ছিলেন আমাদের একজন মুশতারী শফী

লুতফুন নাহার লতা

বেগম মুশতারী শফী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যার নিজের ও পরিবারের অবদান অকল্পনীয়। যার জীবন বদলে দিয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। এদেশের মাটি রক্ত রঞ্জিত হয়েছে তাঁর প্রাণ প্রিয় ছোট ভাই এবং স্বামীর রক্তে। মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব প্রস্তুতি সহ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম একজন উদ্দোক্তা ছিলেন তিনি। শিল্পী, সংগঠক, সাহিত্যিক, মুক্তিযোদ্ধা, নারীনেত্রী, ও শহীদ জায়া তিনি। ২০ ডিসেম্বর ২০২১ এ চিকিৎসারত অবস্থায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরন করেন চির প্রণম্য এই মানবী। তাঁর  প্রতি আনত হই শ্রদ্ধায়। তিনি ছিলেন এক সাহসী প্রাণ। এক সাহসী যোদ্ধা আর এভাবেই বেড়ে উঠেছিলেন তিনি।

ফুলেল-শ্রদ্ধায়-সিক্ত-একাত্তরের-শব্দসৈনিক-মুশতারী-শফী

বেগম মুশতারির পিতার কর্মস্থল ছিলো তৎকালীন বৃটিশ ইন্ডিয়ার কোলকাতা শহরে। ১৯৩৮ সালের ১৫ ই জানুয়ারি সেই সূত্রে তিনি মালদাতে জন্ম গ্রহন করেন। পুতুলের মত দেখতে ছিলেন বলে তাঁর ডাক নাম ছিলো ডলি। বাবার নাম খন্দকার নজমুল হক আনসারী। বাবা ছিলেন একজন ডি এস পি। ডেপুটি সুপার অব পুলিশ। বেগম মুশতারি শফির নানাও ছিলেন পুলিশের আই জি এবং আঙুলের রেখায় বা টিপ সই থেকে আলাদা ভাবে মানুষকে সনাক্ত করন প্রক্রিয়ার আবিস্কারক। এজন্যে বৃটিশ সরকার তাঁকে খান বাহাদুর উপাধি দিয়েছিল। ওনার বাবা ছিলেন শিল্প সাহিত্যের অনুরাগী এবং নাটক অন্তপ্রাণ। তিনি নাটকের মঞ্চ তৈরি  করে নিয়মিত নাটক করতেন। তাঁর পূর্বপুরুষের পরিবার বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলা নিবাসী ছিলেন। উনারা শুরুতে ছিলেন চার ভাই চার বোন,  তিনটি ভাই খুব ছোট বয়সেই মারা যায়, একমাত্র ছোট ভাইটি  ১৯৭১ সালে পাকিস্তান  মিলিটারির হাতে শহীদ হবার আগ পর্যন্ত উনার কাছেই ছিলেন।

বাবা মায়ের মৃত্যুর পরে, ডলি ছিলেন বড় বোনের কাছে। সেখানে মাত্র ১৫ বছর বয়সে ডাঃ শফির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। বিয়েতে তিনি রাজি ছিলেন না। তিনি চেয়েছিলেন আরো পড়াশোনা করতে কিন্তু পিতৃহীন মেয়ের দায় নেবার কেউ ছিলনা। বিয়ে হয়ে গেল বটে তবে ডাঃ শফি ছিলেন উদার মুক্ত মনের মানুষ। নারীর শিক্ষা ও স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন। নিজের অদম্য আগ্রহ ও স্বামীর প্রেরণায় গড়ে তোলেন ‘বান্ধবী সংঘ’।  মাসিক ‘বান্ধবী’ পত্রিকা  ও সম্পূর্ণ মেয়েদের দ্বারা পরিচালিত ‘মেয়েদের প্রেস’।

ডা: মোহাম্মদ শফী

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই এপ্রিলের ৭ তারিখে স্বামী ও একমাত্র ভাইটিকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি মিলিটারী। বেগম মুশতারি শফি সেদিনই অন্ধকার বৃষ্টির সেই রাতে সাতটি সন্তান সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পায়ে হেঁটে পালাতে থাকেন। কিছুদিন সময় লেগে যায় তার পথে,  এবং নানা জায়গায় আশ্রয় নেবার পরে একসময় শ্রীনগর বর্ডার ক্রস করে আগরতলায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। আগস্টের মাঝামাঝি আবার তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গিয়ে যোগ দেন। যা তিনি নিজের ঘরে বসে একদিন গড়ে তোলায় সঙ্গী হয়েছিলেন।

১৬ ই ডিসেম্বর যুদ্ধ থামলো, দেশ স্বাধীন হলো বটে কিন্তু বেগম মুশতারি শফির স্বামী ও ভাই, তারা আর ফিরে আসেননি কোনদিন। তাঁর জীবনে শুরু হলো আরেক মুক্তিযুদ্ধ। সাতটি সন্তানের সকল দায় মাথায় নিয়ে যুদ্ধ বিধ্বস্ত স্বদেশের মাটিতে সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়েন। এক সমুদ্র পাড়ি দিয়ে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের কষ্ট বুকে নিয়ে তিনি চলে গেলেন। আমাদের অশ্রুরুদ্ধ মুখ ঢেকে যায় তাঁর এই বেদনার ইতিহাসে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর এই সকল অবদানের জন্যে তিনি ২০১৬ সালে বাংলা একাডেমি অনারারি ফেলো হিসেবে মনোনিত হন।

অক্লান্ত লেখালেখির জন্য তিনি ২০১৭ তে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার পান এবং ২০২০ সালে বেগম রোকেয়া পদকে ভূষিত হন।

১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গে একটি ইন্টার ভিউতে বলেন…

আমার গৃহেই তো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গড়ে ওঠে আমার গৃহেই ২৬ মার্চ সকাল বেলা (১৯৭১ সাল)। প্রধান উদ্দোক্তা প্রতিষ্ঠাতা সহ পাঁচজন আমার গৃহে অবস্থান করছিলেন এই মুশতারি লজে। সেখান থেকে গিয়ে তাঁরা কালুরঘাট বেতার ট্রান্সমিশান ভবন থেকে প্রথমে ‘বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ বলে ঘোষনা দেন ওই ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে। সেই থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত আমি যুক্ত। আমরা তখন রেডিও আকাশ বাণী শুনতাম। যদিও শোনা নিষিদ্ধ ছিলো তো আমরা লুকিয়ে শুনতাম।

আকাশবাণী , বি বি সি, ভয়েস অব আমেরিকা, ইত্যাদি শুনে, ওখানকার যে সমস্ত আলোচনা পর্যালোচনা বাংলাদেশ সম্পর্কে হতো, সেগুলোর উপরে ভিত্তি করে এবং কিছু লোকমুখে শোনা কথা দিয়ে আমরা নিউজ বুলেটিন তৈরি করে দিতাম। আমরা রাত জেগে জেগে মোমের আলোতে, সেসময় ইলেক্ট্রিসিটি ছিলনা আমি আর আমার ছোট ভাই নিউজ বুলেটিন লিখে দিতাম। পরদিন সকালবেলায় বেলাল মোহাম্মাদ সহ তারা গিয়ে সেটা প্রচার করতেন। এই ভাবে আমি স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনা লগ্ন থেকে যুক্ত।

৩০ তারিখে ( মার্চ) কালুর ঘাট বেতারের উপরে পাকিস্তানিরা বুঝতে পেরে বম্বিং শুরু করে, বাংলাদেশের প্রথম বম্বিং কালুর ঘাট বেতারের উপর। যখন বম্বিং হলো, বম্বিং হবার পরে এদের সঙ্গে আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। আর দেখা নেই। পরে শুনেছি এরা একটা এক্সট্রা শর্টওয়েভ মেশিন ছিলো আমাদের কালুর ঘাট বেতারে সেইটা কোন রকমে তুলে নিয়ে ট্রাকে করে রামগড় বর্ডার পার হয়ে বাগাফর টি এস্টেটের ভেতরে ইনেস্টলেশন করে আবার এই বেতার কেন্দ্র চালু করে।

সেই বেতার কেন্দ্র, এই আমি- যখন আমার হাজব্যান্ডকে ডাক্তার শফি ও আমার ছোট ভাইকে ধরে নিয়ে গেলো তখন আমি ৭ টি ছেলেমেয়ে নিয়ে পায়ে হেঁটে পালাতে লাগলাম। পালিয়ে প্রথমে আশ্রয় নিলাম মিরেরশ্বরাই সুফি আব্দুল লতিফ সাহেবের খানকাশরীফে। সেখানে এপ্রিলের শেষের দিকে আমি শুনতে পেলাম রেডিওতে বেলাল মোহাম্মাদের কন্ঠ, আব্দুল্লাহ আল ফারুকের কন্ঠ, আবুল কাশেমের কন্ঠ, এরা সবাই আমার বাড়িতে ছিলেন। এবং সেই সঙ্গে কিছু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ব্যাঙের ডাক ইত্যাদি একটা জঙ্গলের এফেক্ট পাচ্ছিলাম তাতে আমি অনুমান করলাম এরা কোন একটা জঙ্গলের ভিতরে গিয়ে ঐ বেতার চালু করেছে। খুব ক্ষীণ, শোনা যাচ্ছিলো, খুব আস্তে। দু’দিন শুনেছি পরে আর যোগাযোগ করতে পারিনি।

আমরা মে মাসে চলে যাই এই বাচ্চাদেরকে নিয়ে পায়ে হেঁটে ভারতে। ছাগল নাইয়ার উপর দিয়ে হেটে শ্রীনগর বর্ডার ক্রস করি। প্রথমে উদয়পুর তারপরে আগরতলা। আগরতলায় গিয়ে ফার্সট এইড ট্রেনিং নিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের হাসপাতালে সেবা করা, শরনার্থি শিবিরে বক্তৃতা দেয়া, রিলিফ সামগ্রি বিতরন করা ইত্যাদি কাজে যুক্ত হই। যখন পাকিস্তারিরা আগরতলায় শেলিং করলো আগস্টের মাঝামাঝি তখন আমি কোলকাতায় চলে যাই। ১৭ ই এপ্রিলে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হবার পর মে মাসের দিকে ভারত সরকার দেখলো যে এই শর্ট ওয়েভ রেডিও বেশিদূর যাচ্ছে না। ফ্রিকোয়েন্সিটা কম। তখন ভারত সরকার আমাদের সাহায্য করলেন, একটা ৫০ কিলোওয়াট মেশিন আমাদেরকে দিলেন। সেই মেশিন দিয়ে স্বাধীন বাংলা ৩য় পর্যায়ে , কালুর ঘাট, আগরতলা ও শেষে কোলকাতায় শুরু হলো । আমি আগস্টের মাঝামাঝি যুক্ত হই একদম শেষ পর্যন্ত, শুরু থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত আমি ছিলাম।

প্রথমে নিউজ বুলেটিন তৈরি করতাম।পরে যখন আগস্ট মাসে গিয়ে আমি যোগদান করি তার পর থেকে সেখানে চুক্তির ভিত্তিতে প্রতি সপ্তাহে আমার নিজের লেখা ‘বাংলার রণাঙ্গনে নারী’ শীর্ষক ৫ মিনিটের কথিকা প্রতি সপ্তাহে প্রচার করতাম। এ ছাড়াও অগ্নিশিখা নামে একটি অনুষ্ঠান হতো সেখানে মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্যের মত অমৃতাক্ষর ছন্দে  ভাষা সৈনিক এডভোকেট গাজীউল হক ‘এহিয়া বধ কাব্য’ লিখতেন। এটা ছিরো প্রতিদিনকার নিউজ কোথায় পাকিস্তানিরা হামলা করছে, কোথায় মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করছেন, কোথায় কতজনকে মেরে ফেলেছে কিম্বা জাতিসংঘে আমাদের যুদ্ধ সম্পর্কে কি কথা হচ্ছে। কারা ভেটো দিচ্ছে। এগুলো নিয়ে লেখা হতো। সেগুলো আবৃত্তি করতাম আমি ও আশফাকুর রহমান নামে একজন বেতার কর্মচারী। আরো একটি অনুষ্ঠান করেছি কল্যান মিত্রের ‘জল্লাদের দরবার’ নামে নাটক – নারায়ন ঘোষ মিতা , রাজু আহমেদ, মাধুরী চ্যাটার্জি, চাঁদ প্রবাসী এনারা ছিলেন জল্লাদের দরবারে।, জাহিদ সিদ্দিকি নামে আর একজন উর্দূ নাটিকা লিখতেন পাকিস্তানিদেরকে খোচা দিয়ে উর্দূ ভাষায় লিখতেন, সেখানে ছিলাম মহিলা চরিত্রে আমি আর পারভিন হোসেন। ডাক্তার টি হোসেনের ওয়াইফ। পুরুষ চরিত্রে ছিল আলী যাকের আর  ফিরোজ নামের একজন। এইভাবে স্বাধীনবাংলা বেতারের শেষ পর্যন্ত কাজ করেছি। জীবন যুদ্ধ করতে করতে আমার স্মৃতি দূর্বল হয়ে পড়েছে। সাতটি ছেলে মেয়ে নিয়ে জীবন যুদ্ধ করেছি। সমুদ্র সাতার কেটেছি বলতে পারো।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রকে বলা হয় মুক্তিযুদ্ধের ২য় রণাঙ্গন । চট্টগ্রামের অনেক শিল্পী ছিলেন সেখানে, প্রবাল চৌধূরী, উমা খান , কল্যানী ঘোষ , শেফালী ঘোষ, মিহির লালা, জয়ন্তি লালা, ডঃ আনিসুজ্জামান, এম আর আখতার মুকুল- চরম পত্র। রাজশাহী ও ঢাকা বেতারের অনেক শিল্পী কর্মচারীও ছিলেন আমাদের সঙ্গে। শামসুল হুদা চৌধূরীও।  স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সমাপ্তি ঘটে ৬ই ডিসেম্বর ভারত যখন বাংলাদেশ কে স্বীকৃতি দিলো।  আর তখনই নামটা চেঞ্জ হয়ে গেলো ‘বাংলাদেশ বেতার মুজিবনগর’ হলো। এই নামেই প্রচার হতো। ২২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার যখন ঢাকায় এলো, তখন রানিং অনুষ্ঠান হচ্ছিলো। প্রচার হলো স্বাধীন বাংলা বেতার ঢাকা নামে। পরে মাঝখানে একটু বন্ধ হয়েছিলো আবার কোলকাতা থেকে চললো। সেখানে বেলাল মোহাম্মাদ, কামাল লোহানী, অজিত রায় এরা সবাই ছিলো। সেখান থেকেই চলেছে জানুয়ারী মাসের ২ তারিখ পর্যন্ত।

১৬ ই ডিসেম্বর যখন সারেন্ডার হয় সেদিনের অনুভুতি আমি বোঝাতে পারবো না । আনন্দ এমন হয়েছিলো কেবল মনে হচ্ছিলো আমি কেন থাকতে পারলামনা এসময় বাংলাদেশে। কিন্তু কোলকাতায় আছি বলে সেই আনন্দ দেখেছি কোলকাতার সমস্ত মানুষের মধ্যে। জনগন রাস্তায় নেমে এসেছিলো, আর হাওয়াই আতশ বাজি আকাশে উড়েছিলো। হাওয়াই বাজির ভেতরে শেখ মুজিবের মুখ , ইন্দিরা গান্ধীর মুখ।  রাস্তায় রাস্তায় শেখ মুজিবের ছবি , ইন্ডিরা গান্ধীর ছবি নিয়ে  মিছিল হচ্ছে ঢাক ঢোল বাজিয়ে। ব্যন্ড পার্টি বাজিয়ে। কি আনন্দ!

ওরা ঘরে ঘরে মিষ্টি বিতরন করছে। আমাদের যেনো ঈদের আনন্দ। এই রকম কোলাকুলি করছে। পুজার আনন্দ ঈদের আনন্দ সব মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছি। আমি ভাষায় ব্যক্ত করতে পারছি না যে কি সেই আনন্দ! একদিকে আমার চোখের পানি। আনন্দ স্রোত। একদিকে আমি আশান্বিত হচ্ছি হয়ত আমার স্বামীকে , আমার  ভাইকে ফিরে পাব। আর একদিকে এই মূহুর্তে আমি দেশে থাকতে পারছি না কেন! এই মিশ্রনে একরকম অনুভূতি বাচ্চাদেরকে নিয়ে।

নতুন প্রজন্মের জন্যে বলবো ইতিহাস জানতে হবে। সঠিক ইতিহাস। আজকে চল্লিশ বছরে ইতিহাসের অনেক বিকৃতি ঘটছে। এই স্বধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নিয়েও অনেক বিকৃতি ইতিহাসের, যে যেদিক দিয়ে পারছে বলছে, আসল সত্যটা বলছেন না ।

প্রত্যেকে নিজেদের কৃতিত্বটা জাহির করছে ফলে ইতিহাস বিকৃতি ঘটছে। বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস আমাদের পাঠ্যপুস্তকেও লিখিত হয়নি, যার ফলে এই তরুন প্রজন্ম অনেক খানি দূরে আছে। আমি এই প্রজন্মকে বলব সঠিক ইতিহাস জানতে। কারন আজকের প্রজন্মের পূর্বপুরুষেরা কেউ না কেউ এই দেশটাকে স্বাধীন করার জন্যে প্রাণ দিয়েছে।

‘স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন’বেগম মুশতারী শফীর লেখা এক ঐতিহাসিক দলিল বটে। মুশতারী শফী মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন। যার মধ্যে ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের নারী’। ‘চিঠি’ জাহানারা ইমামকে এবং উপরোক্ত  ‘স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন’। এছাড়াও প্রচুর প্রবন্ধ, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনী, কিশোর গল্পগ্রন্থ, স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ লিখেছেন। তাঁর ভ্রমন বিষয়ে লেখা বই ‘আমি সুদূরের পিয়াসী’, স্মৃতির স্মারক গ্রন্থ, ‘স্মৃতিতে অমলিন যারা’, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছোটগল্পের সংকলন ‘দুটি নারী ও একটি মুক্তিযুদ্ধ’, ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ ও ‘একুশের গল্প’সহ প্রভৃতি অন্যতম।

আমাদের অশ্রু ও বিজয়ের ইতিহাসে যে গৌরব গাথা ওনারা গড়ে তুলেছিলেন একদিন, আজ তাঁর জীবনাবসানে সেই ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায়ের অবসান হয়ে গেল!

এই দেশকে তিনি দিয়েই গেলেন কেবল, বিনিময়ে দেশ বা রাস্ট্রের কাছ থেকে কি পেলেন সে কথা না ই বললাম তবে প্রশ্ন তো আসে মনে! কেন উনি একুশে পদক পেলেন না! কেন উনি স্বাধীনতা পদক পেলেন না! কেনই বা মহা অযোগ্য কেউ কেউ এই সব পদক পেয়ে গেলেন!!  উনি এ নিয়ে মাথা ঘামান নি। নিজের বাড়িতে গড়ে তুলেছেন স্কুল। শিশুরা সেখানে পড়ছে তাদের ভালোবাসা উনি পেয়েছেন! আর অগনিত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। মানুষের শ্রদ্ধা পেয়েছেন। আমার মনে পড়ছে সেই দিনটির কথা, যেদিন আমাদের আম্মা, শহীদজননী জাহানারা ইমামের মরদেহ আমেরিকা থেকে দেশে আসে, সেদিন ঢাকার শহীদ মিনারে অপেক্ষমান ছিলাম আমরা। বেগম মুশতারী খালাম্মার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। কথার এক পর্যায়ে বলেছিলেন নিত্যদিনের সংগ্রামের কথা, সদ্য স্বাধীন দেশে জীবন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা। সেসময় কোনদিন ছেলে মেয়ের পাতে আস্ত একটুকরো মাছ তুলে দিতে পারেননি সেই বেদনার কথা।

তারপর কথা হতো মাঝে মাঝে, বিশেষ করে ১৯৯৬ তে রাজনৈতিক অন্যায়ের শিকার জেনারেল নাসিম ইস্যুতে আমার গড়ে তোলা আন্দোলনের দিনগুলোতে চট্টগ্রাম থেকে দুটি ফোন আমাকে সাহস জোগাতো, অধ্যাপক  ডক্টর আবুল কালাম মঞ্জুর মোর্শেদ আর মুশতারী খালাম্মা। তখন একদিন ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এর থার্ড গেটের কাছে  কুইন্স বেকারিতে গিয়েছিলাম। পাউন্ড কেক কিনতে। বিকেলের দুধ চায়ে আমার প্রিয় পাউন্ড কেক কিনতে গিয়ে পরিচয় হলো ওনার কন্যা ও জামাতা কর্নেল নজরুলের সঙ্গে, কথা ছিলো উনার কাছে একবার একসঙ্গে যাব আমরা।

এই তো কিছুদিন আগের কথা, কানাডাতে থাকা আমার লেখক বন্ধু রঞ্জনার সঙ্গে কথা হয়েছিলো যোগাযোগের। আমি চেয়েছিলাম তাঁকে , আমার  ‘অশ্রু ও বিজয়ের গাথা’ অনুষ্ঠানের জন্যে। এই মার্চেই কথা ছিলো সেই আয়োজনের।

আর তো হলোনা দেখা, আর শোনা হলোনা তাঁর অশ্রুর কথা। তাঁর  বিজয়ের কথা। ফেসবুকে আসিফ উদ দৌলা ভাই জানালেন তাঁর অনন্ত যাত্রার কথা। সময় হিসেব করে দেখলাম সেসময় এখানে সাড়ে চারটা বাজে। অতি প্রত্যুষ! আমি ঘুম থেকে উঠেছি স্কুলে যাবার আয়োজনে, জানালা দিয়ে তখনো চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছিলো আমার শোবার ঘর। কাল মাঝরাতে আমি আকাশ জুড়ে উড়ন্ত পাখিদের কঁক, কঁক,ক্যাঁক কোঁক, কোঁক ডাক শুনেছি, ওরা পূব থেকে পশ্চিমে উড়ে যাচ্ছিল। আজ কিন্তু  খুব খু-উ-ব ঠান্ডা পড়েছে প্রিয় খালাম্মা! আজ আপনার অনন্ত মুক্তির দিন ।সকল যুদ্ধ জয়ের দিন। আজ আপনি চলেছেন অনন্তের পানে এক আলৌকিক আলোকযানে, মন ভোলানো মোহন তানে গান গাহিয়া…সেখানে অপেক্ষায় আছেন আপনার আদরের একমাত্র ভাইটি সেই যে যাবার বেলায় অশ্রু সজল চোখে চেয়েছিলো আপনার দিকে, আর আছেন ডাঃ মোহাম্মাদ শফি যিনি একটি স্বাধীন স্বদেশ দেখবেন বলে বুকের ভেতর বারুদ পুরে রেখেছিলেন!!

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া বাংলাপিডিয়া৷ বেগম মুশতারী শফির বই, এবং তাঁর উপরে নির্মিত ডকুমেন্টারি ও ইন্টারভিউ।

ছবি: গুগল

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box