নারীর সম্মান ও অধিকারের দাবীতে আন্দোলন সংগঠিত করছে। তা বাস্তবিক মনে আশার সঞ্চার করে। নিঃসন্দেহে আমাদের নারী আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে। হবে। ছাত্র ইউনিয়ন দেশব্যাপী নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলছে। রুখে দাঁড়িয়েছে এই অন্যায় এবং অসভ্য আচনের বিরুদ্ধে। চোখে জল আসে। আশার আলো দেখতে পাই দীর্ঘ সুরঙ্গের শেষে ।মনটা সাহস, আশা আর আনন্দে ভরে যায়। আমাদের লড়াই শেষ হয়নি। সামনে অনেকটা পথ যেতে হবে। নারীর সমান অধিকার ব্যতিরেকে কোন দেশ, কোন জাতি সামনে এগিয়ে যেতে পারেনা।
এদেশের ছাত্র আন্দোলন ছিল শক্তিশালী ও দুর্বার ।
ছাত্ররা সব সবরকম রাজনৈতিক কর্মসূচী ভিত্তিক আন্দোলন গুলিকে অসাধারণ শক্তি দিয়েছে সমর্থন করেছে সবসময়। ছাত্র ইউনিয়নের বড় অবদান ছিল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ও। রবীন্দ্র জয়ন্তী, বাংলা নববর্ষ, একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের মাধ্যমে ছাত্র সমাজকে একত্রিত করেছে।

ছবি: প্রাণের বাংলা ও গুগল