ছায়ার সঙ্গে বেড়াই…

সুলতানা শিরীন সাজি

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

 মাঝেমাঝে নিজের কাছে কিছু ব্যাপারে বিস্ময় লাগে।মানুষের সব প্রার্থনা সৃষ্টিকর্তা শোনেন। আমরাই ঠিকমত চাইতে জানিনা।কিছুদিন আগে একটা পোস্ট এ লিখেছিলাম একটা ইচ্ছের কথা। সত্যি কথা বলতে গেলে অনেক ব্যক্তিগত ভালোলাগা দূরে সরে গেছে রাশীকের বাবাকে হারিয়ে ফেলার পর থেকে।দূরে কোথাও বেড়াতে গেলে কখনোই ড্রাইভ করতামনা। বাহিরে তাকিয়ে দেখতে,ভাবতে,কথা বলতেই ভালো লাগতো! লহমায় যেনো জীবনটা বদলে গেলো।

গত সপ্তাহে মনের ভিতর অদ্ভুত এক ইচ্ছে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। আর সেকথা লিখেছিলাম নদীর ধারে বেড়ানোর পোস্ট এ। লিখেছিলাম, ‘ক’দিন ধরে মনে হচ্ছিলো আশে পাশের কোন শহরে যাই।অচেনা পথে হেঁটে বেড়াই। শহরের পুরাতন কোন চার্চের বাইরের সিঁড়িতে বসে থাকি। ঘুরে ঘুরে বর্ণালী পাতার গাছের ছবি তুলি। পথে হেঁটে যাওয়া কোন পথিককে বলি আমার একটা ছবি তুলে দিতে। সে একটা না ছয়টা ছবি তুলে দিয়ে বলে,দেখো পছন্দ হয়েছে?’

অটোয়ার খুব কাছে কুইবেকের Wakefield শহরে গেলাম আজ।গ্যাতিনো পার হয়ে যেতে হয়।গ্যাতিনোর পাহাড়গুলোর গাছগুলো রঙিন হয়ে অবাক করা সুন্দর লাগছিলো।বলার নয়,লেখার নয়,শুধু চোখে দেখলেই সেই রঙ বোঝা যায়। মনেপড়ে প্রতিবছর Fall এর রং দেখতে Mont Tremblant এ নিয়ে যেতো।একসময় ব্লগে,পরে ফেইসবুক এ বহুবার বেড়ানোর গল্প লিখেছি।

মাত্র ৩০/৩৫ মিনিটের ড্রাইভ। সিলভার লেক,মীচ লেইক এ গেলেও এখানে যাওয়া হয়নি কখনো।La Peche মিউনিসিপালিটির একটা ছোট্ট গ্রাম Wakefield. গ্যাতিনো নদীর তীরেই riverside way তে কিছু দোকানপাট,রেস্টুরেন্ট, বাড়িঘর,হোটেল আর হাঁটার পথ। নদীর পার থেকে দেখা যায় লাল রং এর একটা ব্রীজ ।রাস্তায় মানুষ নাই বললেই চলে। সম্ভবত অটোয়া থেকে আসা কয়েকজন, যাদের সঙ্গেই পথ হাঁটতে, ছবি তুলতে দেখা হচ্ছিলো বারবার।

বুটিক দেখে আগের মত ঢোকার ইচ্ছে হলোনা। এই pandamic এসে ভিতরের অনেক অভ্যাস পালটে দিয়েছে।অযথা জিনিস কেনা হয়না। ভালোও লাগেনা।দোকানে ঢুকে অযথা জিনিস দেখলে দোকানীর ও মনে হয় ভালো লাগেনা। জিনিসপত্র ধরা যায়না।অনেক কড়াকড়ি। রেস্টুরেন্ট এ খেতে গেলে ভ্যাকসিন এর কাগজ দেখাতে হয়।পৃথিবীটা আসলেই আর আগের মত নেই!নদীর ধার থেকে লাল একটা ব্রীজ দেখা যাচ্ছিলো।

গাড়িতে গেলাম।গাড়ি পার্কিং ঠিক কোথায় জানিনা তাই ইমারজেন্সি দিয়ে কয়েকটা ছবি তুলে এসে পড়লাম। একটা স্কুলবাস এসে থামলো, একটা মেয়ে নেমে ব্রীজ দিয়ে অন্য পারে গেলো।কি ভীষন স্রোত নদীতে! ভয় লাগলো।একটা কফি শপ এ বসে কফি খাবার ইচ্ছেটা পূরণ হলোনা!ছুটির দিনে গেলে হয়তো এমন নির্জনতার মুখামুখি হতাম না। একলা এক ছায়ার সঙ্গে এই ভ্রমন খুব অল্প সময়ের অথচ স্মৃতিময় হয়ে গেলো।মানুষের জীবনটা আসলেই অদ্ভুত। বেঁচে থাকলে কত কিছু চলতে থাকে। মন চাইলে বেড়িয়ে পড়ি আজকাল!

রাশীক,বাসমাহ,রাইয়ান সবাই পড়া,কাজ নিয়ে ব্যস্ত !ওরা শুধু বের হতে বলে।আমিও দিনে দিনে ব্যস্ত হয়ে উঠছি।মনের ভিতরের শূন্যতাকে সঙ্গে নিয়েই পথ হাঁটতে হবে।তবু যারা এইসব কঠিন দিনগলোতে কাছে,দূরে থেকে সাহস দেয়। বলে বাঁচো। ঘুরে বেড়াও। যা মন চায় করো! তাদের জন্য ভালোবাসা।ভালো তো কিছু লাগেনা একা তবু এভাবেই একলাপনায় কত মানুষ পথ হাঁটে।দেখি আর ভাবি।প্রার্থনা করি কাউকে যেনো এমন সময়ের মুখামুখি না হতে হয়!

জীবনানন্দের ,’বোধ’ কবিতা আওড়াই।

“আলো-অন্ধকারে যাই—মাথার ভিতরে

স্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে;

স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়,

হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;

আমি তারে পারি না এড়াতে,

সে আমার হাত রাখে হাতে,

সব কাজ তুচ্ছ হয়—পণ্ড মনে হয়,

সব চিন্তা—প্রার্থনার সকল সময়

শূন্য মনে হয়,

শূন্য মনে হয়।

সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে।

কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে

সহজ লোকের মতো; তাদের মতন ভাষা কথা

কে বলিতে পারে আর; কোনো নিশ্চয়তা

…. ……………………………………………..

কে আর রহিবে জেগে পৃথিবীর ’পরে?

স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—কোন্ এক বোধ কাজ করে

মাথার ভিতরে।

……………………………………………..

তবু সে মাথার চারিপাশে,

তবু সে চোখের চারিপাশে,

তবু সে বুকের চারিপাশে;

আমি চলি, সাথে-সাথে সেও চ’লে আসে।

আমি থামি—

সেও থেমে যায়;

সকল লোকের মাঝে ব’সে

আমার নিজের মুদ্রাদোষে

আমি একা হতেছি আলাদা?

আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

আমার পথেই শুধু বাধা?

……………………………………………..

—তবু কেন এমন একাকী

তবু আমি এমন একাকী।

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box