ছেলেটা…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জয়দীপ রায়

(কলকাতা থেকে): একজন ছেলে আছে। বাঁশি বাজায়। আর যার যখন যা দরকার মানুষ তাকে ফোন করে। সে বাঁশি থামায়। কাজটা করে দেয়। পাড়ার রিক্সাওয়ালা যখন করোনাআক্রান্ত সন্তানকে কলকাতায় হসপিটালে নিয়ে যেতে বাড়ির দলিল হাতে ঘুরে বেড়ায়, ছেলেটা তখন অন্য কাউকে ভালবেসে সাহায্য করতে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলো রাস্তা দিয়ে। ছেলেটা অনেকটা দেয়। আর একজনের কাছ থেকে বাকিটা ধার করে এনে দেয়। রিক্সাওয়ালা কলকাতার হসপিটাল থেকে বাচ্চাকে বাঁচিয়ে নিয়ে আসে। ছেলেটাকে শহর চেনে। ভালওবাসে। শহরে বৃষ্টি হয়, সে ছাতা নিয়ে হাজির হয়ে যায়। কঠিন কঠিন প্রয়োজনে শহর তাকে ফোন করে। সে বাঁশি থামায়। কাজ করে দেয়। আবার ঘুরতে ঘুরতে কোথায় সব চলে যায়।

এই শহরের একজন কঠিন মনের লোক একদিন তাকে ফোন করলো, শিশুসন্তানের জন্য টিউটর লাগবে। সে মন দিয়ে শুনলো। কঠিন মনের মানুষের বাচ্চার জন্য একজন নরম মনের টিচার লাগবে। এভাবেই ব্যালান্স হবে পৃথিবী। নিউট্রালাইজড্ হবে। সে শাপলাকে ফোন করলো। শাপলা তারই বন্ধু। শাপলা বর্ষাকালের মতই নরম। শহরের আর একটা প্রয়োজন মিটিয়ে ছেলেটা নতুনগ্রামে সাত প্রহরের বিল দেখতে গেল। অনেকদিন পর।

দেখতে দেখতে বর্ষা চলে যেতে লাগে। শরৎ আসবে আসবে। আকাশ নীলসাদায় ঝলমলে। এবার বর্ষায় ইছামতি দিয়ে জল এসেছে প্রচুর। মাজদিয়ায় নদীর উৎসমুখ বাংলাদেশ থেকে তোড়ে আসা মাথাভাঙার জলের চাপে খুলে গেছে উৎসে। নদী এখন আবার উঠে দাঁড়িয়ে বাঁকে বাঁকে জীবন নিয়ে এসেছে। কচুরিপানা যা ছিলো সব জলের স্রোতে দক্ষিণের দিকে ভেসে চলে গেছে। এইরকম একটা নদীমাতৃক সময়ে আবার একদিন ছেলেটাকে একজন ভীতু মানুষ ফোন করলো। তারও বাচ্চামেয়ের জন্য টিউটর লাগবে।

ছেলেটা অবাক হয়ে গেলো। আবার টিউটর! তার কাছেই ফোন আসছে কেন! সে তো পড়াশুনোর লাইনের সঙ্গে যুক্ত না। তার লাইন অন্য। এরা তাকে বারেবারে ফোন করছে কেন? শাপলা কি কঠিন মানুষটার সন্তানকে খুব ভাল পড়িয়েছে! যাই হোক অনেক ভেবেচিন্তে সে শিরিষকে ফোন করলো। শিরিষ নাটক করে। শহরের একটা নাটকের দলে। ছোটবেলায় অনেক বোমাপিস্তল দেখে বড় হয়েছে। লাইনপাড়ের পাড়ায় বড় হ’তে দম লাগে। শহরের একটা ভীতু মানুষের সন্তানের জন্য ছেলেটা এবার অকুতোভয় শিরিষকে ঠিক করে দিলো। দিয়ে পিরোজপুরের বাঁওড়ের দিকে চলে গেলো সাইকেল চালিয়ে। ওদিকটায় প্রচুর কাশ ফুটেছে এবার।

ঘটনার দেড়মাস পরে পুজো চলে গেলে ছেলেটা খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এবারের পুজোয় মজা হয়েছে খুব। গতবার করোনার জন্য কোনও পুজোই হয়নি। কত বন্ধুরা এসেছে বাইরে থেকে। কত বন্ধুরা থেকেই গিয়েছিলো শহরে। কাজ চলে গেছে। সবাই মিলে খুব আনন্দ করেছে ক’দিন ধরে। লক্ষ্মীপুজোর পরের সন্ধ্যেবেলায় আবার ফোন পেলো ছেলেটা। এবার শহরের এক হুল্লোড়বাজ মানুষ ফোন করেছে তাকে। ছেলের জন্য টিউটর চাই। এবার আর বেশি ভাবে না ছেলেটা। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার মহীরূহকে ফোন করে। মহী হায়দরাবাদে হাইটেক সিটিতে কাজ করতো। লকডাউনে ডাউনসাইজিং করে কোম্পানী। এখন জবলেস। টিউশন করছে। শান্ত ছেলে। কোনওদিন বিড়ি সিগারেটও খায়নি। এইভাবে হুল্লোড়বাজ লোকের বাড়ি এক শান্তসরল টিউটর পাঠিয়ে আবার ব্যালান্স করে ছেলেটা।

আবার ফোন পায় ছেলেটা। টিউটরের ফোন। ঋতু পরিবর্তনের আগেই ফোন চলে আসে। নাকি হেমন্ত বোঝা যায় না বলে মনে হয় শীত এখনও আসেনি। এবার এক ভক্ত মানুষ ফোন করে টিচারের জন্য। ছেলেটা নির্দ্বিধায় ফোন করে সবুজকে। বিজ্ঞান সমিতি করা সবুজ বিশুদ্ধ নাস্তিক। চন্দনগন্ধময় বাড়িতে টিউটর হয়ে আসে এক যুক্তিবাদী টিউটর।

এইভাবে ব্যালান্স করতে করতে শহরকে বুকে ধরে নিয়ে চলে ছেলেটা। ভালবেসে চলে। বৃষ্টি পড়লে শহরে থাকে। বৃষ্টি না পড়লে ইছামতির আশপাশের রাস্তা দিয়ে এঁকে বেঁকে নদীর মতই ঘুরে বেড়ায়। আর বাঁশি বাজায়। ছেলেটা…


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box