ছিয়াত্তর সালে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মুকুট

(ভার্জিনিয়া আমেরিকা থেকে): পুরানো একটা কথা মনে করে নিজের মনের মধ্যে হারিয়ে গেলাম। উনিশশো ছিয়াত্তর সাল, ‘শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন’| নামেই ক্যান্টিন, ঢাকা ইউনিভার্সিটি এর চত্বরে, লাইব্রেরির সামনে ঘেষা বড় বড় গাছের নিচে, বাশের খুঁটিতে বাধা দুই পাশে কোনো রকমে অর্ধেক বেড়া দেওয়া ছোট্ট একটা টিনের চালার ছাউনি। কোত্থেকে যেনো জোগাড় করা নড়বড়ে দু‘টো কাঠের টেবিল আর তার সাথে লম্বা দুটি বেঞ্চ, কোনো রকমে আঁটে ওই সামান্য জায়গায়।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

রান্নার চুলা বাইরে খোলা জায়গায়। সাহিত্যিক, শিল্পী মেজাজি আর গাঁজাখোর ছাড়া আর তেমন কেউ আসতো না| কল্কির আড্ডা ছিলো না, তবে সিগারেটের ভেতর গাঁজা পুরে খাওয়ার ভালো চল ছিলো। আমাদের সিগারেটের পয়সা তখন ভুতে যোগাতো| এর মধ্যে সাহিত্য আলোচনা, সমালোচনা, গদ্য, কবিতা, স্বরচিত আবৃত্তি, ভাবের আদান প্রদান, তর্ক, বিতর্ক সবই হতো সেই ক্যান্টিনে। তবে কখনো অতি উচ্চ স্বরে হৈচৈ বা রাগারাগি ঝগড়াঝাটি হতে দেখিনি। বয়সের কোনো ভেদাভেদ ছিলো না। পুরোনোদের অভিজ্ঞতার প্রথিত প্রত্যয় আর নতুনদের নুতন কিছু সৃষ্টির অদম্য শক্তি, সহজেই তাদেরকে টেবিলে মুখোমুখি বসার আয়জন করে দিতো। সব সময়ই কাউকে না কাউকে ওই শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে পাওয়া যেতো। সারাদিনই কেউ আসছে, কেউ যাচ্ছে|
নির্মলেন্দু গুন, নুরুল হুদা, মহাদেব সাহা, আহমদ ছফা, সফদার সিদ্দিকী, আফসান চৌধুরী, রুদ্র মোহাম্মদ শাহিদুল্লা, মোহাম্মদ মোমেন, ইফতেখারুল ইসলাম, মইনুল আহসান সাবের, মাইনুস সুলতান, কামাল চৌধুরী, জাফর ওয়াজেদ, আলী রীয়াজ , মিশুক মুনির, তারেক মাসুদ, আলমগীর রেজা চৌধুরী সহ আরো অনেকে আসতো। এদের মধ্যে কেউ কেউ যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত ছিলো, আবার কেউ কেউ তাদের পরিচিতির শুরুর দিকে। এরা সবাই এখন স্বনামধন্য. ইউনিভার্সিটির বিশাল ক্যাম্পাসে এই ছোট্ট দেয়াল-বিহীন ছাপড়াটা কিভাবে সেই সৃজনশীল প্রতিভাধরদের মুক্ত চিন্তার ছাউনি আর সৃষ্টির আশ্বাস দিত, তা এখন ভাবলে অবাকই লাগে। বহু পুরানো এই গাছের শেকড়ের পাশে, প্রবল সম্ভাবনা নিয়ে বেড়ে ওঠা ক্ষুদ্র তৃণের মতো ছিলো সেই ছাপড়া ক্যান্টিনের অবস্থান|

নুরুল হুদা, আবুল হাসান ও সাবদার সিদ্দিকী

আমাদের সবারই তখন মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া লম্বা চুল। মনে হয় ছোট চুলওয়ালা বর্বর পাকিস্তানী সেনাদের উপর প্রচন্ড ঘৃণাবোধ থেকে এই সিদ্ধান্ত ।সবার মধ্যে নির্মলেন্দু গুনের চুল দাড়ি ছিল সবার চেয়ে আদি এবং অধিক| গুনদা’র দুর থেকে লম্বা পা ফেলে হেঁটে আসাটা ছিলো লক্ষ্যণীয়। শীর্ণ দেহে, বাতাসে ওড়ানো ছড়ানো চুলের বিপরীতে, চারপাশে আকড়ে ধরা বাস্তবতা উপেক্ষা করে, দৃঢ় পায়ে হেঁটে আসতেন কবি| গায়ে লম্বা গেরুয়া পাঞ্জাবি আর সাদা পায়জামা, মাথা উঁচু করে দূরে কোনো শূন্যতায় স্থির দৃষ্টি রেখে এগুতেন. দেখলে মনে হতো হ্যাঁ, কবি আসছেন। তার আবির্ভাব এবং উপস্থিতি ছিলো টের পাওয়ার মতো। আড্ডার টেম্পারেচার স্বাভাবিক ভাবেই বেড়ে যেত।
ক্যান্টিনে অন্যদের থেকে সফদার সিদ্দিকীকে বেশি দেখা যেত। মুক্তি বাহিনীতে যুদ্ধ করা সফদার সিদ্দিকীর কবিতার লাইন “কুমারীর বেণীর মত আঁকাবাঁকা ট্রেঞ্চ” তখন ভীষণ পরিচিত ছিলো। তার এলোমেলো আর বোহেমিয়ান স্বভাবের জন্য, আমাদের মতো পাগলরাও ওকে পাগল ভাবতাম| চালের বস্তা খুলে চটের ছালা দিয়ে নির্বিকার জামার মত গায়ে পড়ে থাকতো, যেনো নিজেতে ধারন করা, সাধারণ আর সনাতন শ্বাভাবিক এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ, সামান্যকে মরযাদা দেয়ার দাবিতে কোনো কঠিন বক্তব্য সে নিজেই। এইসব খদ্দেরদের নিয়ে কিভাবে দোকানের ব্যবসা চলতো কে জানে!
সামান্য চায়ের দোকানের মালিক শরীফ মিয়ারও নিশ্চয়ই একটা শৈল্পিক মন ছিলো। তার প্রধানত চায়ের-ই দোকান ছিলো ওটা, তবে মাঝে মাঝে দুপুরে তেহারি বেঁচতো শরীফ মিয়া। চায়ের পেয়ালা সাইজের প্লেটে সাদা ভাতের মধ্যে গরুর মাংসের টুকরা খুঁজে বের করতে হয় এমনই ছিলো সেই তেহারি। তিন টাকা প্লেট। খালি পেটে চুলায় রান্নার গন্ধ ক্ষুধায়

নির্মলেন্দু গুণ

অস্থির করে তুলতো। আমরা মাঝে মাঝে যার পকেটে যা আছে জড়ো করে শেয়ার করে খেতাম, তবে সবদিন তা-ও হতো না।
সেদিন রুদ্র, আমি, সফদার সিদ্দিকী আর আরো কয়েকজন দুপুরে ক্যান্টিনে বসে আছি। যথেষ্ট গরম, বাতাস নেই, আমাদের পেট আর পকেট দুটাই খালি, কেউ কথা বলছে না। কিছুক্ষণ পর পর ষ্টার সিগারেট টানছি, শেয়ার করছি। যে যার চিন্তায় আছি। এমন সময় খালি গায়ে হাঁটু পর্যন্ত লুঙ্গি উঠানো, কম বয়সী ছোকরাটা দোকানে ঢুকলো, স্যার চা দিমু। ছেলেটা সহযোগীর কাজ করতো ক্যান্টিনে। মজার মজার কথা বলতো খুব। ছেলেটার কী এক মজার কথায় রুদ্র ওর কন্টেজিয়াস সুড়সুড়ি দেয়া হাসিটা শুরু করলো। সঙ্গে আমরাও শুরু করে দিলাম। অনেক হেসেছিলাম সেদিন। রুদ্রের হাসির একটা বৈশিষ্ট ছিলো| ও অট্টহাসি হাসতে পারতো না, সুড়সুড়ি দিলে যেরকম, সেরকম হাসি হাসতো। মাঝে মাঝে অনেক হাসতো। সুখের না দুঃখের হাসি, তা কেবল ও-ই জানতো।
গুনদা‘র যেমন হেঁটে আসাটা লক্ষণীয় ছিল, তেমনি ছিলো রুদ্রের প্রস্থান| দিনের শেষে রুদ্র, নিঃশব্দে উঠে, ধীর পায়ে, দৃষ্টি সামান্য নিচে রেখে, যেন মাথা ভরা চুলের মতো কবিতার ভারে কিছুটা ন্যুব্জ, চারিদিকের সব আলিঙ্গন ছিঁড়ে কী এক অজানা অভিমানে, কিছুটা বিষন্ন মনে, কবি যেতেন। চলে যেতেন নীরবতার দিকে, একা|
এরকম অনেক সময় কেটেছে এই শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে। ঝড় বৃষ্টিতে ক্যান্টিনের চারপাশে গাছের অনেক ঝরা পাতা পড়ে ভিজে মাটিতে আটকে থাকতো, যেন ওরা থেকে যেতে চাইতো ওখানেই। আবার এক সময় সেগুলো রোদে শুকিয়ে গিয়ে বাতাসে একটু একটু করে সরে যেত দূরে, দুরে কোথাও, স্মৃতির মত; চোখের আড়ালে।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]