ছোটবেলার মতো সুখাদ্য আর জিভের স্বাদ কোথায় হারিয়ে গেলো

শান্তা মারিয়া

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

আমি যখন ছোট তখন ঢাকা শহরের শিশুদের খাবার দাবারের চেহারাটা একেবারেই আলাদা ছিল। সত্তরের দশক। ফাস্টফুডের বালাই ছিল না। সিনেমা হলে বড়রা নিয়ে যেত। ছবির গল্প টল্পের দিকে যত না আকর্ষণ তার চেয়ে অনেক বড় ব্যাপার ছিল ফানটা আর পটেটো চিপস খাওয়া। আহা চিপসের সেই স্বাদ এখন আর পাই না। মিমি চকলেট ছিল সবচেয়ে প্রিয় বস্তু। আমি একদম ভাত খেতে চাইতাম না। দুধের গ্লাস দেখলে তো রীতিমতো ভয় লাগতো। হাফবয়েল ডিমের মতো বিচ্ছিরি খাবারও ছিল আতংক। এদিকে নিষিদ্ধ ছিল আইসক্রিমের মতো স্বর্গীয় বস্তু।

আমাদের পরিবার

একবার আইসক্রিম খেয়ে টনসিলের ব্যথা হওয়ায় ওটি আমার খাওয়া নিষেধ ছিল। ইগলু আইসক্রিমের দোকানদারকে মনে হতো দারুণ সুখি মানুষ। মনে আছে খুব লুকিয়ে আইসক্রিম খেতাম। একবার তো ইগলু জেন্টু নামের আইসক্রিমের দোকানটিতে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে তোপখানা রোড পালিয়ে চলে গিয়েছিলাম। অবশ্য একা নয়। সঙ্গে ছিল আমার বান্ধবী রিকশাচালকের মেয়ে সুফিয়া। পাড়ার মুদির দোকানে চার আনা করে বিক্রি হতো নাবিস্কো লজেন্স। সেটা কিনে এনে খেতাম। সেটাও লুকিয়ে অবশ্য। বাবার এক বন্ধু আমাকে এক বাক্স লজেন্স উপহার দিয়েছিলেন। সেদিন টিভিতে দুপুরবেলা বাংলা সিনেমা হচ্ছিল। বাসার সবাই যখন সিনেমা দেখছে আর বাবা বই পড়ায় ব্যস্ত, আমি সেই এক বাক্স লজেন্স একটার পর একটা খেয়ে পুরো সাবাড় করে ফেলি। হায় হায়, তারপরে যে বমি শুরু হয়। ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। এরপর থেকে লজেন্সও নিষেধ হয়ে গেল। নানার বাড়ি সেগুন বাগিচা। সেখানে খালাতো, মামাতো ভাইবোনদের সঙ্গে মিলে কদবেল, কামরাঙা, তেঁতুলের আচার, কুল, অড়বরই খাওয়ার ধুম পড়ে যেত। আর চীনা বাদাম ছিল অভিভাবক অনুমোদিত খাদ্যের মধ্যে কিছুটা পছন্দের। বাড়িতে মেহমান আসলে দেওয়া হতো বিস্কিট, চানাচুর আর পাড়ার বেকারি থেকে এনে দেওয়া পেস্ট্রি। সঙ্গে থাকতো কাঁচের বোতলে কোক বা সেভেন আপ। মেহমানের পাশাপাশি আমাদের জন্যও দু’তিন পিস বাড়তি কেক আসতো। সেটা খেতে বেশ ভালো লাগতো। লাঠি বিস্কিটও ভালো ছিল। তবে আমার মায়ের ছিল স্বাস্থ্যবাতিক। তিনি কেনা কিছু খেতে দিতে চাইতেন না। বাড়ির বানানো নাস্তা ছিল তার পছন্দের। তিনি কেক বিস্কুট বানাতে শিখেছিলেন। সেগুলো খেয়ে ভালো লাগুক না লাগুক প্রশংসা করতে হতো। সিগারেট লজেন্স নামে এক ধরনের লজেন্স পাওয়া যেত। যদিও সেটা নেহাতই লজেন্স তবু নৈতিকভাবে পাছে আমরা খারাপ হযে যাই তাই সেটাও খাওয়া একেবারে নিষেধ।

ছোট্ট আমি

রাস্তা থেকে ফুচকা চটপটি খাওয়ার সাহস ছিল না। আমার ভাই স্কুলে পড়ে। আমি তখনও ভর্তি হইনি। ভাইয়া তার টিফিন বক্সে করে লুকিয়ে আমার জন্য চটপটি নিয়ে আসতো। পরে যখন স্কুলে ভর্তি হলাম তখন দেখলাম স্কুলের সামনে মজাদার খাদ্যের স্বর্গরাজ্য। বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া ওসব পুষ্টিকর টিফিন কাককে খাইয়ে দিলেই লাভ। আটআনা দিয়ে প্যাকেটের ঝাল চানাচুর, আটআনার আমড়া, চারআনায় বৈচির মালার মতো সুখাদ্য থাকতে ডিমরুটি কে খায়! চার আনায় আরেকটি খাবার পাওয়া যেত, সেটা হলো ছোট্ট কোন আইসক্রিম। দু’টাকা প্লেট চটপটি। সে সময় বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের হাতে একেবারেই টাকা দিতেন না। তবে আমার বাবা মোটেই কড়া মানুষ নন বলে পাঁচ-দশ টাকা দিতেন। আমি কখনও বাবার মানিব্যাগ থেকে টাকা চুরি করিনি। এমনিতেই দিতেন। কিন্তু সেই টাকা খরচ করবো কিভাবে? মা স্কুলে বসে থাকতেন ।তার পাহারা এড়ানো বড় কঠিন। তবু উপায় বের করে ফেলেছিলাম। স্কুলের পিছনদিকের দেয়াল টপকে সহজেই রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ে যাওয়া যেত। সেই ক্যান্টিন থেকে আলুর চপ খেতে কি মজা। স্কুলে আমি আর নুসরাত সব চোরাই খাবার ভাগ করে খেতাম। আমার ছোটবেলার মতো সেইসব সুখাদ্য আর জিভের স্বাদ কোথায় হারিয়ে গেল কে জানে।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে