ছিঁড়ে নিলো আমার ছেলেবেলার একটা টুকরো

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সংঘমিত্রা রায়চৌধুরী দাসগুপ্ত

(কলকাতা থেকে): আমাদের একান্নবর্তী গৃহস্থালিতে প্রায় সব বিষয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি ছিলো বড়কাকুদাদু-র। জামাইষষ্ঠীর মেনু, বাড়িতে কারো বিয়ে হলে নিমন্ত্রিতের তালিকা, রোববার দুপুরে পাঁঠার মাংস হবে না কালোজিরে-বেগুন দিয়ে ইলিশের পাতলা ঝোল, পুজোয় কুটুমবাড়িতে উপহারে কী যাবে… সব বিষয়ে। পেইটার ফ্যামিলিয়াস-এর এক্কেবারে কপিবুক সংস্করণ যাকে বলে।বড়কাকুদাদু….আমার বাবার বড়কাকা। অকৃতদার, বদমেজাজী, প্রভুত্বপ্রিয় এবং চরম রক্ষণশীল, মনের মধ্যে ভালোবাসার যে উষ্ণ প্রস্রবণটি ছিলো তা সন্তর্পণে গোপন করে রাখতে সদাসচেষ্ট। যে মতামতই কেউ দিক না কেন যে কোনো ব্যাপারে, সেটা ওঁর মতের সঙ্গে মিললে তবেই গ্রাহ্য হবে সবাই জানতো, তাই মতামতটত দিয়ে কেউই সাধারণত ঝামেলা বাড়াতো না। ব্যতিক্রম আমার বাবা। খুব প্রিয় ভাইপো, বাবার ওপর খুব নির্ভরও করতেন অনেক ব্যাপারে, কিন্তু কথা কাটাকাটি থেকে তর্কাতর্কি হয়ে কখনো কখনো ঝগড়া অবধি গড়াতো যার সঙ্গে,সেও আমার বাবাই।সুতরাং ঘাড়-ব্যাঁকা স্বভাবটা পেয়েছি, বুঝতেই পারছেন, কিছুটা উত্তরাধিকারসূত্রে।

তা এহেন মানুষটির কড়া নজর ছিলো যাতে ব্যয়সংকোচ আর যে ব্যাপারেই হোক খাওয়া দাওয়াতে না হয়। তরিতরকারিই বলুন বা মাছমাংস অথবা অন্যান্য শৌখিন খাবার, কোয়ালিটি হতে হবে সেরা। এই সেরা চেনার মাপকাঠি ঠিক কী ছিলো জানি না, তবে ছোটোবেলায় দাদুর সঙ্গে মাঝেসাঝে বাজারে গিয়ে কেন যেন ধারণা জন্মেছিলো যে সমস্ত দোকানী ‘স্যার’ বা ‘ সাহেব’ বলে ডাকতো তাদের প্রতি ওঁর একটু পক্ষপাতিত্ব ছিলো। দামোদর ভ্যালী কর্পোরেশনের বড় অফিসার ছিলেন,খুব সুনামের সঙ্গে চাকরি করেছেন সারাজীবন, বহু আত্মীয়-অনাত্মীয়কে চাকরি দিয়েছেন ডিভিসি-তে, স্যার/সাহেব সম্বোধন শোনার মোহটা সম্ভবত রয়ে গিয়েছিলো অবসরোত্তর সময়েও। চা-পাতা বলুন বা সিঙ্গারা, বাঁধাধরা দোকান ছিলো দাদুর। গাঙ্গুরামের ‘রসরাজ’ বা সেনমহাশয়ের ‘পারিজাত’ সন্দেশের প্রতি আমার আবাল্য আকর্ষণ দাদুর কারণেই। কোল্ডড্রিংক মানেই বিজলীগ্রিলের আইসক্রিম সোডা, অন্য কোনো ঠান্ডা পানীয়-র প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিলো আমাদের বাড়িতে। প্রতিবছর লক্ষ্মীপুজোয় রানাঘাট থেকে অর্ডার দিয়ে স্পেশ্যাল পান্তুয়া আনাতেন।ভীষণ প্রিয় ছিলো সূর্য মোদকের জলভরা সন্দেশ।

আর প্রিয় ছিলো কেক। শীতের হাওয়ার নাচনটি শুরু হতে না হতেই ক্রীসমাস কেক আনা শুরু হতো আমাদের বাড়িতে। এত রকমারি কেকের দোকান ছিলো না তখন,ক্যাথলীন বোধহয় সদ্য পৃথিবীর আলো দেখেছে আর মনজিনিস (অধুনা মিও অ্যামোরে), কুকিজার তখন কোথায়! কেক বলতে দাদু বুঝতেন শুধুই ‘নাহুমস্’। নিউমার্কেটে কতবার যে গেছি ওদের দোকানে, দাদুর সঙ্গে! ঠিক কোন কেকটা আমার তখন খেতে ইচ্ছে করছে জানতে চাইতেন না বটে কখনো, তবে কিনে দিতেন কিন্তু সবচেয়ে দামীটাই।

আজ সকালে খবরের কাগজের প্রথম পাতায় ‘নাহুমস্’-এর নামটা দেখে এক ঝটকায় অনেকগুলো কথা মনে পড়ে গেলো তাই। ওরা নাকি অস্বাস্থ্যকরভাবে কেক বানাচ্ছে, পুরসভার স্বাস্থ্য আধিকারিকদের মতে। হবেও বা! তবে মনখারাপ হলো খুব।মায়াহীন মুঠোয় কে যেন ছিঁড়ে নিলো আমার ছেলেবেলার একটা টুকরো, আমাকে না জিজ্ঞেস করেই….

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]